বিতর্ক নিয়েই বঞ্চনার পুরস্কার

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:১১ এএম

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) নতুন পরিচালকের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। মূল বিতর্ক এই পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক। অথচ এই পদের জন্য অধ্যাপক হতে হয়। কিন্তু এই বিতর্কের মধ্য দিয়েই বঞ্চনার পুরস্কারও মিলেছে এই চিকিৎসকের। কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার পদোন্নতি না হওয়ায় তিনি এখনো সহযোগী অধ্যাপক পদেই রয়ে গেছেন। অথচ তার সরকারি চাকরির বয়স আছে মাত্র এক বছর।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত সোমবার ডা. আবুল কেনানকে হাসপাতালের পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়। তিনি কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বর্তমানে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিবদের একজন। মন্ত্রণালয় হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জামানকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছে।

ডা. আবুল কেনানকে পরিচালক পদে নিয়োগের পর থেকেই এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে নিয়োগবিধি ভঙ্গ, বৈষম্য সৃষ্টি ও রাজনৈতিক দলীয়করণের অভিযোগ এনেছেন দেশের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অর্থোপেডিক চিকিৎসক।

অন্যদিকে, ড্যাবসহ বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরোটা সময় পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন ডা. কেনান। এই মুহূর্তে দেশে যে সব জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক রয়েছেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার সরকারি চাকরির বয়স আছে মাত্র এক বছরের মতো। অথচ এখনো তাকে সহযোগী অধ্যাপক করে রাখা হয়েছে। সুতরাং পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তিনি অনেক আগেই অর্জন করেছেন।

এই প্রথম সহযোগী অধ্যাপক পরিচালক: পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জন পরিচালক নিয়োগ পেয়েছেন এখানে। তারা সবাই অধ্যাপক ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৭২-১৯৯৫ সালে পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের অধীনে থাকায় প্রথম চারজন ছিলেন প্রকল্প পরিচালক, পরে ১৯৯৫ সালে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপ নেওয়ার পর ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনজন পরিচালক ও পরে ২০০১-২০০৪ সাল পর্যন্ত ১০ জন ‘অধ্যাপক ও পরিচালক’ দায়িত্ব পালন করেন।

এ ব্যাপারে পঙ্গু হাসপাতালের সাবেক এাক পরিচালক নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক একটি সম্মানিত পদ। এর আগে আর কখনোই সহযোগী অধ্যাপক কাউকে পরিচালক করা হয়নি। এই পদের জন্য অবশ্যই অধ্যাপক হতে হবে। এই পদের নামই হচ্ছে অধ্যাপক ও পরিচালক। নিয়োগবিধিতে এই নাম আছে।’

অধ্যাপক আছেন ১৩ জনের বেশি : অর্থোপেডিক চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পঙ্গু হাসপাতাল ও বাইরে অন্য সরকারি হাসপাতাল মিলে দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থি ১৩ জনের বেশি অর্থোপেডিক বিভাগের অধ্যাপক রয়েছেন। এর মধ্যে পঙ্গু হাসপাতালে আছেন ছয়জন এবং রংপুর, বগুড়া, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও দিনাজপুরসহ আরও কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাতজনের বেশি অধ্যাপক রয়েছেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পঙ্গু হাসপাতালেই এমনও অধ্যাপক আছেন যারা ১২-১৫ বছর ধরে এখানেই চাকরি করছেন। এখান থেকেই সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হয়েছেন। এই ১৩ জনের মধ্যে অধিকাংশের চাকরির বয়স শেষের দিকে। তারা অভিজ্ঞ। তাদের কাউকে পরিচালক পদে দেওয়া যেত।

পঙ্গু হাসপাতালের সাবেক এক অধ্যাপক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটাও দলীয় নিয়োগ হলো। অথচ ড্যাব করেন এমন অধ্যাপকও রয়েছেন যাদের কাউকে পরিচালক করতে পারতেন।

বিতর্ক নিয়েই মিলল পুরস্কার : ডা. কেনানের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক উঠলেও এই পদের তিনি যোগ্য বলে দাবি করেছেন ড্যাবের চিকিৎসকরা। তারা আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ডা. কেনানের বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরে জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিনের চেয়ে ডা. কেনান সরকারি চাকরিতে জ্যেষ্ঠ। এমনকি দেশের বর্তমান অর্থোপেডিক বিভাগের যে সব অধ্যাপক রয়েছেন, ডা. কেনান তাদের সমকক্ষ ও অনেকের চেয়ে জ্যেষ্ঠ। কিন্তু ড্যাব করার কারণে তার পদোন্নতি হয়নি। সহযোগী অধ্যাপকেই আটকে আছেন দীর্ঘ বছর। অথচ তার সরকারি চাকরির বয়স আছে মাত্র এক বছর। 

এ ব্যাপারে ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-আল-রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই যে বিতর্ক উঠেছে পরিচালক হতে অধ্যাপক হতে হবে। কিন্তু ডা. কেনান সহযোগী অধ্যাপক। এখানে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। ডা. কেনান মেডিকেল কলেজের  অধ্যক্ষ, ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক। কিন্তু এমনও আছেন কেনানের চেয়ে সিনিয়র ও যোগ্য, কিন্তু সহকারী অধ্যাপক। অথবা কিছুই হননি, সাধারণ মেডিকেল অফিসার। কারণ তারা রাজনৈতিক রোষানলের শিকার। গত ১৬ বছরে যদি একটি সুষ্ঠু সরকার ও সুষ্ঠু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থাকত, কেনান এতদিনে অধ্যক্ষ ও পরিচালক হয়ে যেতেন। যারা এখন অধ্যাপক আছেন, তাদের অনেক আগেই কেনান অধ্যাপক হতেন। কেনানের ফাইল ২০১৩ সাল, ২০১৫ সাল, ২০১৭ সাল ও ২০১৯ সালের মোট চারটি ডিপিসি (বিভাগীয় পদোন্নতি) থেকে ফেরত এসেছে। শুধু ড্যাব করার কারণে পদোন্নতি পাননি। তাহলে এখন কেনানের যোগ্যতার যে প্রশ্ন উঠছে, তা সঠিক না। এখন যদি তাদের পদায়ন করা হয়, তা হলেই কেবল অতীতে তাদের সঙ্গে করা বৈষম্য দূরীকরণ করা হবে।’

এই চিকিৎসক নেতা বলেন, ‘আমাদের দাবি হলো, যারা রাজনৈতিক কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিগত ১৫-১৬ বছরে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, তাদের ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দিয়ে যোগ্য পদে পদায়ন করা হোক। এমনটা অন্যান্য ক্যাডারে হয়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্য ক্যাডারে হচ্ছে না। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যে সব আমলা বসে আছেন, তারা চিকিৎসকদের বিপক্ষে। তারা স্বাচিপের অথবা বিপক্ষের লোকজন। স্বাস্থ্যে কোনো সংস্কার হয়নি।’

ড্যাবের চিকিৎসকরা জানান, ডা. কেনানের পরিচালক পদে পদায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে দেড় থেকে দুই মাস আগে। কিন্তু তার ফাইল আটকানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হয়েছে। তার ফাইল উঠেছে আর নেমেছে। এমনকি এই পদ পাওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। পরে বিষয়টি মিথ্যা প্রমাণিত হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার পরিচালক পদে পদায়ন চূড়ান্ত করে।

চিকিৎসকরা আরও জানান, ডা. কেনানের সরকারি চাকরির বয়স আছে আর মাত্র এক বছর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফরের চাকরি আছে মাত্র তিন মাস। অথচ এই ডা. জাফর অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিনের চেয়ে চার-পাঁচ বছরের সিনিয়র। ডা. কেনানও ডা. রোবেদ আমিনের চেয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ও চাকরির বয়সে সিনিয়র। একজন মানুষের চাকরি জীবনের যদি ১৫ বছরই পিছিয়ে থাকে, তা হলে তিনি আর কোনোদিনই ওপরে উঠতে পারবেন না। ডা. কেনানরাও এতদিন ওপরে উঠতে পারেননি।

এ ব্যাপারে ড্যাব সভাপতি বলেন, কেনান ঘুষ দেননি বলেই, রাজনৈতিকভাবে আপস করেননি বলেই তার পদোন্নতি হয়নি। যারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তাদের যদি এই সময়ে প্রাপ্য সুবিধা না দেওয়া হয়, তা হলে তারা বঞ্চিতই থেকে যাবেন। অথচ স্বাস্থ্য খাতে এটা একদমই হচ্ছে না। সে কারণে স্বাস্থ্য খাতে অসন্তোষ চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত