ডেঙ্গু শনাক্তে ‘এনএস১ এলাইজা’ পরীক্ষা বেশি কার্যকর

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:২৩ এএম

ডেঙ্গু শনাক্তে প্রচলিত তিন ধরনের পরীক্ষার মধ্যে ‘এনএস১ এলাইজা’ পরীক্ষা সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। এই পদ্ধতি ৯৪ শতাংশ কার্যকর। বাকি দুই পরীক্ষার মধ্যে ‘এনএস১ আইসিটি’ পদ্ধতি কার্যকর ৫৬  শতাংশ এবং ‘এলাইজা’ প্রক্রিয়াটি ‘এনএস১ আইসিটি’ অপেক্ষা কিছুটা ব্যয়বহুল ও কার্যকারিতা নগণ্য।

সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের (এনআইএলএমআরসি) এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম এই তিন ধরনের পরীক্ষার কার্যকারিতার তুলনা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনআইএলএমআরসির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহেদ আলী জিন্নাহ।

প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা বলেন, এই গবেষণার ফলাফল ‘এনএস১ এলাইজা’ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক ডেঙ্গু নির্ণয়ে মূল্যবান তথ্য প্রদান করবে এবং বাংলাদেশে ‘এনএস১ আইসিটি’ পরীক্ষার বিষয়ে চলমান বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব ল্যাবরেটরিতে এলাইজা মেশিন রয়েছে। কাজেই খুব সহজেই ডেঙ্গু ‘এনএস১ এলাইজা’ পরীক্ষাটির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চার ধরনের জিনগত বৈচিত্র্যময় ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে ডেঙ্গু রোগটি হয়ে থাকে এবং বাংলাদেশে সবগুলো ধরন বিদ্যমান। এই রোগের ভয়াবহতা কমানোর জন্য রোগটির দ্রুত শনাক্তকরণ পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। এছাড়াও একটি দেশের জন্য মহামারী সংক্রান্ত সঠিক তথ্য খুবই গুরত্বপূর্ণ। সে কারণে প্রতিষ্ঠানের ভাইরোলজি বিভাগ ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্তকরণের তিনটি ভিন্ন পরীক্ষা পদ্ধতির কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করতে এই গবেষণা করে। গবেষণায় এনএস১ আইসিটি, এনএস১ এলাইজা ও নিশ্চিতকরণে ব্যবহৃত আরটি-পিসিআর পদ্ধতির কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ডেঙ্গু মহামারীর সময় অনেক রোগীর ‘এনএস১ আইসিটি’ পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ আসে। কিন্তু পরে তাদের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। বিভিন্ন দেশের গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, ‘এনএস১ আইসিটি’ ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে পজিটিভ হয়। সুতরাং অনেক পজিটিভ কেসের ডায়াগনোসিস হয় না। বাংলাদেশে ২০২৩ সালের সাম্প্রতিক ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বিশেষত ডেনভি-২ সংক্রমণের ক্ষেত্রে ‘এনএস১ আইসিটি’ পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে ও ফলস নেগেটিভ এনএস১ পরীক্ষার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে।

এই গবেষণায় ২০২৩ সালের মহামারীর শীর্ষ মৌসুমে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) ভাইরোলজি বিভাগ সন্দেহভাজন ডেঙ্গু রোগীদের কাছ থেকে নমুনা (সিরাম) সংগ্রহ করে। এই রোগীরা জ্বরের পাঁচ দিনের মধ্যে অত্র প্রতিষ্ঠানে টেস্ট করতে আসেন।

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগ দ্রুত শনাক্তকরণের জন্য ‘এনএস১ এলাইজা’ পদ্ধতিটি ৯৪ শতাংশ কার্যকর যেখানে ‘এসএস১ আইসিটি’ পদ্ধতিটি শতকরা ৫৬ শতাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর। ‘এলাইজা’ প্রক্রিয়াটি ‘আইসিটি’ অপেক্ষা কিছুটা ব্যয়বহুল, যেটা খুব নগণ্য।

গবেষকদের মতে, ডেঙ্গু নির্ণয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে ‘এনএস১ আইসিটি’, ‘এনএস১ এলাইজা’ ও ‘আরটি-পিসিআর’ কার্যকর পদ্ধতি। এর মধ্যে দ্রুত ফলাফল ও সম্পদস্বল্পতা পরিবেশের ক্ষেত্রে ‘এনএস১ আইসিটি’ সবচেয়ে উপযোগী। এই পরীক্ষা প্রাদুর্ভাবপূর্ণ এলাকায় বা দূরবর্তী অঞ্চলে প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য উপযুক্ত। অন্যদিকে, ‘এনএস১ এলাইজা’ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিমাণগত ফলাফল পাওয়া সম্ভব, যা ভাইরাসের পরিমাণ নির্ধারণ এবং রোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সহায়ক। ডেঙ্গু ‘পিসিআর’ পদ্ধতিটিও ‘আরএনএ’ শনাক্ত করতে সক্ষম, কিন্তু এটি ব্যয়বহুল এবং এর জন্য দক্ষ জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন। ফলে এই পদ্ধতি সবক্ষেত্রে সহজলভ্য নয়।

প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা জানান, কভিড মহামারীর সময়ে দেশের অনেক স্থানে পিসিআর মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে যদি ডেঙ্গু পিসিআর কিট সরবরাহ করা হয়, তাহলে পিসিআর করেও ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় করা সম্ভব। কিন্তু পিসিআর-এর চেয়ে এলাইজা করতে কম টাকা লাগবে। তাই এলাইজা করাই সুবিধা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত