হয়রানির একই ছবি বিমানবন্দরে

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২৯ এএম

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধে হেল্পডেস্ক চালু করা হয়। এ ছাড়া বিনামূল্যে এক ঘণ্টা ওয়াইফাই সুবিধাও পাচ্ছেন যাত্রীরা। বিমানবন্দরে পৌঁছে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের ঝক্কি কমাতে চালু হয়েছে ১০টি টেলিফোন বুথ। চালু হয়েছে প্রবাসীদের জন্য ওয়েটিং লাউঞ্জ। কিন্তু বন্ধ হয়নি যাত্রী হয়রানি। নানা উদ্যোগেও হয়রানি বন্ধে নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বিদেশে যাওয়া ও আসার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও সদস্যদের দ্বারা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী আখ্যা দিয়ে পাসপোর্ট তল্লাশির পাশাপাশি ছাড়পত্র নেওয়ার কথা বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হচ্ছে। এতে কারও কারও ফ্লাইট মিস করার ঝুঁকিতেও পড়ার উপক্রম হচ্ছে। এ ছাড়া বেল্ট থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে লাগেজ পাওয়ার কথা থাকলে এক ঘণ্টায়ও তা পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি কোনো কোনো যাত্রীর লাগেজও কাটা পড়ছে।

সম্প্রতি নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবিরকে দেশের বাইরে যাওয়া ও আসার সময় হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি প্রধান উপদেষ্টার নজরে এলে হইচই পড়েছে দেশ-বিদেশে। ইতিমধ্যে তদন্ত করার নির্দেশনা এসেছে। গতকাল রবিবার পুলিশের বিশেষ ইউনিট স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে। অভিযুক্ত সদস্যকে প্রত্যাহারও করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিউ এজ সম্পাদকের ঘটনাটি আসলেই দুঃখজনক। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিষয়ে বিমানবন্দরে কিছু নির্দেশনা ছিল। তিনি দেশের বাইরে যাওয়ার সময় শাহজালালের তদারকি কর্মকর্তা বা সদস্যরা তা বুঝতে পারেনি। তবে এভাবে হয়রানি করা মোটেই ঠিক হয়নি। অনেকেই এ ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শাহজালালসহ দেশের সবকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিবর্তন আনা হয়। নতুনদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকেই তা বোঝেন না। কীভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে সেজন্য নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের। তারপরও চেষ্টা চলছে পরিস্থিতি উন্নতি করতে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দেশের সবকটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা আরও বৃদ্ধি করতে সম্প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে বেবিচক। এখনো বিমানবন্দরে নিরাপত্তার ঘাটতি আছে। ঘাটতি পূরণ করতে আরও কঠোর নিরাপত্তার বলয় গড়ে তুলতে বলা হয়। বর্তমানে দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০টির মতো বিমান সংস্থা বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকটি এয়ারওয়েজ যাত্রীবাহী বিমান সার্ভিস ছাড়াও ১০-১২টি বিমান সংস্থা কার্গো বিমান ও হেলিকপ্টার সার্ভিস পরিচালনা করছে। প্রতিদিন ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করে। কিন্তু বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ঘাটতি আছেই। যাত্রী আসা-যাওয়ার সময় তল্লাশির নামে হয়রানি করা হচ্ছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে না বলে অভিযোগ উঠেছে। অ্যাভসেক ও আমর্ড ব্যাটালিয়ন পুলিশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এপিবিএনের অফিস নিয়ন্ত্রণে নেওয়াকে কেন্দ্র করে অ্যাভসেকের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। দেশের সব বিমানবন্দরের নিরাপত্তা আরও বাড়াতে বেবিচক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতনরা কয়েক দফা বৈঠক করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিমানবন্দরের আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালায় কর্তৃপক্ষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুরনো সব কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের সরিয়ে নতুনদের আনা হয়। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা যাতে দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। ইমিগ্রেশনে তল্লাশির মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয় কয়েকগুণ। তবে এতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

নাম প্রকাশ না করে দুজন সংবাদকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাস দুয়েক আগে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়ার সময় নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। বিকেল ৫টার ফ্লাইটটি প্রায় মিস হয়ে যাচ্ছিল। রাজনৈতিক দলের মতাদর্শী কি না, তা জানতে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখে। তাদের মতো সৌদিপ্রবাসী এক শ্রমিকের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। তাকেও রাজনৈতিক কানেকশন আছে কি না, সেই বিষয়ে জেরা করা হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর সকালে এমিরেটস ফ্লাইটে রুম্মান নামে ইতালিপ্রবাসী ঢাকায় আসেন। কিন্তু বেল্ট থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পর লাগেজ পান তিনি। লাগেজটি ট্রলিতে নেওয়ার পর তিনি দেখতে পান সেটি কাটা। চিৎকার-চেঁচামেচি করলে এই প্রতিবেদক বিষয়টি জানার চেষ্টা করেন। রুম্মান জানান, লাগেজ কেটে সবকিছু নিয়ে গেছে। বিষয়টি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

নূরুল কবিরকে হয়রানি, এসবির দুঃখ প্রকাশ : নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবিরকে হয়রানির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। এ ছাড়া ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে সংস্থাটি। গতকাল পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা জানায়, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলের ‘ব্লকড লিস্ট’-এর কারণে এ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটেছে। এ তালিকায় কয়েক হাজার লোককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাতে করে তাদের বিদেশ সফরের সময় আটকে দেওয়া যায় বা বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত রাখা যায়। অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পুলিশের বিশেষ শাখা আগের তালিকা থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তি, ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের বাদ দিতে শুরু করে। কাজটির বেশিরভাগই হাতে-কলমে করা হচ্ছে। ফলে কিছু ভিন্নমতাবলম্বী ও সাংবাদিকের নাম এখনো রয়ে গেছে। তালিকাটি দ্রুত যাচাই করে সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এসবি জানায়, বাংলাদেশ পুলিশ জনগণের বন্ধু। দেশ ও জনগণের সেবায় পুলিশ বাহিনী দৃষ্টান্ত গড়তে চায়।

এর আগে গত শনিবার নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডি থেকে এক স্ট্যাটাসে বিগত দেড় দশক থেকে হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরেন নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির। ইংরেজিতে লেখা স্ট্যাটাসটিতে তিনি অভিযোগ করেন, কলম্বো থেকে আসা-যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে দুই দফায় হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তিনি ১৮ নভেম্বর এশিয়া মিডিয়া ফোরাম ২০২৪-এ যোগ দিতে কলম্বো যান এবং ২২ নভেম্বর দেশে ফেরেন। তিনি লেখেন, ‘দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিবার বিদেশে যাওয়ার সময় আমাকে হয়রানি করছে।’ নূরুল কবির তার পোস্টে অতীতের হয়রানির উদাহরণ টেনে বলেন, সঠিক নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তাকে বিদেশ ভ্রমণের কারণ নিয়ে জেরা করা হয়েছে। কখনো পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে, আবার কখনো পাসপোর্টের পাতা স্ক্যান করে ছবি তোলা হয়েছে, যা তার গোপনীয়তার লঙ্ঘন। এমনকি ফ্লাইট উড্ডয়নের কিছুক্ষণ আগে তা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা মূলত দেশ ছাড়ার সময় ঘটে কিন্তু ফেরার সময় ঘটে না এমনটা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘এবার ১৮ নভেম্বর যখন আমি একটি মিডিয়া কনফারেন্সে যোগ দিতে যাচ্ছিলাম, তখন ভেবেছিলাম হয়রানির দিন হয়তো শেষ হয়েছে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। এবার হয়রানি দ্বিগুণ হয়েছেÑ প্রস্থানকালে এক ঘণ্টা এবং ২২ নভেম্বর দেশে ফেরার সময় আরও এক ঘণ্টা।’ তিনি তার পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশপ্রেমিক হওয়া মানেই যেন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে সন্দেহভাজন হওয়া। ফলে আমি সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং তাদের সুপারভাইজ করা সরকারের দেশপ্রেম নিয়েই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হচ্ছি।’ নূরুল কবিরের এ অভিযোগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। তারপরই মূলত এসবি থেকে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়া হয়।

বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, যাত্রী হয়রানি এখন অনেক কমেছে। অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যাত্রীসেবার মান বাড়াতে এবং তাদের নানা সমস্যার সমাধানের জন্য চালু করা হয়েছে হটলাইন, ডায়নামিক সফটওয়্যার ও কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) সফটওয়্যার। যাত্রীসহ যেকোনো ব্যক্তি হটলাইন নম্বরে কল করে তথ্য জানতে পারবেন এবং সমস্যা সমাধানের জন্য পরামর্শও চাইতে পারবেন। যাত্রী লাঞ্ছনা, লাগেজ কেটে চুরি, ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমসসহ পদে পদে হয়রানি। অব্যবস্থাপনা-অনিয়মই যেন হয়ে উঠেছিল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিত্র। তবে এবার পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে এখানেও। বদলেছে যাত্রীসেবা। হেল্পডেস্কে দিনরাত কাজ করছেন ৫৪ জন কর্মী। বিনামূল্যে এক ঘণ্টা ওয়াইফাই সুবিধাও পাচ্ছেন যাত্রীরা। বিমানবন্দরে পৌঁছে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের ঝক্কি কমাতে চালু হয়েছে ১০টি টেলিফোন বুথ। কথা বলা যাচ্ছে বিনামূল্যে। তিনি আরও বলেন, যাত্রীরা ঘরে বসেও বিভিন্ন তথ্য জানতে পারবেন, পাবেন সেবা। কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, এয়ারলাইনসের তথ্যসহ যেকোনো সমস্যার পরামর্শ পেতে পারবেন। হটলাইনের কল সেন্টারে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং বিভিন্ন তথ্যও জানতে পারবেন। ফলে যাত্রীদের হয়রানি কমবে। বিমানবন্দরের কল সেন্টারের ০৯৬১৪০১৩৬০০ নম্বরটি চালু আছে। এর শর্ট কোড ১৩৬০০-তে কল করে বিভিন্ন এয়ারলাইনস-সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারবেন যাত্রীরা।

পরিবহন কাউন্টারে চলে নানা অনিয়ম : বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনের আড়ালে ডলার, স্বর্ণ পাচারসহ নানা দুর্নীতিতে জড়িত হয়ে পড়েছেন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিমানবন্দর বহির্গমন টার্মিনালের ভেতর শুল্কমুক্ত দোকান ও পরিবহন কাউন্টার ঘিরেও চলছে নানা অনিয়ম। এতে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। বেবিচক অনুমোদিত ছয়টি বেসরকারি পরিবহন কাউন্টার আছে বিমানবন্দরে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পাঁচটি ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে একটি কাউন্টার। আবার বিভিন্ন পেশার কিছু ব্যক্তি বেবিচকের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কাউন্টার লিজ নিয়ে অন্যত্র ভাড়া দিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। এসব কাউন্টার ঘিরে বেবিচকের বৈধ পাসধারী পরিবহনকর্মীর পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল চক্র। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা বিমান থেকে নামার পর ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজ শেষে গন্তব্যে পৌঁছতে কার পার্কিং এলাকায় আসামাত্র চক্রটির খপ্পরে পড়েন। তাদের টানাহেঁচড়ায় যাত্রীরা অতিষ্ঠ। এ সময় বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়ায় গাড়ি নিয়ে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত