অবস্থান বদলে ছাপাতে হলো সাড়ে ২২ হাজার কোটি

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:১৮ এএম

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গভর্নর টাকা না ছাপানোর পক্ষে বলে এলেও অর্থ সংকটে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলোকে নতুন টাকা ছাপিয়েই সরাসরি সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ছয়টি দুর্বল ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেছেন, টাকা না ছাপানোর আগের সিদ্ধান্ত থেকে সাময়িকভাবে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এ সিদ্ধান্ত সাময়িক বলেও দাবি করেন তিনি। গভর্নর বলেন, আগামী রবিবার থেকে কোনো গ্রাহক ব্যাংক থেকে টাকা না পেয়ে ফেরত যাবেন না। তবে গ্রাহকদের অনুরোধ, যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু টাকা তুলেবেন।

গভর্নর বলেন, আমি বলেছিলাম টাকা ছাপাব না। কিন্তু সেটা থেকে সাময়িকভাবে সরে এসেছি। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সেই টাকা আবার তুলে নিয়ে আসব। কিন্তু মনিটরি পলিসি আগের মতো টাইট থাকছে। বাজার থেকে টাকা তুলে বাজারেই দেওয়া হচ্ছে। একদিকে সহায়তা করা হচ্ছে, অন্যদিকে বন্ডের মাধ্যমে তুলে নিচ্ছি। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী এই সহায়তা দেওয়া হবে। আমাকে ডিপোজিটর ও মূল্যস্ফীতি দুটিই রক্ষা করতে হবে। টাকা ছাপাব না বলেছিলাম। কিন্তু মানুষের অবস্থার কি পরিবর্তন হয় না?

হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩তম গভর্নরের দায়িত্ব পান আহসান এই মনসুর। দায়িত্ব নেওয়ার পরই এক সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, দুর্বল ও সমস্যাযুক্ত ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে আর সহায়তা দেওয়া হবে না। হঠাৎ করে ব্যাংক বন্ধ করে কিংবা ব্যাংকের জন্য টাকা ছাপিয়ে কোনো সমাধানের পথে যাওয়া যাবে না। এর পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয়, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করতে পারবে, যাদের গ্যারান্টি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পদ্ধতিতে কয়েক দফা তারল্য তারল্য সহায়তাও দেওয়া হয় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে। সর্বশেষ গত ১২ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, গত তিন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো টাকা ছাপায়নি। আমরা টাকা না ছাপিয়েই তারল্য সংকট সমাধান করছি। কিন্তু এরপরও টাকা ছাপানোর দিকেই ঝুঁকতে হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

আগের সরকারও টাকা ছাপিয়ে সহায়তা করেছিল, আবার এখনো দেওয়া হচ্ছে, এখন তাহলে তফাত কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর বলেন, ব্যাংক থেকে এখন আর টাকা চুরি হচ্ছে না। আগে টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দেওয়ার পর টাকা বাইরে চলে গেছে। কিন্তু এখন জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে। আগে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হলেও কোনো উন্নতি হয়নি অবস্থার। কিন্তু এখানে ভিত্তিগত পরিবর্তন হয়েছে। ব্যাংকের বোর্ড চেঞ্জ হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে তদারকি করা হচ্ছে।

আমানতকারীদের উদ্দেশে গভর্নর বলেন, আমানতকারীদের টাকা নিরাপদে আছে, আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনারা যে ব্যাংকেই টাকা রেখে থাকুন, নিরাপদে থাকবে, সমস্যা হবে না। আপনাদের যতটুকু টাকা প্রয়োজন ততটুকুই তুলুন। আমানতকারীর টাকা নিয়ে সমস্যা নেই, এ নিয়ে মাথাব্যথা আমাদের। আমানতকারীর টাকা সুরক্ষিত থাকবে। তবে একবারে একসঙ্গে সবাই টাকা উত্তোলন করতে গেলে কোনো ব্যাংকই টিকবে না।

এস আলমের মামলা করার হুমকির বিষয়ে গভর্নর বলেন, উনি কী করবেন ওটা ওনার বিষয়। আমরা আইন অনুযায়ী তাদের অ্যাসেট বিক্রি করে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেব। অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটা করা হচ্ছে।

ডিজিদের পদত্যাগ দাবি প্রসঙ্গে ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাকে কেউ চাপ দিলে চাকরি ছেড়ে চলে যাব। আমি কোনো কিছু বরদাশত করব না। বিগত দিনে যারা অনিয়মে যুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, সামনের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। নিদিষ্ট অভিযোগ না পেলে আমি নিজ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেব না। এখানে দলাদলি আছে। লাল, নীল দলের প্রতিনিধিত্ব না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করেন।

খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর কোনো ইচ্ছে আমার নেই। হয়তো ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু কোনো তথ্য গোপন করা হবে না। এখনো সব চিত্র সামনে আসেনি। তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আবার কাজ করছি। ব্যাংক খাত যা খারাপ হওয়ার তা আগেই হয়েছে। কিন্তু সঠিক অ্যাকাউন্টিংয়ের অভাব ছিল। সেটাকে আমরা সঠিক করার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ব্যাংকে শৃঙ্খলা আসবে না। অনেক আইন ছিল, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আরো শক্তিশালী করার কাজ চলছে। আশা করি কাজ হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত