শত বছর ধরে ঝুড়ির আয়ে বেঁচে আছে দেড়শ পরিবার 

  • ফরিদপুরের মল্লিকপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের পেশা ঝুড়ি তৈরি করা
  • খরচ বাদে প্রতিটি পরিবারের সপ্তাহে আয় ৪০০০-৫০০০ টাকা
  • প্রতিটি তল্লা বাঁশ দিয়ে তৈরি করা যায় ৪-৫টি ঝুড়ি 
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৩ পিএম

শত বছরের বেশি সময় ধরে ফরিদপুরের চাঁদপুর পূর্ব মল্লিকপাড়া গ্রামের দেড়শ পরিবার বাঁশ দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। এ কারণে ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের এ গ্রামটি এখন ‘ঝুড়ির গ্রাম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এখানের বসবাসরত বাসিন্দারা ছোটখাটো ক্ষেত-খামারের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বছরের বেশির ভাগ সময় ঝুড়ি তৈরি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাদের রোজগারের প্রধান পেশা ঝুড়ি বানানো। সকাল থেকে রাত অবধি নারী-পুরুষের সঙ্গে তাদের ছেলে-মেয়েদেরকেও ঝুড়ি তৈরির কাজ করতে দেখা যায়। 

সরেজমিনে ‘ঝুড়ির গ্রাম’ গিয়ে জানা যায়, ফরিদপুর-রাজবাড়ী মহাসড়কের ধুলদি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাইপাস সড়কের প্রায় চার কিলোমিটার ভিতরে ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড ৯টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। এ ওয়ার্ডের চাঁদপুর পূর্ব মল্লিকপাড়া গ্রামের বাসিন্দারাই শুধু ঝুড়ি তৈরির কাজ করেন। এ গ্রামে প্রায় ২০০ পরিবারের বসবাস করে। তাদের মধ্যে ঝুড়ি বানানোর কাজ করেন অন্তত দেড়শো পরিবার। যুগের পর যুগ এ গ্রামের মানুষ ঝুড়ি তৈরির কাজ করে সংসার চালান। এটাই তাদের একমাত্র পেশা। মল্লিকপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার ধারে, উঠানে, বারান্দায়, দোকানের সামনে বসে ঝুড়ি তৈরি করছেন শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা। এসব বাড়িতে বউ হয়ে আসা নারীরাও শিখে নিয়েছেন ঝুড়ি বুনানোর কাজ। 

স্থানীয় বাসিন্দা বাবর আলী মল্লিক বলেন, তিনি তার বাবার কাছ থেকে এই ঝুড়ি তৈরির কাজ শিখেছিলেন। এই ঝুড়ি তৈরি করেই সংসার চালান। বাবর আলী এবং তার স্ত্রী মিলে প্রতি সপ্তাহে ছোট-বড় মিলে কমপক্ষে ৫০-৬০টি ঝুড়ি তৈরি করতে পারেন। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে তাদের আয় হয় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। তবে বাঁশের দাম বেশি হওয়ায় আগের থেকে খরচ বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় ঝুড়ির দাম কম। ‘তল্লা বাঁশ’ দিয়ে তৈরি হয় ঝুড়ি। প্রতিটি বাঁশ ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনতে হয়। একটি বাঁশ থেকে চার থেকে পাঁচটি ঝুড়ি তৈরি করা যায় বলে জানান তিনি।

নিজ বাড়িতে ঝুড়ি তৈরি করছেন এক ব্যক্তি | ছবি: দেশ রূপান্তর

নাছিমা বেগম নামে এক গৃহবধূ বলেন, ‘আমাদের এখানে চার প্রকারের ঝুড়ি তৈরি হয়। এ পেশাকে আমরা ক্ষুদ্র কুটির শিল্প হিসেবে বেছে নিয়েছি। নারী হিসেবে আমি নিজেকে একজন উদ্যোক্তা মনে করি। আমি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাদের ঝুড়ি নিয়ে কথা বলেছি। সারা বছর ধরে এই কাজ চললেও বছরের অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাঁশের ঝুড়ির চাহিদা থাকে বেশি। ওই সময় ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো ঝুড়ি সরবরাহ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। আমরা এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ঝুড়ি তৈরির কাজ করি।’ তবে এ পেশাকে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প হিসেবে নিয়ে কম সুদে সরকারি ঋণ দেওয়ার দাবি জানান এই গৃহবধূ।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট এলাকার ঝুড়ি ব্যবসায়ী আতিয়ার খালাসী জানান, গত ১৮ বছর ধরে চাঁদপুর মল্লিকপাড়া গ্রাম থেকে ঝুড়ি কিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে আসছেন। প্রতি সপ্তাহে এই গ্রাম থেকে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ঝুড়ি সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর এগুলো মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন। প্রতিটি ঝুড়িতে সব খরচ বাদে তিনি ২০-৩০ টাকা লাভ করেন। এখানকার ঝুড়ির মান ভালো। তাই বিভিন্ন জেলায় এর কদর বেশি। 

ঈশান গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কালাম শেখ বলেন, ‘পূর্ব মল্লিকপাড়া গ্রামে বানানো বাঁশের ঝুড়ি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহ্য। তাদের কারণে গ্রামের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। বর্তমানে গ্রামটি ঝুড়ির গ্রাম হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। এটাই এখন আমাদের গর্ব। এ পেশায় কাজ করে অনেকেই এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।’ 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত