সিলেটের কানাইঘাটের শিশু মুনতাহা আক্তার জেরিন। ছয় বছর বয়সী ফুটফুটে প্রাণচঞ্চল মেয়েটি ছিল পুরো পরিবারের প্রাণভোমরা। তবে সবার অগোচরে আট দিন আগে বাড়ির পাশ থেকেই নিখোঁজ হয়। মুনতাহাকে ফিরে পেতে এক সপ্তাহ ধরে অধীর অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনরা। তার নিখোঁজের ঘটনা জানাজানির পর স্বজনরা ছাড়াও তাকে খুঁজে পেতে জোর তৎপরতা চালান প্রতিবেশী ও গ্রামবাসী। ছোট্ট মুনতাহার খোঁজ পেতে তার ছবি দিয়ে ফেসবুকেও বিভিন্ন পোস্ট দেন চেনা-অচেনা অনেকে। সেই মুনতাহার খোঁজ অবশেষে মিলেছে, তবে জীবিত নয়; লাশ। গতকাল রবিবার তার মরদেহ দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ। বিলাপ করছেন মুনতাহার বাবা-মা। ফুটফুটে এ শিশুটির হত্যায় শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, কাঁদছে দেশবাসীও।
জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর সকালে বাবার সঙ্গে স্থানীয় একটি ওয়াজ মাহফিল থেকে বাড়ি ফেরে মুনতাহা। পরে দুপুরে পাশের বাড়ির শিশুদের সঙ্গে খেলতে যায়। তারপর থেকে নিখোঁজ ছিল ছোট্ট মুনতাহা। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও প্রিয়মুখটির সন্ধান পাননি। শেষে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন মুনতাহার বাবা। শিশুটির সন্ধান পেতে তৎপরতা শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই মধ্যে গতকাল ভোররাত ৪টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মুনতাহা কানাইঘাট সদর উপজেলার বীরদল ভাড়ারিফৌদ গ্রামের শামীম আহমদের মেয়ে। তাকে হত্যা করেছে তারই সাবেক গৃহশিক্ষিকা শামীমা বেগম মার্জিয়া সুমি। আর এতে সুমিকে সহযোগিতা করেন তার মা। গতকাল ভোরে সুমির মা খালে পুঁতে রাখা মুনতাহার অর্ধগলিত মরদেহ অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন গ্রামের লোকজনের হাতে। এমনটিই জানিয়েছেন কানাইঘাট থানার ওসি মো. আবদুল আওয়াল।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় সুমি এবং তার মা আলিফজান বিবি ও তার আরেক মেয়েসহ চারজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বাড়িও মুনতাহাদের বাড়ির পাশেই।
গ্রেপ্তার হওয়া সুমি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুনতাহাকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। পুলিশ জানায়, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গৃহশিক্ষিকার চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষোভ থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সুমি। এর বাইরে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কানাইঘাট থানা পুলিশ ও বীরদল ভাড়ারিফৌদ গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল ভোররাত ৪টার দিকে বাড়ির পাশের খালে পুঁতে রাখা মুনতাহার লাশটি তুলে প্রতিবেশীর পুকুরে ফেলার চেষ্টা করেন সুমির মা আলিফজান বিবি। কিন্তু ঘটনা দেখে ফেলেন ওই বাড়ির মালিক আবদুল ওয়াহিদ। তিনি চিৎকার করলে আরেক প্রতিবেশী দ্রুত সেখানে আসেন। এমন পরিস্থিতিতে লাশ ফেলে আলিফজান বিবি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তাকে ধাওয়া করে আটক করা হয়। এরপর খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। মরদেহে আঘাতের চিহ্ন ও গলায় রশি পেঁচানো ছিল।
এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে আটক আলিফজান ও তার মেয়ে সুমি নিহত শিশু মুনতাহার বাড়ির পাশেই সরকারি খাসজমিতে তৈরি একটি ঘরে বসবাস করেন। এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন সুমি। তিনি মুনতাহাকে তার বাড়িতে গিয়ে পড়াতেন। কিন্তু কিছুদিন আগে তাকে সেই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন মুনতাহার বাবা।
মুনতাহার লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল সকালেই শত শত নারী, পুরুষ, শিশু সেখানে গিয়ে ভিড় করে। মুনতাহার মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজনরা আহাজারি করতে থাকেন। এ সময় ক্ষুব্ধ লোকজন সুমির ঘর ভেঙে তা আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
কানাইঘাট থানার ওসি আবদুল আউয়াল জানান, মুনতাহা হত্যায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চারজনকে আটক করা হয়েছে। তারা হলেন আলিফজান বিবি (৫৫), তার মেয়ে শামীমা বেগম মার্জিয়া সুমি (২৫), মৃত ছইদুর রহমানের ছেলে ইসলাম উদ্দিন (৪০) ও মামুনুর রশিদের স্ত্রী নাজমা বেগম (২৫)।
মুনতাহার বাবা শামীম আহমদ জানান, মুনতাহার এক সময়ের গৃহশিক্ষিকা ছিল সুমি। কিন্তু খারাপ আচরণের কারণে তাকে গৃহশিক্ষিকার চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। এই প্রতিহিংসা থেকে সুমি, তার মা ও অন্যরা মিলে মুনতাহাকে হত্যা করেছে।
সিলেটের পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান গতকাল বিকেলে নিহত মুনতাহার বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিশু মুনতাহাকে উদ্ধার করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। তারা ফুটফুটে শিশুটিকে মেরেই ফেলেছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কেউই রক্ষা পাবে না। খুনিরা যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি পায় পুলিশ সে লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।’
মুনতাহার লাশ ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে বাড়িতে নেওয়া হলে সেখানে কান্নার রোল ওঠে। উপস্থিত শত শত মানুষ মুনতাহার খুনিদের ফাঁসির দাবি জানায়। বাদ আসর বীরদল পুরানফৌদ জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে মুনতাহাকে গ্রামের পঞ্চায়েত কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গত ৩ নভেম্বর দুপুরে শিশু মুনতাহা বাড়ির পাশের আবদুল ওয়াহিদের বাড়ির শিশুদের সঙ্গে খেলতে যায়। ওইদিন বিকেল পর্যন্ত বাড়িতে ফিরে না এলে তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করানো হয়। এরপর মুনতাহার বাবা কানাইঘাট থানায় জিডি করেন। তার নিখোঁজের খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দেশ-বিদেশের অনেকে নিজেদের ফেসবুক আইডিতে মুনতাহার খোঁজ পেতে পোস্ট দেন। মুনতাহার প্রবাসী ভাই তার বোনের সন্ধানদাতাকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দেন।
