আদানি নিয়ে চিন্তিত নয় সরকার

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:১৮ এএম

বকেয়া আদায়ে আরও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বহুল আলোচিত-সমালোচিত ভারতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি আদানি গ্রুপ। তবে এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। সরকার বলছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিপুল বকেয়া তারা ধীরে ধীরে পরিশোধ করা শুরু করেছে। এরপরও আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিলে কিংবা বন্ধ করলে প্রয়োজনে বিকল্প উপায়ে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখবে।

এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চলতি সপ্তাহের সোমবার অথবা এরপর যেকোনো দিন আদানিকে আরও কিছু বকেয়া পরিশোধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

পিডিবি সূত্রমতে, বাংলাদেশের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির প্রায় ৮৫ কোটি ডলার পাওনা ছিল আদানি। তার বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধাপে ধাপে কিছু বকেয়া পরিশোধ করেছে পিডিবি। সর্বশেষ গত সোমবার ১ কোটি ডলার (১০ মিলিয়ন ডলার) পরিশোধ করার পর এখন পাওনা প্রায় ৭০ কোটি ডলারের মতো।

একটি সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার আদানিকে ২ কোটি ডলার (২০ মিলিয়ন ডলার) পাওনা মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা দেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরকার মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। তাদের যে বকেয়া আছে, সেটা ধীরে ধীরে পরিশোধ করার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। ইতিমধ্যে কিছু বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। এরপরও যদি তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমরা বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করব। আমরা কোনো বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে দেশকে জিম্মি হতে দেব না।’

এটা কোনো জাতীয় ইস্যু নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আদানি বিদ্যুৎ বিক্রির টাকা পাবে পিডিবির কাছে। এটা তো একটা ব্যবসা। ব্যবসায়িক এ বিষয়টি তো পিডিবি আর আদানির ব্যাপার।’

ফাওজুল কবির আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া পরিশোধে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে তো শুধু আদানি নয়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিপিসির তেল সরবরাহকারী রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই দেশে যাতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি স্বাভাবিক রাখা যায়, সেই পরিকল্পনা করে আমরা এগোচ্ছি।’

পিডিবি সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বকেয়ার অর্থ আদায়ে আগের চেয়ে তৎপরতা বাড়িয়ে দেয় আদানি। বাংলাদেশকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে আদানি। একপর্যায়ে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে আদানির নামে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কথা থাকলেও ডলারসংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন পিডিবির পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়। এরই মধ্যে ৩১ অক্টোবর থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ করে দেয় আদানি। নভেম্বরে তারা ৭০০ থেকে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল।

গত সপ্তাহে সোমবারের পর বৃহস্পতিবার পিডিবির কাছ থেকে আরও একটি পেমেন্ট না পাওয়ায় আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও কমিয়ে এখন গড়ে প্রায় ৫১৫ মেগাওয়াটের মতো সরবরাহ করছে। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসছিল।

বকেয়া বিল না পেলে গত বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) থেকে আদানি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া খবর প্রকাশ করেছিল। গত ৩ নভেম্বর প্রকাশিত ওই খবর সঠিক নয় বলে ওইদিন আদানি গ্রুপের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। গ্রুপের পক্ষ থেকে দেশ রূপান্তরকে বলা হয়েছিল, তারা উল্টো বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বাড়াতে চায়।

আদানি জানিয়েছিল, ৭ নভেম্বরের মধ্যে ৮০-৮৫ কোটি ডলার বকেয়া পরিশোধ করার কোনো আলটিমেটাম পিডিবিকে দেয়নি তারা। বকেয়া আদায়ের জন্য পিডিবির সঙ্গে আলোচনা চলছে। দুপক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চায় আদানি।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছিলেন, কয়লা আমদানি নিয়ে এলসি (ঋণপত্র)-সংক্রান্ত একটা জটিলতা ছিল। সেটি দু-এক দিনের মধ্যে কেটে যাবে। তখন বন্ধ থাকা দ্বিতীয় ইউনিটও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এর পাশাপাশি এ সপ্তাহে (গত সপ্তাহে) পিডিবি কিছু পেমেন্ট দিলে পুরোদমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা শুরু হবে।

তবে পিডিবির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, আদানির পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ বন্ধের আলটিমেটাম দিয়ে পিডিবিকে একটি ই-মেইল করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল রাতে আদানি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাদের পরামর্শে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। কিন্তু রাত সাড়ে ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আদানির একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, গত সপ্তাহ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তুতি তাদের ছিল। কিন্তু সোমবার খুবই অল্প পেমেন্ট দেওয়া এবং বৃহস্পতিবার পেমেন্টের আশায় থেকেও শেষ পর্যন্ত তা না পাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিতে হয়েছে। কারণ তাদের হাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা কেনার অর্থ নেয়।

সূত্রটি আরও জানায়, বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিলেও পুরোপুরি বিদ্যুৎ বন্ধের কোনো পরিকল্পনা এখন তাদের নেই। তবে তারা আশাবাদী, পিডিবি ধীরে ধীরে তাদের বকেয়া পরিশোধের মাত্রা বাড়াবে। পাশাপাশি আদানিও বাড়াবে বিদ্যুৎ সরবরাহ।

আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগেই কয়লার দাম ও চুক্তির শর্ত নিয়ে দেশ-বিদেশে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। একপর্যায়ে পিডিবির পক্ষ থেকে আদানিকে কয়লার চড়া দাম দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দাম কমাতে রাজি হয় আদানি। পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে কম দামে কয়লা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। তবে এক বছর পর এখন আবার ২২ শতাংশ বাড়তি দাম চাইছে আদানি।

পিডিবি সূত্রমতে, পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতি টন কয়লার দাম নিচ্ছে ৭৫ মার্কিন ডলার। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে টনপ্রতি কয়লার দাম ৮০ ডলারের কম। আর আদানি প্রতি টন কয়লার দাম চাইছে ৯৬ ডলার। যদিও আদানির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, প্রতি সপ্তাহে আদানির বিল পাওনা হচ্ছে ২ কোটি ২০ লাখ থেকে আড়াই কোটি ডলার। এর বিপরীতে পিডিবি তাদের পরিশোধ করছে ১ কোটি থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের মতো। আগে পরিশোধের পরিমাণ আরও কম ছিল। এতে অক্টোবর পর্যন্ত তাদের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫ কোটি ডলার। অক্টোবরে বাংলাদেশ আদানিকে বিদ্যুতের বকেয়া বাবদ ৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার দিয়েছে, যা আগের তিন মাসের পরিশোধের চেয়ে বেশি।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কারণে আদানি যদি সত্যি সত্যি বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়, তাহলে দেশে বিদ্যুতের বড় ধরনের ঘাটতির যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তারা সেটা নাকচ করেছেন।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ধারণা একেবারেই অমূলক। কারণ গরম কমে যাওয়ায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদাও কমে গেছে। ফলে লোডশেডিং কিছুটা বাড়লেও বড় বিপর্যয়ের কোনো শঙ্কা নেই। প্রয়োজনে বিকল্প হিসেবে সাময়িক সময়ের জন্য তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে সরকার।

গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা গড়ে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও, সেটি এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটে।

এদিকে কয়লাসংকটের কারণে এস আলম গ্রুপের ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের উৎপাদন কমে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াটে নেমে আসার পর সরবরাহ বেড়ে এখন প্রায় ৬১২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। বর্তমানে কেন্দ্রটির কয়লা নিয়ে কোনো সংকট নেই। তা ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণে বন্ধ থাকা একই সক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটটিও আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে চালু হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা সরবরাহে ঠিকাদার নির্বাচনে কিছু জটিলতার কারণে কেন্দ্রটির কয়লা আমদানি বেশ কিছুদিন বন্ধের কারণে পুরো কয়লা শেষ হয়ে যায়। একপর্যায়ে গত ২৫ অক্টোবর পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। তবে ঠিকাদার নিয়ে জটিলতার অবসান হওয়ার পর গত সপ্তাহে কয়লা সরবরাহের জন্য চুক্তি হয়েছে। বিদেশ থেকে কয়লা আমদানির পর চলতি মাসের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া কয়লাসংকটের কারণে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে করা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে ৬২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আসছে। আগামী ১০ নভেম্বরের পর দুটি ইউনিট চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত