হকি অঙ্গনের মানুষের মধ্যে বিশ্বাসটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল অনেক আগেই। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন ফোরামে তারা দাবিটা জানিয়েছেন যে, সঠিক পরিকল্পনায় একদিন হকি খেলতে পারে বিশ্বকাপে। সেই বিশ্বাসটা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ মিলেছে মঙ্গলবার। ওমানে থাইল্যান্ডকে ৭-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে যুব বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে বাংলাদেশের তরুণরা। বলতে পারেন, একটা অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন বাংলাদেশের তরুণরা। যারা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও খেলাটাকে আঁকড়ে পড়ে আছেন। কোনো কিছু পাওয়ার আশায় নয়। শুধুমাত্র দেশের জন্য কিছু অর্জনের স্বপ্ন সত্যি করতেই এমন নিবেদন দলটির কোচ মওদুদুর রহমান শুভর দাবি এমনটাই।
এ দেশে হকির অপার সম্ভাবনা থাকলেও ফেডারেশনের অদূরদর্শিতায় ভীষণ অবহেলিত খেলাটা। নিয়মিত হয় না লিগ। ভঙ্গুর ঘরোয়া অবকাঠামোর কারণে এই খেলাটাকে শতভাগ পেশাদারি আদলে নেওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) বছরের পর বছর খেলাটাকে পরিচর্যা করে আসছে পরম যত্নে। তাই দেশব্যাপী হকি অবকাঠামোর তীব্র সংকট সত্ত্বেও প্রতিভার খোঁজ মেলে হরহামেশা। দেশকে বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে নিয়ে যাওয়া এই দলটিই গড়ে উঠেছে শতভাগ বিকেএসপির সাবেক-বর্তমান ছাত্রদের নিয়ে। কোচ শুভও দীর্ঘদিন ধরে বিকেএসপির কোচিং প্যানেলের সদস্য। তাই শিষ্যদের সঙ্গে বোঝাপড়াটাও দারুণ। থাইল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পর ফোনে শুভ নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের স্মৃতি টেনে এনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যখন খেলতাম তখন একবার সিনিয়র বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের শেষ পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেটি ২০০১ সালে স্কটল্যান্ডে। আমরা সেবার অনেক ভালো খেলেও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। তবে এবার কোচ হিসেবে সেই অধরা স্বপ্ন ছুঁতে পেরেছি। এর সব কৃতিত্ব আমি খেলোয়াড়দের দেব। যারা কোনো কিছু পাওয়ার আশা ছেড়েই খেলাটা চালিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের শতভাগ নিংড়ে দিয়ে দেশকে বিশ্বকাপের মহামঞ্চে নিয়ে গেছে।’
চাওয়া-পাওয়ার হিসাব করতে বসলেই হতাশ হতে হয়। নিয়মিত লিগ নেই। একবার ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আলোর মুখ দেখেই আবার অনিশ্চিত পথে যাত্রা করেছে। হকি খেলে জীবিকা নির্বাহের ভীষণ ঝুঁকি এই তরুণদের জন্য। তারপরও তারা মাঠে সর্বস্ব উজাড় করে খেলেছে এই জুনিয়ার এশিয়া কাপ। তাই তো মিলেছে কাক্সিক্ষত সাফল্য, ‘ওদের প্রশংসার ভাষা আমার জানা নেই। তবে ওদের পাশাপাশি আমি কৃতজ্ঞতা জানাব হকি ফেডারেশনের মাননীয় সভাপতি ও বিকেএসপির ডিজি মহোদয়কে। হকি অঙ্গন স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় ছেলেদের ট্রেনিং ক্যাম্প নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। সভাপতি স্যার নিজ উদ্যোগে ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিকেএসপিতে ট্রেনিং শুরু করান। আর সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আমাদের কাজটা সহজ করে তুলেছিলেন বিকেএসপির ডিজি স্যার। শুধু তাই নয়, দেশের হকি বাঁচিয়ে রাখতে বিকেএসপির অবদান অনস্বীকার্য। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, কেবল বিকেএসপি দায়িত্ব নিলে চলবে না, খেলাটা অন্য ধাপে নিয়ে যেতে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।’
আগামী বছর ডিসেম্বরে ভারতে হবে যুব বিশ্বকাপ। শুভ মনে করেন এখন থেকেই একটা পরিকল্পনা করে ছেলেদের তৈরি করা উচিত বড় মঞ্চের জন্য, ‘বিশ্বকাপ অনেক বড় মঞ্চ। এখানে সেরা প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। আমি মনে করি, ওদের যদি দেশে-বিদেশে অনেকগুলো ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়া যায়, যদি সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা যায়, তবে বিশ্বকাপেও আমাদের ভালো করার ক্ষমতা আছে।’
বিশ্বকাপে ভালো করার পূর্বশর্ত ভালো একটা পরিকল্পনা করা এবং সেটা বাস্তবে রূপ দিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা। জুনিয়র এশিয়া কাপে এমন পারফরম্যান্সের পর এতটুকু তো এই ছেলেদের প্রাপ্যই।
