মিরপুর সিরামিকস ১৯৫৮ সাল থেকে দেশের স্থাপত্যের জন্য আকর্ষণীয় ও উন্নতমানের সিরামিক নির্মাণসামগ্রী তৈরি করে আসছে। পরে সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিলেটের খাদিমনগরে খাদিম সিরামিকসে যুক্ত হয়েছে নতুন ঘরানার সিরামিক টাইলস। দেশের সিরামিক শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন
প্রথিতযশা এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হামজাহ তাবানী, যিনি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে বিশেষ যোগ্যতার সঙ্গে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। এরপর দেশে এসে হামজাহ তাবানী যোগ দেন মিরপুর সিরামিকস ও খাদিম সিরামিকসের পরিচালক হিসেবে। হয়েছেন বাংলাদেশের এমপ্লয়ার’স ফাউন্ডেশনের গভর্নিং কমিটির সদস্য।
দেশ রূপান্তর : দেশে বর্তমানে সিরামিক শিল্প কী অবস্থায় আছে?
হামজাহ তাবানী : আমরা মূলত সিরামিকের নির্মাণসামগ্রী তৈরি করে থাকি, যা সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্টে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার হয়। তবে বর্তমানে নির্মাণ শিল্পে সরকারি ব্যয় আগের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় বেশ সমস্যা চলছে। অন্যদিকে সিরামিকের নির্মাণসামগ্রী বিভিন্ন ধরনের আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে উৎপাদন খরচের ওপর তা ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব রাখছে। তা ছাড়া গ্যাসের দাম বেড়ে গেলেও আমরা ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছি না। এতে করে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : সিরামিক শিল্পে আপনার প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি কেমন?
হামজাহ তাবানী : বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব পণ্য এবং প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আমরা খাদিমনগরে পরিবেশবান্ধব টাইল অ্যাডহেসিভ তৈরি করা শুরু করি ২০১১ সাল থেকে। এটি পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণের ব্যবহারকে কমিয়ে দিতে সাহায্য করবে। দেশে আমরাই প্রথম এই পণ্য তৈরি শুরু করি এবং বাজারে সেরা অবস্থানে আছি। কিছুদিনের মধ্যেই খাদিম মর্টার নামে নতুন করে এই রেডিমিকস সিমেন্ট, বালু ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণে টাইল অ্যাডহেসিভ বাজারে আসছে। এ ছাড়া ২০২২ থেকে আমরা হবিগঞ্জে সানশাইন ব্রিকস নামে আরেকটি সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি চালু করেছি। এখানে সম্পূর্ণ অটোমেটেড প্রসেসে ইউরোপীয় প্রযুক্তিতে পরিবেশবান্ধব সিরামিকের নতুন অনেক পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যা কি না বাংলাদেশে নতুন। এসব পণ্যের মধ্যে সিরামিক ব্লককে খুব দ্রুতই আমরা বাজারে নিয়ে আসতে যাচ্ছি, যা অতিরিক্ত গরম ও ঠা-ার সময়ে ঘরকে নাতিশীতোষ্ণ রাখে এবং শব্দদূষণকে ঘরে প্রবেশ করতে দেয় না।
আমাদের দক্ষ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট টিম ইউরোপীয় টাইলসের আদলে এবং প্রাকৃতিক উপাদান যেমনÑ কাঠ, মার্বেল ও পাথরের মতো টাইলস তৈরি করেছে। ‘অডিসি’ ও ‘ইটারনাল’ নামে দুটি সিরিজের নামে এই উন্নতমানের টাইলসগুলো বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : দেশে সিরামিক শিল্পে সরকারের কাছ থেকে কী সুবিধা প্রয়োজন?
হামজাহ তাবানী : সিরামিকের কাঁচামালের আমদানিতে শুল্কের ব্যাপারে নতুন করে বিবেচনা করা উচিত। এই শিল্পের উন্নতির জন্য গ্যাসের দাম সহনীয় পর্যায়ে রেখে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই মুহূর্তে টাইলসের ওপর ১৫ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি বসানো আছে, যা কি না গ্রাহকের কাছে একটা বোঝার মতো। এ ব্যাপারে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়তো আমাদের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিকে আরেকটু সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
দেশ রূপান্তর : সিরামিক শিল্পে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন?
হামজাহ তাবানী : সরকারের পক্ষ থেকে এই শিল্পে রপ্তানিকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করা উচিত বলে আমি মনে করি। এটিই স্বাভাবিকভাবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরের ধাপ। আশা করি, সরকারের নতুন নীতিগুলোতেও এর ছাপ থাকবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের পরিবেশ রক্ষার দিকে নজর দিচ্ছে। এ কারণে গ্রাহকদের ভেতরেও পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে নজর দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তাই যদি এই শিল্পে দেশীয় কাঁচামাল ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তবে এই শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।
সিরামিক শিল্পে বাংলাদেশে স্বকীয়তা ও স্বনির্ভরতা তৈরির একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাইরের থেকে আনা টাইলসের জনপ্রিয়তা ছাপিয়ে এ দেশের টাইলস একসময় দেশের মানুষের প্রথম পছন্দে পরিণত হবে।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের টাইলস বা সিরামিক শিল্পের উত্তরণে প্রতিবন্ধকতা কী বলে মনে করেন?
হামজাহ তাবানী : ঠিক এই মুহূর্তে জ্বালানির দাম এবং জ্বালানির অভাবটাই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে। সিরামিক শিল্প কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তবে ডলারের কারণে সিরামিকের নির্মাণসামগ্রীর দামের ওপরে প্রভাব ফেলছে। শ্রমিকদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। কারণ দক্ষতার অভাব দেশের যেকোনো শিল্পের পথেই অন্তরায়। এগুলো সমাধান করে দ্রুতই আমরা এই শিল্পে অগ্রগতি দেখব বলে বিশ্বাস করি।
দেশ রূপান্তর : সিরামিক কিংবা টাইলস রপ্তানি বাড়াতে আপনার পরামর্শ কী?
হামজাহ তাবানী : বাংলাদেশ থেকে সিরামিক ব্রিক দেশের বাইরে একমাত্র আমরাই রপ্তানি করে থাকি। সিঙ্গাপুর ও কাতারের মতো আকর্ষণীয় বাজারে আমাদের ব্রিকগুলো বহু বছর ধরেই আমরা রপ্তানি করছি। সিরামিক টাইলস শিল্প সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন টাইলসের ওপর ডিউটি সম্পর্কিত পলিসিগুলো পুনর্বিবেচনা করা। কারণ দেশীয় পণ্যের উৎপাদকের জন্য এ রকম সুবিধাগুলো দেওয়া দরকার, যাতে ভারত ও চীন থেকে আসা টাইলসের দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যায়। তা ছাড়া টাইলসের মান ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করা উচিত। তাহলেই খুব তাড়াতাড়ি এই শিল্প দেশের বাইরের বাজারে বিপুল সাড়া ফেলার ক্ষমতা রাখে।
