শেষ হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাছাই একাদশের সঙ্গে বাংলাদেশ একাদশের দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ। অনুমিতভাবেই ড্র হয়েছে ম্যাচটি, বেশিরভাগ প্রস্তুতি ম্যাচের ফল যেমনটা হয়। প্রস্তুতি ম্যাচের মূল উদ্দেশ্য প্রস্তুতি, শুক্রবার থেকে অ্যান্টিগার স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস স্টেডিয়ামে শুরু হতে যাওয়া টেস্ট সিরিজের আগে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়া। দুই দলেরই টেস্ট একাদশে থাকবেন এমন সম্ভাব্য বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারই অংশ নিয়েছেন দুই দিনের ম্যাচে। প্রস্তুতি ম্যাচের পর বোলিং নিয়ে আশাবাদী হওয়া গেলেও ব্যাটিং নিয়ে ভয়টা কাটছেই না।
২০০৯ সালে, পারিশ্রমিক নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্বের জের ধরে শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা বাংলাদেশ সিরিজ বয়কট করলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড এদিক ওদিক থেকে কিছু ক্রিকেটারকে ধরে এনে একটা দল বানিয়ে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিল। যেসব ক্রিকেটার বেশিরভাগই পরবর্তী সময়ে আর টেস্ট খেলেননি বা বলা যায় সুযোগ পাননি। সেই দলের বিপক্ষে সিরিজ জয় বাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর আসলে বাংলাদেশ দলের জন্য বিভীষিকার অন্য নাম। সবশেষ ৩ সফরে ৬টা টেস্টের হারের ব্যবধানগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হবে কেন এই বিশ্লেষণ। ২০১৪ সালের সফরে দুটো টেস্টের হারের ব্যবধান যথাক্রমে ১০ উইকেটে ও ২৯৬ রানে। পরের সফর ২০১৮ সালে, সেবার আরও ভয়ংকর পরিণতি। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৪৩ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। দুই টেস্টের ৪ ইনিংসে একবারও দলীয় রান ২০০-তেও পৌঁছায়নি। অথচ দলে কিন্তু সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ সবাই ছিলেন! ইনিংস এবং ২১৯ রানের ব্যবধানে হারটা অবশ্য খুব বড় মনে হবে না, যখন চোখে পড়বে বাংলাদেশের সবশেষ টেস্টের ফল যেখানে প্রায় অনভিজ্ঞ আনকোরা দক্ষিণ আফ্রিকা দল নাজমুল হোসেন শান্তদের হারিয়েছে ইনিংস এবং ২৭৩ রানে!
২০২২ সালের সফরে কিছুটা সম্ভ্রম বেঁচেছে। ২ টেস্টের কোনোটিতেই ইনিংস ব্যবধানে হারতে হয়নি বাংলাদেশকে। অবশ্য এজন্য বাংলাদেশের উন্নতি না ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবনতি দায়ী সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। দুটো ম্যাচে হার ৭ উইকেটে ও ১০ উইকেটে। দ্বিতীয় টেস্টে ক্যারিবীয়দের ১৩ রানের লক্ষ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার ব্যাট করানো গেছে, এটাই বড় প্রাপ্তি।
এবারের সফরে তামিম নেই অনির্দিষ্ট কারণে, মুশফিকের চোট, সাকিব অবসরে, নাজমুল হোসেন শান্তরও চোট। ব্যাটিংটা তাতে আপাতদৃষ্টিতে দুর্বল হয়েছে মনে হতে পারে, যদিও তাদের উপস্থিতিতে সবলত্বের খুব একটা প্রমাণ মেলেনি। মুমিনুল হকের চতুর্থ ক্যারিবিয়ান সফর, লিটন দাসের ক্যারিবিয়ানে টেস্ট খেলতেই এটা তৃতীয় সফর, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও এসেছেন এই বছরে। মাহমুদুল হাসান জয়ের টেস্ট দলের হয়ে দ্বিতীয় সফর, তবে ২০২২ সালে এ দলের হয়েও ক্যারিবিয়ান সফরে আসা হয়েছে তার। এরপর অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে বলার উপায় নেই, বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দলটার দিকে তাকালে কারণটা আরও স্পষ্ট হয়। অধিনায়ক ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট বাদে স্কোয়াডের অন্য ক্রিকেটারদের কারোরই খুব বেশি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নেই।
দুই দিনের ম্যাচে আগে ব্যাট করে বাংলাদেশ একাদশ ৭৩.২ ওভারে অলআউট হয়েছে ২৫৩ রানে। লিটন, জাকের আলি অনিক, মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন; এই তিনজন ৩০ থেকে ৪০ রান করে রিটায়ার করে অন্যদের সুযোগ দিয়েছেন। প্রতিপক্ষে প্রধান দুই বোলার, ডানহাতি পেসার জাইর ম্যাকঅ্যালিস্টার যিনি ২ উইকেট নিয়েছেন তার ১৬টা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও তার সঙ্গী বামহাতি ফাস্ট মিডিয়াম শ্যারন লুইস লাল বলে একদমই অনভিজ্ঞ। কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেননি, সবমিলিয়ে গোট তিনেক স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি খেলেছেন বছর ২৬ ছাড়ানো এই ক্রিকেটার। আরেক পেসার নাথান এডওয়ার্ডস, তরুণ বামহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার, মূলত বোলিং অলরাউন্ডার। তারও স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডে খেলার মোট অভিজ্ঞতা ৪ ম্যাচ, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা হয়নি এখনো এই সদ্য ১৯ ছাড়ানো ক্রিকেটারের। এদেরই বিপক্ষে মাহমুদুল হাসান জয় করেছেন ৮ রান, জাকির হাসান ১৫, মমিনুল হক ৩১। এবারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের তালিকায় নজর দেওয়া যাক। আবির্ভাবেই অস্ট্রেলিয়াকে কাঁপিয়ে দেওয়া শামার জোসেফ, নিয়মিত ১৪৭ কিলোমিটার গতিবেগে বোলিং করা আলজারি জোসেফ, ক্যারিয়ারের ২৭৩ উইকেটের ভেতর বাংলাদেশের বিপক্ষেই ৪৪ উইকেট নেওয়া কেমার রোচ; এরা তিনজন হচ্ছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম পছন্দ। এরপর আছেন জেইডেন সিলস, সবচেয়ে কমবয়সে ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পেসার। তাদের বিপক্ষে অবস্থাটা কেমন হতে পারে তার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে আগের সিরিজগুলোতেই।
বরং বাংলাদেশের পেস বোলিংটা নিয়ে হওয়া যেতে পারে আশাবাদী। পাকিস্তানের মরা উইকেটে যেভাবে হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদরা বোলিং করেছেন, ভারতের বিপক্ষে চেন্নাইতে হাসান যেভাবে কন্ডিশনটা কাজে লাগিয়েছেন; ওয়েস্ট ইন্ডিজে তাদের জন্য অবারিত দ্বার। হাসান মাহমুদ, তাসকিন, শরিফুল প্রত্যেকেই উইকেট পেয়েছেন প্রস্তুতি ম্যাচে, প্রতিপক্ষ ৮৯ রান তুলতেই ৯ উইকেট হারিয়েছে। ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটকে শূন্য রানে ফিরিয়েছেন হাসান মুরাদ, হ্যাটট্রিক করেছেন এই বামহাতি স্পিনার। নাহিদ উইকেট না পেলেও ভালো বোলিং করেছেন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বোলিংটাই এই মুহূর্তে বেশি আশা জোগাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট শুরুর ঠিক আগে আগে। ব্যাটিংটা যেমন ছিল তেমনই আছে। মুশফিক, শান্তদের অবর্তমানে কাউকে নিয়ে খুব জোরালো প্রত্যাশাও নেই আবার তারা অতীতে থেকেও যে দলকে খুব বড় সংগ্রহ এনে দিয়েছেন এমন উদাহরণও নেই। চট্টগ্রামের মতো ব্যাটিং স্বর্গেও সবশেষ টেস্টে যে দলটা নিজেদের কোনো ইনিংসেই ২০০ রান করতে পারেনি, তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজে ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে খুব ভালো কিছু করে ফেলবে এমন ভাবনা অবান্তর। কোচের হাতে এমন কোনো জাদুকরী বটিকাও নেই যা গিলিয়ে দিলে জয়-জাকির-সাদমানরা ব্র্যাডম্যান টেন্ডুলকার হয়ে যাবেন। তার চেয়ে আরেকটা ৪৩ রানে অলআউট যেন না হয় এটাই প্রত্যাশা, এর বেশি যা হবে তা বাড়তি পাওনা।
