চারের লক্ষ্য সেরা তিনে জায়গা পাওয়া

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ১২:২৩ এএম

২৯ নভেম্বর মাঠে গড়াচ্ছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ১৭তম আসর। ১০ দল নিয়ে এবারের লিগটা একটু অন্যরকম। দেশের রাজনৈতিক পালাবদলে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্লাবগুলো। দল গঠনই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।

তাই বাধ্য হয়ে পেছাতে হয় লিগ। এই অন্যরকম লিগের ১০ দল নিয়ে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব আজ

দেশের ৫২ বছরের ফুটবল লিগের ইতিহাসে বেশ কিছু ক্লাব খুঁজে পাবেন, যাদের দৃষ্টি কখনই শিরোপায় থাকে না। এই ক্লাবগুলো মাঝারি মানের দল গড়ে টিকে থাকা নিশ্চিতের পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান যতটুকু ওপরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে খেলে। এমন লক্ষ্যে ছুটতে গিয়ে যদি আরও বড় কিছু মিলে যায় ক্ষতি কী! বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ১৭তম আসরে এ-রকম লক্ষ্য আছে চার দলের। বাংলাদেশ পুলিশ এফসি, ফর্টিজ এফসি, রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি এবং ব্রাদার্স ইউনিয়নের লক্ষ্যটা অভিন্ন সেরা তিনে জায়গা করে নেওয়া।

এই ক্লাবগুলো যে মানের দল গড়েছে, তাতে তাদের অবনমন শঙ্কা সেভাবে নেই। বরং আছে, শিরোপায় চোখ রাখাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার সামর্থ্য। দিনটা নিজেদের করতে পারলে তারা ঘটিয়ে ফেলতে পারে বড়সড় অঘটন। সে-রকম কিছু একাধিকবার ঘটানোর পাশাপাশি খর্ব শক্তিদের হারানো ও সমশক্তিদের সঙ্গে লড়াইয়ের ফল নিজেদের দিকে টানতে পারলে তো কথাই নেই। সমীকরণ মিলে গেলে তারা দেখতে পারে শিরোপার স্বপ্নও!

গত চার মৌসুম ধরে পুলিশ খেলছে শীর্ষ লিগে এবং ক্রমশই তারা উন্নতি করছে। গত দুই মৌসুমেই পুলিশের উন্নতি স্পষ্ট। গত মৌসুমে চতুর্থ হওয়া পুলিশ তার আগের মৌসুম শেষ করেছিল পয়েন্ট টেবিলের তিনে। এই উন্নতির ধারাটা অবশ্য এবার অব্যাহত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব পড়েছে এই ক্লাবেও। প্রাথমিকভাবে শিরোপায় চোখ রেখে দল গড়লেও পরে তারা বাধ্য হয় পছন্দের বিদেশিদের ছেড়ে দিতে। ক্লাব কর্তারা কম টাকায় ভালো বিদেশি এনে প্রতিবারই ফল পেয়েছেন। এবারও সেই পরিকল্পনাই ছিল। আগের তিন মৌসুমে রোমানিয়ান কোচ থাকলেও এবার তারা স্প্যানিশ কোচের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে আগের ভাবনা থেকে সরতে হয়েছে। ফলে সহকারী কোচ মাহবুবুল হক জুয়েলকে পালন করতে হবে কোচের দায়িত্ব। জাতীয় দলের সাবেক এই খেলোয়াড় বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতির কারণে আমরা কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছি। যদিও প্রাথমিকভাবে আমরা শিরোপার লক্ষ্যে দল গড়েছিলাম। পরে সেই মানের বিদেশিদের রাখতে পারিনি। এবার মাত্র দুজন বিদেশি নিয়ে নামব। স্থানীয় নির্ভর দল বলতে পারেন আমাদের। তারপরও চেষ্টা করব সেরা তিন-চারে শেষ করতে। লিগের প্রথম পর্ব ভালো করতে পারলে মধ্যবর্তী দলবদলে আমাদের ভালো বিদেশি নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে।’

ফর্টিজ এফসি গত মৌসুমে হয়েছিল পঞ্চম। তাদের চিন্তাধারাটা ঠিক অন্যদের সঙ্গে মেলানো যায় না। টানা তৃতীয়বারের মতো শীর্ষ লিগে খেলতে যাওয়া ক্লাবটির লক্ষ্য প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করা, যারা পরবর্তী সময়ে জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচা করে তারা জাতীয় দলের ফুটবলারদের দলে নেওয়ার পক্ষে নয়। বরং ভবিষ্যতের তারকা তৈরিতে ঝোঁক। এ কারণেই এই দলে খেলোয়াড়ের অভাব নেই। নিবন্ধনের বাইরে এ দলের অনেক খেলোয়াড় তাদের হাতে আছে। কোচ মাসুদ পারভেজ কায়সারের দাবি, চাইলে দুটি দল গড়ার মতো খেলোয়াড় তাদের আছে। ক্লাব কর্তাদের ভিন্ন ভাবনাটা তুলে ধরে কায়সার বলেন, ‘দেখুন ফর্টিজের পথচলা আর ১০টা ক্লাবের মতো নয়। তারা কখনই জাতীয় দলের তথাকথিত তারকা দলে নেবে না। বরং তারা চেষ্টা করে ভবিষ্যৎ তারকা গড়ে তোলার। লক্ষ্য এমন হলে, কিন্তু শিরোপা স্বপ্ন দেখাটা বোকামি। আমাদের প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি নেই। দল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অনুশীলন করছে। আমিও এই দলটির সঙ্গে টানা তৃতীয় মৌসুমে কাজ করছি। সব মিলিয়ে সেরা তিনে থাকতে পারাটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এরপর যদি সুযোগ থাকে, আমরা শিরোপার জন্য ঝাঁপাব।’ বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনাকে এবার হোম ভেন্যু হিসেবে পেয়েছে ফর্টিজ।

প্রেক্ষাপট বদলে সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে রহমতগঞ্জের। পুরান ঢাকার এই দলটি লিগে অংশ না নেওয়া শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব ও আবাহনীর ছেড়ে দেওয়া বেশ কজনকে নিয়ে গড়েছে দল। আর তাদের আশা আরও বেড়ে যাচ্ছে ডাগআউটে পরীক্ষিত কামাল বাবু থাকায়। প্রায় এক দশক ধরে রহমতগঞ্জের দায়িত্ব পালন করা কামাল বাবু গত মৌসুমে অবশ্য শুরু থেকে ছিলেন না। শেষ চার রাউন্ডের দায়িত্ব নিয়ে দলকে রেলিগেশন থেকে বাঁচিয়েছিলেন। সেই কামাল বাবুই দিচ্ছেন বড় কিছুর প্রতিশ্রুতি, ‘লিগে নিয়মিত খেলা অধিকাংশ প্লেয়ারদের নিয়ে দলটা গড়া হয়েছে। আবাহনী, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলের খেলোয়াড়রা আছেন দলে। এছাড়া ঢাকার মাঠে পরীক্ষিত পাঁচ বিদেশিকে নিয়েছি আমরা। আমাদের লক্ষ্য সেরার লড়াইয়ে থাকা। এই দলটির প্রতি আমার অনেক বিশ্বাস আছে। তারা চারটি প্রস্তুতি ম্যাচেই নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছে।’ প্রাক-মৌসুমে চার প্রস্তুতি ম্যাচে রহমতগঞ্জ মোহামেডান ও নবাগত ফকিরেরপুলকে হারিয়েছে। ড্র করেছে চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনীর সঙ্গে।

এদিকে বিশেষ বিবেচনায় (!) শীর্ষ লিগে টিকে যাওয়া ব্রাদার্সও শেখ জামাল ও শেখ রাসেলের না থাকার সুবিধাটা পেয়েছে দলবদলের বাজারে। তারাও বেশ কজন অভিজ্ঞ ফুটবলারকে পেয়ে এখন আর রেলিগেশনের ভাবনায় পড়ে নেই। গেল কয়েক মৌসুম ধরেই ভীষণ মলিন গোপীবাগের দলটি। গত লিগে সবার নিচে থেকে রেলিগেশনও নিশ্চিত হয়েছিল। তবে পরে বাফুফের বদান্যতায় সেই লিগের রেলিগেশন সিস্টেম বাতিল হয়। সুযোগ পেয়ে গাম্বিয়ান কোচ ওমর সিসের অধীনে দলটি পাঁচজন বিদেশি নিয়ে খেলবে বড় স্বপ্ন নিয়ে। যদিও মুন্সীগঞ্জকে হোম ভেন্যু পাওয়ায় নাখোশ দলটির দীর্ঘদিনের ম্যানেজার আমের খান, ‘প্রথমে আমরা বসুন্ধরা কিংস হোম ভেন্যু করতে চেয়ে পাইনি। পরে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামও প্রস্তুত না হওয়ায় পেলাম না। পরে মুন্সীগঞ্জে যেতে রাজি হয়েছিলাম। তবে শুনলাম দর্শক ও সংবাদকর্মীহীন মাঠে আমাদের খেলতে হবে। ক্লাব অফিশিয়ালদের উপস্থিতি নিয়েও আছে সমস্যা। যদি তাই হয়, তবে সেখান থেকে আমরা হোম হিসেবে কোনো বাড়তি সুবিধাই পাব না। এ অবস্থায় আমরা এই লিগে অংশ নেব কি না, সেটা নিয়ে ক্লাব দ্রুতই জরুরি সভা করবে।’ নিজেদের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে সাবেক এই ফুটবলার বলেন, ‘তবে সব মিলিয়ে আমরা ভালো দলই গড়েছি। এখন মাঠে খেললেই বোঝা যাবে দল কতদূর যেতে পারে।’

পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কমবেশি এই চার ক্লাবেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তাতে কারও পৌষ মাস, কারও হয়তো সর্বনাশ। তারপরও সব কিছু একপাশে রেখে এই চার চায় শিরোপা রেসে থাকাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত