বন্ধ নয় নীতিমালার পরামর্শ

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:০৫ এএম

ঢাকা মহানগর এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এরপর দুদিন ধরে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। হামলা করেছেন মার্কেটসহ কয়েকটি স্থাপনায়।

১৫ লাখের মতো মানুষ এই পেশায় নিয়োজিত আছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যেন বেকার না হয়ে পড়ে সেজন্য বিকল্প উপায় বের করার পরামর্শ দিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, ব্যাটারি, মোটর আমদানি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকায় দেশে এসব যান তৈরি ও চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব যানের সংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা জড়িয়ে গেছে।

মহাসড়কে এসব যান চলাচলের অনুমোদন দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবিক দিক বিবেচনা করলে শহরের শাখা সড়ক এবং বাইরে জেলা শহর ও মহাসড়কে সার্ভিস রোডে স্বল্পদূরত্ব বাহন হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা যেত পারে। কিন্তু কোনোভাবেই শহরের প্রধান সড়কে চলতে দেওয়া যাবে না।

অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা এ-সংক্রান্ত নীতিমালা দাবি করেছেন। তারা বলছেন, জীবিকার তাগিদে প্রধান সড়ক বাদে নীতিমালা মেনে শাখা সড়কগুলোতে রিকশা চালাতে চান তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে রাজধানীতে আট লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। মূলত ২০১০ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই রিকশা সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিগত সরকারের আমলে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এই যান নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এসব যান চলাচল বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েও প্রতিবাদ বিক্ষোভের মুখে পিছু হটে। এখন চালকরা একটি নীতিমালা

করে প্রধান সড়ক বাদে শাখা সড়কগুলোতে চলাচল করার অনুমতি চান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে।

আবদুল রাজ্জাক নামে নীলফামারী এলাকার এক চালক দেশ রূপান্তরকে জানান, ৪০ বছরের বেশি সময় হবে রিকশা চালান তিনি। এখন প্যাডেলচালিত রিকশা চালাতে পারেন না। তাই গত বছর থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান মগবাজারের আশপাশের এলাকায়। কিন্তু হঠাৎ বন্ধের ঘোষণায় রোজগার নিয়ে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন। এখন রিকশা না চললে পরিবারকে কীভাবে টাকা পাঠাবেন। আর নিজেই বা কীভাবে চলবেন।

মো. মান্না নামে বাবুবাজার এলাকার এক চালক বলেন, ‘সরকার সমস্যার সমাধান না করে এভাবে বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে, সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত লাখ লাখ মানুষকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। এক দিন যদি রিকশা না চালাই পরের দিন খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। নিয়ম-কানুন মেনে আমরা রিকশা চালাতে চাই।

রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, ‘হুট করে হাইকোর্ট থেকে বন্ধের ঘোষণায় আমরা শঙ্কিত। আমরা প্রধান সড়কে রিকশা চালাতে চাই না। আমরা চাই একটি নীতিমালা হোক। সেই নীতিমালা মেনে সড়কে রিকশা চলবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবস্থা করুক।’

তিনি আরও বলেন, দিন-রাতে মিলে ১৫ লাখের মতো চালক জড়িত এই পেশায়। প্রতিদিন ১ হাজার টাকার মতো আয় হয় এই ব্যাটারিচালিত যান থেকে চালকদের। অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে এই ব্যাটারিচালিত যান চালিয়ে। তাই এসব বিবেচনা করে বর্তমান সরকার একটি ভালো সমাধান দেবে সেটির প্রত্যাশা করেন তারা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৫ বছর ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সেজন্য রাজধানীতে এ অবৈধ রিকশা এত বেড়ে গেছে। তাই এর দায় শুধু যে চালকদের তা নয়। এর দায় সে সময়ের নীতিনির্ধারকদেরও আছে। তবে এখন রাতারাতি এটা বন্ধ করা ঠিক হবে না। কারণ এটার সঙ্গে এখন লাখ লাখ চালকের জীবন-জীবিকা জড়িত।’

তিনি আরও বলেন, একটি নীতিমালার আওতায় শাখা সড়কগুলোতে এই রিকশা চলাচল করতে পারে। সেই সঙ্গে শাখা সড়কগুলোতেও ২০ ধরনের যানবাহন চলে। তাই সেখানেও সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে কোন রুটে কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে পারবে। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশার গুণগতমান আরও বাড়াতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে এসব রিকশার কাঠামো তৈরি করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত