বাদী থেকে আসামি তারপর...

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৪৭ পিএম

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট। গত বুধবার বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান ও বিচারপতি আলী রেজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। এর আগে ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জসিম উদ্দিনের আদালতে তার জামিন আবেদন নাকচ হয়েছিল।

বাবুল আক্তারের আইনজীবী শিশির মনির ও স্বজনরা জানান, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি কারাবন্দি। এ দীর্ঘ সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

সাবেক এসপি বাবুলের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সাবেক প্রধান বনজ কুমারের করা মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। এ ছাড়া পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর সাবেক প্রধান এসপি নাঈমা সুলতানার করা একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। সবশেষ স্ত্রী হত্যা মামলায়ও হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন বাবুল আক্তার। ফলে কারামুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।

২০৮৪ পৃষ্ঠার চার্জশিট: ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ মিতু হত্যা মামলায় বাবুল আক্তারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেয় চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জসিম উদ্দিনের আদালত। বাকি আসামিরা হলেন মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, আনোয়ার হোসেন, এহতেশামুল হক ভোলা, শাহজাহান মিয়া, কামরুল ইসলাম শিকদার মুছা ও খায়রুল ইসলাম।

অভিযোগ গঠনের দিন চট্টগ্রাম মহানগরের তৎকালীন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আবদুর রশিদ জানিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন পরিকল্পনা করে স্ত্রী মিতুকে হত্যা করেন আসামি বাবুল আক্তার। তিনি যখন ঢাকায় ছিলেন তখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। বাবুলের বিরুদ্ধে ৩০২, ২০১ এবং ১০৯ ধারায় চার্জ গঠন করা হয়।

এর আগে ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে মিতু হত্যা মামলায় সাবেক এসপি বাবুলসহ সাতজনকে আসামি করে আদালতে ২ হাজার ৮৪ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয় পিবিআই। এ অভিযোগপত্র ১০ অক্টোবর গ্রহণ করে আদালত।

মামলার বাদীই আসামি : ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় গুলি করে ও কুপিয়ে মিতুকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তিনি বড় ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে জিইসি মোড়ে গিয়েছিলেন। এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তিকে আসামি করে করা মামলার বাদী ছিলেন বাবুল আক্তার।

ঘটনার কয়েক দিন পরেই মামলার তদন্ত নতুন মোড় নেয়। একপর্যায়ে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাবুলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেন। তদন্তের পর সেই মামলায় আসামি হন বাবুল। এ ঘটনায় নতুন করে মামলাও হয়।

এরপর ২৪ জুন রাতে রাজধানীর খিলগাঁও নওয়াপাড়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুলকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন তিনি। অভিযোগ ওঠে, বাবুলকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। শুরু থেকে মামলাটির তদন্ত করে চট্টগ্রাম পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত মামলাটির তদন্তের ভার পিবিআইকে দেয়।

পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো নাকি অন্যকিছু? : ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের অভিযোগ এনে পিবিআইর তৎকালীন প্রধান বনজ কুমার মজুমদারসহ ছয় পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনজীবীর মাধ্যমে মামলার আবেদন করেন বাবুল আক্তার। মামলার আবেদনে সাবেক এ পুলিশ কর্মকর্তা তার ওপর বিভিন্ন নির্যাতনের লিখিত বর্ণনা দেন। আদালত ১৯ সেপ্টেম্বর আদেশ দেওয়া হবে বলে জানায়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন পিবিআই চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের এসপি নাজমুল হাসান, চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের এসপি নাঈমা সুলতানা, পিবিআইয়ের সাবেক পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা ও এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম এবং সংস্থাটির চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের পরিদর্শক কাজী এনায়েত কবির।

আবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের ১০ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত সময়ে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা অফিসে বাবুল আক্তারের ওপর নির্যাতন করা হয়। হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে বাবুলকে আটকে রেখে সাদা কাগজে এবং বিভিন্ন বইয়ের পাতায় বাংলা ও ইংরেজিতে বিভিন্ন কথা লিখতে বাধ্য করা; একটা রুমে অন্যায়ভাবে আটকে রেখে মানসিকভাবে নির্যাতন চালানো; সারাক্ষণ হ্যান্ডকাফ পরিয়ে এবং চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর আচরণ করা; দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখা; গালিগালাজ ও অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করা; বারবার একই প্রশ্ন করা, যেমন ‘তোর বাপের নাম কী’; জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন মাথার বাম পাশে এবং সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন ডান পাশ থেকে ধাক্কা দেওয়া; খাবার জন্য অল্প অল্প পানি দেওয়া; গোসল করতে না দেওয়াসহ নানাবিধ অভিযোগ আনা হয়।

পিবিআই দাবি করেছিল, বাবুল আক্তারের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে তার স্ত্রী মিতুকে হত্যা করা হয়। অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তিনি স্ত্রী হত্যার পরিকল্পনা করেন। এজন্য সোর্সের (তথ্যদাতা) মাধ্যমে তিনি ৩ লাখ টাকায় খুনি ভাড়া করেন।

অন্যদিকে বাবুল আক্তারের পরিবার দাবি করে, সাবেক এ পুলিশ সুপার পিবিআইর তৎকালীন প্রধান বনজ কুমারের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার। চট্টগ্রামে পুলিশের একই ইউনিটে কাজ করার সময় দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বাবুলের স্ত্রী খুনের ঘটনা তদন্তকারী সংস্থাটির প্রধান হওয়ার সুযোগে তিনি বাবুলের ওপর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছেন। বাবুলের পরিবার চেয়েছিল মামলার তদন্তভার যেন অন্য কোনো সংস্থাকে দেওয়া হয়।

সে সময় রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছিলেন, বাবুল আক্তার যে অভিযোগ করেছেন সেগুলো বাস্তবসম্মত কি না, তদন্তের পরেই বোঝা যাবে। তিনি (বাবুল আক্তার) কখন কী বলেন, সেটা তার ব্যাপার।

মিতু হত্যার সঙ্গে কে বা কারা জড়িত এবং তাদের কী শাস্তি হবে সেটি সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে মীমাংসার বিষয়। কিন্তু একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা তার নিজের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অমানুষিক নির্যাতনের যে অভিযোগ এনেছিলেন, তাতে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের নামে আসামিদের ওপর নির্যাতন এবং জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের যে অভিযোগ ওঠে, তা নতুন করে আলোচনায় আসে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত