দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে দেশের বিনিয়োগ তো হবেই না, বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হবে। এখনো কারখানা মালিকরা নিরাপদ নন। নানা সংকটে থেকেও তারা কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছু পরিকল্পিত ঘটনায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। তবে ব্যবসায়ীদের এমন উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আশ^স্ত করে বলেছেন, কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করেছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত বাণিজ্য সম্মেলনে ব্যবসায়ী নেতা ও সরকারের উপদেষ্টারা এসব কথা বলেন। ‘প্রাইভেট সেক্টর আউটলুক : প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশ^স্ত করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘শুধু সরকারের আশায় না থেকে আমাদের সবার একত্রে কাজ করতে হবে। আমরাও প্রতিটি পরিস্থিতি থেকে শিখছি। কারণ সরকার চলমান নৈরাজ্য চায় না। আমাদের শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি। গুটিকয়েক যারা এই নৈরাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, তারা এটিকে একটি সফট টার্গেট হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। আপনাদের সহযোগিতায় যা আরও দ্রুত এবং সুন্দর হবে।’
সেখ বশির উদ্দিন বলেন, ‘প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। সরকার এ বিষয়ে অনেক বেশি সেনসিটিভ। এজন্য আমাদের সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।’
শিল্পমালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অনেক জায়গায় শিল্পমালিকরা সমস্যাগুলো থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছেন। আমি আপনাদের অনুরোধ করব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আপনারাও যুক্ত হন। আপনারা যখন সরে আসেন, তখন আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।’
এর আগে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অনিয়ম-দুর্নীতি দু-চার মাসে স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। তবে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করেছে।’
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘ক্ষয় হয়ে যেতে শুরু করা দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে শুরু করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো খুবই ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। তবে এমন কোনো খাত নেই, যেখানে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি। গত সরকারের রেখে যাওয়া এসব অনিয়ম-দুর্নীতি দু-চার মাসে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে কেউ আর টাকা পাচার করতে পারবে না।’
ব্যবসায়ী নেতাদের বেসরকারি খাতে ঋণের সুদ কমানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নীতিসুদ হার আপাতত বাড়ানো হবে না। বেসরকারি খাতে যেন ঋণপ্রবাহ কমে না যায়, সেদিকে নজর রাখছে সরকার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এনবিআরে সংস্কার হচ্ছে। রাজস্ব আদায়কারী এবং আইনপ্রণেতা দুই ধরনের কর্মকর্তাদের আলাদা করা হবে।
এ সময় এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলে পোশাক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সম্মেলনে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। নতুন এক সমস্যার নাম মামলা-বাণিজ্য। এটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন আমাদের পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন। তাহলেই ব্যবসা এগিয়ে যাবে।’
এ সময় এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন লক্ষ্যমাত্রা স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অবিলম্বে স্থগিত করা হোক। আমরা বেঁচে থাকার সংগ্রামে আছি। তাই এটি স্থগিত করা প্রয়োজন।’
সম্মেলনে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি জাভেদ আখতার বলেন, ‘আমরা যখন বিদেশি বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করি তিনটি বিষয় দেখি। প্রথমত, দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা এবং সর্বশেষ সক্ষমতা। এই তিনটি বিষয় বিনিয়োগের সময় দেখি। তারপরও আরও তিনটি বিষয় আমরা গুরুত্ব দিই, সেগুলো হলোÑওয়ানস্টপ, অনলাইন এবং ওয়ানস অনলি।’
ফিকি সভাপতি বলেন, ‘দুই বছর আগে আমার একটি পণ্য ছাড়ানোর জন্য ১৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। এটি ইউনিলিভার বলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অন্য ব্যবসায়ীরা তা দিতে পারবেন না।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়ে জাভেদ আখতার বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। আর আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যদি আমরা এখনই যাই, আমাদের দেশের কাঠামোগত পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করতে হতে পারে। ভালো কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে, পাশাপাশি অন্তর্বর্তীমূলক কর্মযজ্ঞ রাখতে হবে।’
সম্মেলনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘ব্যাংকগুলোয় যখন লুটপাট হয়েছে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের যারা অডিট করেছেন, তারা এখনো খুব ভালো আছেন। তাদের কোনো দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়নি। আমাদের ব্যবসা বিকাশ আর নগদ দিয়ে হবে না। ব্যবসা করতে হয় ব্যাংক চ্যানেলে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনিয়ম তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যেকোনো ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সের আন্ডারে (অধীনে) অপারেট (পরিচালনা) করে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে মনিটর করে, অডিট করে। আমাদের অ্যাকাউন্টস চেক করে, ঠিক আছে কি না। যখন লুটপাট হয়েছে, তখন যারা অডিট করেছেন, তারা এখনো খুব ভালো আছেন। তাদের কোনো দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়নি। অর্থ উপদেষ্টা বলছেন, তিন মাসে কিছু করার নেই। আর আমি বলছি, এ তিন মাসে এই কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হওয়া উচিত ছিল। সাজা হলে পরে যারা অডিট করতে যাবেন, তারা খারাপ অডিটকে ভালো অডিট বানাবেন না।’
বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘ব্যাংকে যারা লুটপাট করেছে, তাদের ভর্তুকি আমরা কেন দেব। প্রকৃত ব্যবসায়ী আমরা। কিন্তু ভর্তুকি দেব আমরা আর চুরি করবা তোমরা। বাংলাদেশ ব্যাকের কর্মকর্তারা লুটপাটে সহযোগিতা করবেন আর পরে ভালো থাকবেন। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা কর্মকর্তারও কোনো সাজা হয়নি, তাদের দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা হয়নি।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সভাপতি আবদুল হাই সরকার বলেন, ‘৫ আগস্টের পর সমস্যাগুলো ঠিক রাখার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অবস্থা এখন এমন হয়েছে, আমাদের শিক্ষিত সমাজ যে যেভাবে পারছে দাবি আদায়ের জন্য হাজির হচ্ছে। এখন অবশ্য দাবি আদায়ের সময় না।’
