সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলায় ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ (ডিএমআরসি)। ১২-তলা ভবনবিশিষ্ট কলেজটির প্রতিটি ফ্লোরই ভাঙচুর করা হয়। গত সোমবারের হামলার পর কলেজ জুড়ে ছড়িয়ে আছে শুধু ভাঙচুরের চিহ্ন। কর্র্তৃপক্ষ বলছে, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাদের আনুমানিক ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় খুব দ্রুতই কলেজের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও ছিল। তবে কোনোরকম হট্টগোল না থাকলেও গত সোমবারের ঘটনায় কলেজ ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ছিল। হামলায় কলেজের প্রশাসনিক এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বন্ধ রয়েছে সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম।
গতকাল কলেজ ভবনের দ্বিতীয়তলায় কলেজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কক্ষ রেকর্ড রুমে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট, মার্কশিট ও রেজিস্ট্রেশনের হাজার হাজার কাগজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কর্মীরা নষ্ট হওয়া কাগজপত্রগুলো গোছানোর চেষ্টা করছেন। রেকর্ড রুমে কাজ করা অফিস সহকারী মো. এমদাদ বলেন, ‘হামলাকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিটা করেছে শিক্ষার্থীদের। তাদের জীবনের অর্জনের সার্টিফিকেট ও মার্কশিটগুলো নষ্ট করে দিয়েছে। আমি রাস্তা থেকেও অনেক মার্কশিট খুঁজে এনেছি। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সব কাগজ আমাদের রেকর্ড রুমে সংরক্ষরণ করা ছিল। কিন্তু তারা সব শেষ করে দিয়েছে।’
ডিএমআরসি কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ নয়ন বলেন, ‘আমাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা বলার মতো নয়। আমাদের প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। এ বিষয়ে আমরা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এভাবে অতর্কিত হামলা কারোই কাম্য নয়। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রত্যেক ছাত্রদের নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করতে হবে। আমি প্রত্যেক ছাত্রকে অনুরোধ করব কেউ যেন এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হয়।’ সাংবাদিকদের সামনে এদিন হামলার নেপথ্যের ঘটনা তুলে ধরেন ওবায়দুল্লাহ নয়ন। তিনি বলেন, “অভিজিৎ হাওলাদার নামে এক শিক্ষার্থী মোল্লা কলেজ থেকে এ বছর এইচএসসি পাস করেছে। সে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ন্যাশনাল মেডিকেলে ভর্তির দুদিন পর মারা যায়। তবে আমাদের শিক্ষার্থীদের ধারণা, ভুল চিকিৎসায় অভিজিতের মৃত্যু হয়েছে। এজন্য শান্তিপ্রিয় সমাবেশ করতে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে যায় আমাদের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আমি আমাদের চার সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষক প্রতিনিধি পাঠিয়ে সেখান থেকে ছাত্রদের নিয়ে আসি। আমরা ন্যাশনাল মেডিকেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত সমাধান দেওয়ার জন্য বলি। কিন্তু আমরা সেই সমাধান পাইনি। এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার আমাদের কলেজেরসহ ৩৫ কলেজের শিক্ষার্থীরা মিলে সেখানে তদন্তের বিস্তারিত জানতে যায়। এ সময় সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুল কলেজের ছাত্ররা আমাদের এবং অন্যান্য কলেজের ছাত্রদের ওপর আঘাত হানে, যার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্ররা গিয়ে সেখানে আক্রমণ করে। এরপর সোহরাওয়ার্দীর ছাত্ররা ‘মেগা মানডে’ নাম দিয়ে মোল্লা কলেজ উড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর সোমবার এ ঘটনা ঘটায়।”
অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ নয়ন দাবি করেন, ‘সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষের উসকানিতে এমন ঘটনা ঘটেছে।’
এদিকে গতকাল সকাল থেকে মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে কোনোরকম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহসীন হুসাইন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন অবনতি না হয়, সেজন্য দুই প্লাটুন ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করছে।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) জসীম উদ্দীন বলেন, ‘দুই কলেজ ও ন্যাশনাল হাসপাতালে হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। সেদিনের ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত ও আমাদের একটি এপিসি ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার নেই।’
অভিজিৎ মৃত্যুর ঘটনায় ন্যাশনাল হাসপাতালের সংবাদ সম্মেলন : মূলত ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ড. হাবিবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী অভিজিতের মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগ কেন্দ্র করেই তিন প্রতিষ্ঠানে এমন নারকীয় হামলা চালায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ঘটনার আদ্যোপান্ত জানাতে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলন করেন হাসপাতালটির পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্রফেসর ডাক্তার ইফফাত আরা। সেখানে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘রবিবার (২৪ নভেম্বর) মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন কলেজের প্রায় এক থেকে দেড় হাজার শিক্ষার্থী হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যালয়, বহিঃবিভাগ, জরুরি বিভাগ, দন্ত বিভাগ ও প্যাথলজি বিভাগে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এ ছাড়া ক্যাশ কাউন্টারে ভাঙচুর করে নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। হাসপাতালের অভ্যন্তরে দেশি-বিদেশি ছাত্রছাত্রী, সাধারণ রোগী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক সেবায় নিয়োজিত পূবালী ব্যাংকের শাখাতেও ব্যাপক ভাঙচুর করে। তাদের হামলায় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়।’ অভিজিৎ মৃত্যুর বিষয়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ড. শামসুর রহমান বলেন, ‘মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। তারপরও কেন কলেজে হামলা হলো তা আমাদের বোধগম্য নয়। তদন্তের জন্য কয়েকজন ডাক্তারকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
