দেশে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে শহীদদের পরিবার এবং আহতদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানে সাত দফা পরিকল্পনা নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আন্দোলনে আহতরা সব ধরনের সরকারি হাসপাতালে আজীবন বিনামূল্যে সব ধরনের চিকিৎসা ও সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবেন। শহীদ পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা করে। এ ছাড়া আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শহীদ এবং আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই পরিকল্পনা তুলে ধরেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ এবং গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত বিশেষ সেলের দলনেতা খন্দকার জহিরুল ইসলাম (অতিরিক্ত সচিব) পরিকল্পনার বিভিন্ন শহীদ-আহতদের অংশ উপস্থাপন করেন।
সম্মেলনে আহতদের চিকিৎসার প্রসঙ্গ তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, আহতদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ফাস্ট ট্র্যাক চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। দেশের সব হাসপাতালে এই নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সব হাসপাতালে আহতরা সব ধরনের চিকিৎসা আজীবন বিনামূল্যে পাবেন।
আহতদের চিকিৎসার সুবিধার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের কেবিন ব্লককে মাল্টি ডিসিপ্লিনারি হাসপাতাল হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান এই বিশেষ সহকারী। আহতদের যারা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, তাদের স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী বিএসএসএমইউর কেবিন ব্লকে যোগাযোগের অনুরোধ করেছেন তিনি। বিশেষ করে আহতদের বহির্বিভাগ সেবা দিতে বিএসএমএমইউর স্পেশালাইজড হাসপাতালের নিচতলাটি সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড করা হয়েছে এবং সেখানে ফিজিওথেরাপি সেবা যুক্ত করা হবে।
স্বাস্থ্যের বিশেষ সহকারী জানান, সরকার দেশেই রোবটিক্স ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার উদ্যোগ নিচ্ছে। এজন্য যেসব যন্ত্রপাতি আছে, তা বিএসএমএমইউ বা অন্য যেখানে সুবিধা হয় স্থাপন করা হবে। এই সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনে প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল আনা হবে।
ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, দেশের সব হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। আহতদের জন্য বিভাগীয় হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে ডেডিকেটেড বেড থাকবে এবং আহতরা ড্যাশবোর্ডে সহজেই দেখতে পারবেন কোথায় কোন সেবা পাওয়া যাবে।
যারা চোখে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তাদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনা হচ্ছে এবং যদি প্রয়োজন হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিদেশে সুনির্দিষ্ট হাসপাতালে আহতদের পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান বিশেষ সহকারী। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকজনকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে।
আহতদের মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা প্রসঙ্গে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, আন্দোলনে আহতদের মানসিক ট্রমা বা আঘাতের বিষয়ে চিকিৎসার জন্য ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথে (রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল) একটি কেন্দ্রীয় স্থাপনা স্থাপন করা হবে এবং দেশের সরকারি-বেসরকারি যারা এ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ আছেন, তাদের এই নেটওয়ার্কের আওতায় যুক্ত করা হবে। সেখানে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে স্ক্রিনিং হবে এবং ইন পারসন আহতদের কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হবে।
আহতদের উন্নত চিকিৎসায় বিদেশে পাঠানো নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা পরিষ্কার করেন ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমরা স্পষ্ট করতে চাই, যার যার প্রয়োজন ও উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। যখনই যার প্রয়োজন, সেই রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে সেই হাসপাতাল থেকে সুপারিশের ভিত্তিতে একটি বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে তাদের বিদেশে হাসপাতালে পাঠানোর সব রকম ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে রোগী এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো শুরু হয়েছে।
আহত ও শহীদের তালিকা প্রণয়ন ও শ্রেণিকরণ কার্যক্রম তুলে ধরে সারজিস আলম বলেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিদ্রুত নির্ভুল ও সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশের কাজ চলছে। আমরা চাই আহতদের এই লিস্টটা আজকে নয়, ২০ বছর পরে হলেও যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। সেজন্য সময় নিয়ে হলেও বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে আমরা ভেরিফিকেশন করছি। আমরা নভেম্বরের ভেতর চেষ্টা করব শহীদ পরিবারের যে তথ্য আছে, সেটার ভেরিফিকেশন শেষ করতে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শহীদ এবং আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।
সরকারের অর্থ সহায়তার পরিকল্পনা তুলে ধরে মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ জানান, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে আহতদের শ্রেণীকরণের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিকভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সর্বোচ্চসীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে চিকিৎসার জন্য যার যত টাকা খরচ হয়েছে, ডকুমেন্টসসহ সেলে জমা দিলে যথাযথ ভেরিফিকেশন করে আহতদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, এ টাকাটা ৩ লাখ টাকার সঙ্গে জড়িত নয়। এটি সম্পূর্ণ আলাদা।
পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে খন্দকার জহিরুল ইসলাম বলেন, আহতদের পুনর্বাসনের একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা সরকার থেকে করা হবে। জুলাইয়ের আন্দোলনে অনেকে আহত হয়েছেন, যারা শারীরিকভাবে আহত হয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যাতে কর্মজীবনে ফিরে আসার পথ ব্যাহত হতে পারে। এজন্য সরকার কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, যাতে আহতদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবার এবং যারা আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা সরকারের আছে।
এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শহীদ পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কাজ চলমান। যারা পঙ্গু বা অন্ধ হয়ে গেছেন ও একেবারেই কোনো কাজ করতে পারবেন না, তাদের আজীবন ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। আহতদের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়া হবে।
আইনি ব্যবস্থার পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, নিহতদের পক্ষ থেকে যেভাবে সরকার আইনি লড়াই শুরু করেছে, একইভাবে আহতদের পক্ষ থেকেও সরকারি বাদী হয়ে মামলা করা হবে। নিহত ও আহতদের চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অবহেলা এবং গাফিলতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিহ্নিত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
