গত ১৫ বছরে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর প্রতি মানুষের প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমূর্তি সংস্কার করে জনবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারই এখন মূল উদ্দেশ্য। শুধু পদোন্নতি, পদায়ন বা ব্যক্তিপর্যায় সংকট সমাধান না করে সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার প্রস্তাব রাখতে হবে বলে মত দিয়েছেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত সেমিনারে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে এসব কথা উঠে এসেছে।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব) মো. হাফিজুর রহমান সেমিনারে মূল প্রবন্ধে বলেন, বিগত সময়ে সিভিল সার্ভিস কি রাজনৈতিক বলয় থেকে মুক্ত হতে পেরেছিল? প্রশাসন কি জনবান্ধব হয়েছিল? যদি না হয়, তাহলে প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জনবান্ধব সিভিল সার্ভিস কাঠামো এবং সেই সংস্কার করা। সামগ্রিক জনবান্ধব প্রশাসন তৈরি করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া বলেন, লজ্জার হলেও সত্য প্রশাসনের কর্তারা ১৫ বছর রাজনৈতিক কর্মীদের মতো আচরণ করেছেন। ফলে ৫ আগস্টের পর বড় কর্তারা রাতের আঁধারে পালিয়ে গেছেন। তাদের আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। লজ্জার বিষয়, রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মতোই তারা বিদায় নিয়েছেন। তিনি সহকর্মীদের প্রতিও প্রশ্ন তোলেন নিজস্ব দায়িত্ববোধ নিয়ে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমান বলেন, গত কয়েক মাসে রেকর্ডসংখ্যাক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ কথাটি মাথায় রাখতে হবে। রাতারাতি সব বঞ্চিতকে এক দিনেই পদোন্নতি দিয়ে দেওয়া সম্ভব না। তবে এটি নিশ্চিত এখন কোনো বৈষম্য করা হবে না। ন্যায্যতার ভিত্তিতেই সুবিবেচনা করা হবে। তিনি দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, এখন সামগ্রিক সংস্কারের পরিবর্তে সবাই ব্যক্তিগত সংকট সমাধানে আগ্রহী। এভাবে আন্দোলনের স্পিরিট ধরে রাখা সম্ভব না। জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সত্য হচ্ছে, সংস্কার প্রস্তাব দিলেও এসব বাস্তবায়ন করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। নির্বাচিত সরকার ছাড়া আমূল সংস্কার সম্ভব নয়। উচিত হবে সেভাবেই সংস্কার প্রস্তাব দিতে। তিনি বলেন, এখন ক্যাডার সার্ভিস সংস্কারে বিষয়টি ভাবতে হবে। প্রকৃত অর্থে যতগুলো ক্যাডার সার্ভিস আছে, সেসব প্রয়োজন আছে কি না সেটিও ভাবতে হবে।
জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় না থেকে এখন থেকেই সংস্কার শুরু করা উচিত যতটুকু সম্ভব।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ্ এফসিএমএ বলেন, ‘নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালিয়ে প্রশাসন যে বিতর্ক তৈরি করেছে, সেসব জায়গায় সংস্কার করতে হবে। গত ১৫ বছর সত্যিকারের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাডার ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। স্বল্প মেয়াদে সংস্কার চাই। এ দেশে গুম, খুন হত্যার যে সংস্কৃতি ছিল, প্রশাসনে সেই আইন দূর করতে হবে। তথ্য আইন সংস্কার করতে হবে। বিগত ১২টি সংস্কার কমিশনও কিছু সংস্কার করেছে, এখন কমিশন কী করে, সেটি দেখার বিষয়। বঞ্চনা ও বৈষম্য দূর করাই প্রথম সংস্কার হতে হবে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও সংগঠনের মহাসচিব মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় বিভিন্ন ব্যাচের পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা নিজেদের অভিযোগ-অনুযোগ তুলে ধরেন।
