কলকাতায় পতাকা পোড়ানোর কড়া প্রতিবাদ ঢাকার

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৫ এএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের বাইরে বঙ্গীয়ও হিন্দু জাগরণ নামে একটি সংগঠনের সহিংস বিক্ষোভের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ভারত সরকারের প্রতি দেশটিতে বাংলাদেশের অন্যান্য কূটনৈতিক মিশনের কূটনীতিক এবং অকূটনৈতিক সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ।

গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের বাইরে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বঙ্গীয়ও হিন্দু জাগরণের সমর্থকরা বিক্ষোভ করেছেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সে সময় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বিক্ষোভ থেকে সহিংস হয়ে ওঠে। তারা পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের সীমানায় পৌঁছায়। এ সময় তারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় আগুন দেয় এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কুশপুত্তলিকা দাহ করে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে মনে হলেও ডেপুটি হাইকমিশনের সব সদস্যের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।

এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অবমাননা ও প্রধান উপদেষ্টার কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর জঘন্য কাজটির তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে বাংলাদেশ। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যেকোনো ধরনের সহিংস কার্যকলাপের নিন্দা করে বাংলাদেশ। কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন এবং ভারতে বাংলাদেশের অন্যান্য কূটনৈতিক মিশনের পাশাপাশি এর কূটনীতিক এবং অকূটনৈতিক সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে সহিংসতা ও উসকানির ঘটনা বাড়ছে : এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশে সহিংসতা ও উসকানির ঘটনা বাড়ছে এবং এটাকে মিডিয়ার বাড়াবাড়ি হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গতকাল শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লিতে সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এমন মন্তব্য করেছেন। তিনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার ইসকনের সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের স্বচ্ছ ও ন্যায়বিচারের আশা প্রকাশ করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘আমরা (বাংলাদেশে) ক্রমবর্ধমান উগ্র বক্তব্য, সহিংসতা ও উসকানিতে উদ্বিগ্ন। এটাকে শুধু মিডিয়ার বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘ভারত আবারও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।’

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতের অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে জয়সওয়াল বলেন, ‘হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর হুমকি এবং হামলার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের কাছে ভারত সরকার নিয়মিত জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে। এটা উদ্বেগের বিষয়। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান খুবই পরিষ্কার। অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই সব সংখ্যালঘুর সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।’

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, ‘এটা আইনি প্রক্রিয়া। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্টদের আইনি অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে এ প্রক্রিয়া ন্যায় ও স্বচ্ছভাবে চলবে।’

ইসকন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ‘সামাজিক সেবামূলক সংগঠন হিসেবে ইসকনের বিশ্বব্যাপী সুনাম আছে। আমরা সেভাবেই তাদের দেখি।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে ভারত তার অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট করেছে। আমরা বাংলাদেশের কাছে তা উপস্থাপন করেছি এবং বলেছি তাদের অবশ্যই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও তাদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।’

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের সম্ভাবনা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘যখন এটা হবে আমরা জানাব।’

এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগামী ১১ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করবেন বলে স্থায়ী কমিটির প্রধান শশী থারুর গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ওই দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শশী থারুর বলেন, ‘এটি খুব গুরুতর ও উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে। ভারতের সব নাগরিক এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ আমাদের প্রতিবেশী দেশের কল্যাণ নিয়ে আমরা ভাবি।’

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত : ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বলেছেন, ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গতকাল শুক্রবার ভারতের লোকসভায় পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংখ্যালঘুসহ বাংলাদেশের সব নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের।

লোকসভা সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। জয়শঙ্কর বলেন, ভারত সরকার ২০২৪ সালের আগস্ট মাসসহ সারা বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং মন্দির ও ধর্মীয় স্থানে হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনা দেখেছে।

তিনি বলেন, ভারত সরকার এসব ঘটনা ‘গুরুত্বের সঙ্গে’ নিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারকে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।

জয়শঙ্কর বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে দুর্গাপূজা উৎসবের সময়ও মন্দির ও পূজাম-পে হামলার খবর পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের দুর্গাপূজা চলাকালে ঢাকার তাঁতীবাজারে পূজাম-পে হামলা এবং সাতক্ষীরার যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে চুরির ঘটনায় ভারত সরকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জয়শঙ্কর বলেন, এসব হামলার পর বাংলাদেশ সরকার দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের জন্য সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েনসহ বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশনা জারি করেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত