বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। এ খাতের ওপর ভর করেই অক্টোবর মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। আর তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। আগস্টের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া অস্থিরতার কারণে পোশাক রপ্তানি নিয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। গত মাসেও পোশাক খাতে অসন্তোষ ছিল। প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের রপ্তানি আয়ে বড় সুখবর এসেছে। গতকাল রবিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এসাইকুডা কাস্টমস সফটওয়্যারে অন্তর্ভুক্ত রিয়েল-টাইম শিপমেন্টের তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা জানিয়েছে ইপিবি।
ইপিবির তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিকতায় টানা দ্বিতীয় মাসে পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে বাংলাদেশ। আগের বছরের অক্টোবরের তুলনায় গত অক্টোবরে শুধু পোশাক খাতের ওপর ভর করে রপ্তানি আয় ২০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিক-অস্থিরতায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া সত্ত্বেও এমন অগ্রগতি হয়েছে।
বিদেশি মুদ্রা আয়ের বড় দুই খাতেই সুখবর মিলছে টানা দুই মাস ধরে। বিদেশি মুদ্রা আয়ের অন্যতম বড় খাত প্রবাস আয়েও টানা দুই মাসের প্রতি মাসে প্রায় ২৪০ কোটি ডলার আয় হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে রিজার্ভও বাড়ার আশা রয়েছে।
ইপিবির হালনাগাদ রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অক্টোবরে রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় পৌঁছেছে ৪১৩ কোটি ডলারে; গত বছর একই মাসে আয় ছিল (তথ্য সংশোধনের পর) ৩৪২ কোটি ডলার।
ইপিবির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি ১০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৭৯ কোটি বা ১৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ৪২৫ কোটি বা ১৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানিতে পোশাক খাতের অবদান ১ হাজার ২৮১ কোটি ডলার বা ১২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা মোট পণ্য রপ্তানির ৮১ দশমিক ২ শতাংশ।
দেশের সর্ববৃহৎ রপ্তানি আয় আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অক্টোবরে এ খাত ৩৩০ কোটি ডলার মূল্যের রপ্তানি করেছে, আগের অর্থবছরের একই মাসের রপ্তানি আয় ছিল ২৬৮ কোটি ডলারের। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ।
অক্টোবরের রপ্তানি আয়ে পোশাক রপ্তানির অবদান ১৮৬ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫০ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে আয় বেড়েছে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ওভেন পোশাকের রপ্তানি হয়েছে ১৪৪ কোটি ডলার, আগের বছরের অক্টোবরের ১২০ কোটি ডলারের চেয়ে তা বেড়েছে ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
আগস্ট মাসের শেষে শুরু হওয়া শ্রম-অসন্তোষের জেরে হুমকির মুখে পড়ে তৈরি পোশাক শিল্প। গত মাসের শেষদিকে বিজিএমএইএ দাবি করেছিল, শ্রম-অসন্তোষের কারণে তাদের ৪০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রম-অসন্তোষ কিছু এলাকায় এখনো অব্যাহত রয়েছে। শনিবারও গাজীপুরের বাসন এলাকায় বকেয়া বেতনের দাবিতে টিঅ্যান্ডজেড অ্যাপারেলস গ্রুপের পাঁচটি কারখানার পোশাক শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
এমন পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পমালিকদের কপালে ভাঁজ পড়ে। কারণ, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের তিন মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাড়বে এমনটা আশা করতে পারছেন না তারা। উল্টো আরও কমে যেতে পারে এ শঙ্কায় আছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সংঘাতময় পরিস্থিতিতে পোশাক উৎপাদন ব্যাহত হয়। ৫ আগস্ট সরকার পতন হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়।
গাজীপুর ও ঢাকার সাভারে শ্রমিক-অসন্তোষের কারণে বেশ কয়েক দিন অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ থাকে; উৎপাদন ব্যাহত হয়।
পোশাক শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ গত ১৯ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, পোশাক শিল্পে শ্রমিক-অসন্তোষের কারণে অন্তত ৪০ কোটি ডলারের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বর্তমান বিনিময়হার (প্রতি ডলার ১২০ টাকা) হিসাবে এর পরিমাণ ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
অন্য খাতগুলোর রপ্তানি আয় : অক্টোবর মাসে কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১১৩ মিলিয়ন ডলার। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। প্লাস্টিকপণ্য ৩০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা এক বছর আগের একই সময়ের ২০ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৫৪ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় ১ শতাংশ কমে ৮৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাট ও পাটজাতপণ্যের আয় ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে ৭৯ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
বিশেষায়িত টেক্সটাইল সেক্টর ৩৬ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এ খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। হোম টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ এবং আয় হয়েছে ৬৪ মিলিয়ন ডলার।
হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ থেকে রপ্তানি আয় অক্টোবরে ৩২ শতাংশ বেড়েছে; আয় হয়েছে ৫২ মিলিয়ন ডলার, যা গত অক্টোবরের একই সময়ে ছিল ৩৯ মিলিয়ন। অক্টোবরে ওষুধপণ্য রপ্তানি ৪৯ শতাংশ বেড়ে ২১ মিলিয়নে ডলারে দাঁড়িয়েছে।
