বাংলাদেশের প্রধান বাহন রিকশা। পার্বত্য তিন জেলা বাদে বাকি ৬১ জেলাতেই দেখা মিলবে এই ত্রিচক্রযানের। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফরে আসা আয়ারল্যান্ডের নারী ক্রিকেটাররাও মেতে ছিলেন রিকশা চড়ার আনন্দে, ২০১১ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণকারী দলের অধিনায়করা মাঠে ঢুকেছিলেন রিকশায় চড়ে। এই রিকশার মতোই ধীরস্থির স্পিন বোলিংই যেন লম্বা সময় ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতীক হয়েছিল। বিশেষ করে বামহাতি স্পিন। উপমহাদেশের বাইরের দেশের ক্রিকেটাররা বাংলাদেশ সফরে আসার আগে বামহাতি স্পিনারদের খেলার অভ্যাস করে আসতেন। হালফিলে ইঞ্জিন আর ব্যাটারির বদৌলতে রিকশা যেভাবে বিপুল বেগে ছুটতে শুরু করেছে, তেমনি বাংলাদেশের বোলিংয়েরও ধীরস্থির দশা বদলে তাতে লেগেছে গতির হাওয়া। স্পিন নয়, পেস বোলিংই এখন চেনাচ্ছে বাংলাদেশকে আর সেই পেস আক্রমণের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন ২২ বছর বয়সী এক তরুণ নাহিদ রানা।
বাংলাদেশের মানচিত্রের পশ্চিম এবং পূর্ব, এই দুই কোণ থেকেই উঠে আসছেন পেসাররা। সিলেট থেকে একে একে এবাদত হোসেন, তানজিম হাসান সাকিব, খালেদ আহমেদ, আবু জায়েদ রাহি, রেজাউর রহমান রাজারা যেভাবে উঠে এসেছেন তেমনি উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে উঠে এসেছেন শরিফুল ইসলাম ও নাহিদ রানা। দুজনেরই গুরু জাতীয় দলের সাবেক পেসার ও বিসিবির জেলা কোচ আলমগীর কবির। ২০০২-০৪ এই সময়টায় ৩টা টেস্ট খেলে কোনো উইকেট পাননি আলমগীর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন বোলার হিসেবে অথচ কোনো উইকেট নেই, এমন লজ্জার তালিকায় নিজের নামটা দেখার চাইতে শরিফুল এবং নাহিদ রানার কোচ হিসেবেই নিশ্চয়ই বেশি পরিচিত হতে চাইবেন আলমগীর, বর্তমানে যার কর্মস্থল মেয়েদের বয়সভিত্তিক দল। টেপ টেনিস খেলা নাহিদকে ঘটনাচক্রেই আবিষ্কার করেন আলমগীর, গণমাধ্যমে শুনিয়েছেন সেই গল্পও, ‘নাহিদের সঙ্গে আমার দেখা হয় ঘটনাচক্রে। রাজশাহীর মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে একদিন আমরা কোচরা ছাত্রদের সঙ্গে খেলছিলাম। আমাদের একজন বোলার দরকার পড়ায় জুনিয়র গ্রুপ থেকে ওকে নিই। একজন বলেছিল ও খুব জোরে বল করে। দেখলাম সত্যিই তাই, ওর বল উইকেটকিপার ধরতে পারছিল না। জিজ্ঞাসা করলাম ক্রিকেট বলেও কি এত জোরে বল করতে পারিস। সে বলল পারে। ওর ভাগ্য ভালো যে ওই সময় আমার চোখে পড়ে। এরপর ওকে নিয়ে কাজ শুরু করি, অ্যাকশনে কিছু ভুল ছিল তা ঠিক করি। আরও কিছু স্কিল নিয়ে কাজ করেছি। এরপর ধাপে ধাপে সে তার গতি দিয়েই নজর কেড়েছে।’
জাতীয় দলের সাবেক পেসার এবং বিসিবির হাই পারফরম্যান্স বিভাগের পেস বোলিং কোচ তারেক আজিজ। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন পাকিস্তান সফরেও। নাহিদ রানাকে দেখেছেন অনেক কাছ থেকেই। তার অভিজ্ঞতা বলছে, নাহিদই বাংলাদেশের সবচেয়ে গতিশীল বোলার, ‘আগে অনেকেই জোরে বল করত। তবে একটা দুটা ডেলিভারি খুব জোরে করা আর নিয়মিত জোরে বল করে যাওয়ার ব্যাপারটা আলাদা। বোলিং করতে করতে একটা মোমেন্টাম আসে। এমন দিন যাবে যে ও (নাহিদ রানা) ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারবে না। আবার কখনো গড়ে ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করবে একটা বা দুইটা স্পেলে। আমাদের রুবেল হোসেন এই গতিটা অর্জন করতে পারত, তাসকিন আহমেদের পক্ষে আগে সম্ভব ছিল এখন পারবে কি না জানি না। আমার মনে হয় হাসান মাহমুদ ওই রেঞ্জটা স্পর্শ করতে পারে।’ সাবেক পেসার হাসিবুল হোসেন শান্ত জানিয়েছেন, তাসকিন আহমেদকে ঘণ্টায় ১৪৯ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলতে দেখেছেন। নাহিদ রানার এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গতির ডেলিভারিটি ১৫২ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে, যেটি ছিল রাওয়ালপিন্ডিতে দ্বিতীয় টেস্টের চতুর্থ দিনে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজে ক্যারিয়ারের প্রথমবার টেস্ট খেলতে নেমে প্রথম ইনিংসেই রানা নিয়েছেন ৫ উইকেট, তার তিনটা ডেলিভারি ছিল ১৫০ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি গতির। তারেক নাহিদ রানার বোলিংটা বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে, ‘ও গতিতে ব্যাটসম্যানকে পেছনে যেতে বাধ্য করেছে।’ তার বোলিং দেখে ধারাভাষ্যকার ও সাবেক ক্যারিবীয় পেস তারকা ইয়ান বিশপ টুইটারে লিখেছেন, ‘ক্যারিবিয়ানের মাটিতে তার প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে একদমই হতাশ করেনি নাহিদ রানা। অনেক বছর ধরেই ক্যারিবীয় বোলাররা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের নাচাত, নাহিদ খেলাটা বদলে দিয়েছে।’
কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলি বলতেন, ‘যা দেখা যায় না তা মারাও যায় না।’ নাহিদ রানার বল আসলে সেই একই বৈশিষ্ট্যের, চোখের পলকে ২২ গজ পাড়ি দেয় বলে ব্যাটসম্যানের পক্ষে বল দেখাও কঠিন এবং ব্যাট দিয়ে আঘাত করাটা আরও কঠিন। তার বলে ইন সুইং, আউট সুইং কাটার এমন কোনো বৈচিত্র্য নেই। শর্ট অব লেন্থ থেকে বল উঠছে, গতিতেই পরাস্ত হচ্ছেন ব্যাটসম্যান। জ্যামাইকা টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলার পর বিসিবির প্রেরণ করা ভিডিওবার্তায় সেটাই জানিয়েছেন নাহিদ, ‘প্রথমবার পাঁচ উইকেট পেয়েছি। বেশি কিছু চেষ্টা করিনি। শুধু চেষ্টা করেছি, ব্যাটসম্যানকে জায়গা না দিয়ে লাইন টু লাইন বোলিং এবং পরিস্থিতি এবং ব্যাটসম্যান অনুযায়ী বোলিং করেছি।’ এই উইকেটে বেশি কিছু চেষ্টা না করে শুধু লাইন টু লাইন বোলিং করে ব্যাটসম্যানকে জায়গা না দিয়ে রান ছাড়া বোলিং করলে ব্যাটসম্যানরা অনেক কিছু করার চেষ্টা করে। আমি মনে করি, বোলারদের অত কিছু চেষ্টা না করে লাইন টু লাইন বোলিং করাই ভালো।’
নাহিদের বলের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের আশপাশে, কখনো তা ছাড়িয়েও যায়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নাহিদের চেয়ে জোরে বল করা অনেক পেসারই আছেন। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে পাকিস্তানের শোয়েব আখতার ১৬১.৩ কিলোমিটার বা ঘণ্টায় ১০৩ মাইল গতিতে বল করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার শন টেইট ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬১.১ কিলোমিটার গতিতে বল করেছিলেন। ব্রেট লি সর্বোচ্চ গতি তুলেছিলেন ১৬১.১ কিলোমিটার, ২০০৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এখনো খেলছেন এমন ক্রিকেটারদের ভেতর মিচেল স্টার্ক তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অনেক জোরে বোলিং করতেন, ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই বামহাতি পেসার ১৬০.৪ কিমি/ঘণ্টা বেগে বল করেছিলেন। ইংল্যান্ডের মার্ক উড ১৫৬.৬ কিমি/ঘণ্টা বেগে বল করেছেন, জোফ্রা আর্চারও ১৫৩.৬২ কিলোমিটার গতিতে বল করেছেন নিউজিল্যান্ডের লকি ফার্গুসন,অস্ট্রেলিয়ার ল্যান্স মরিস, ভারতের মায়াঙ্ক যাদব, ওয়েস্ট ইন্ডিজের শামার জোসেফ, পাকিস্তানের হারিস রউফ, দক্ষিণ আফ্রিকার আনরিখ নরকিয়া প্রত্যেকেই ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি গতিতেই বল করেন।
ইয়ান বিশপ জ্যামাইকা টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলায় ইনিংস বিরতিতে বারবার বলছিলেন নাহিদ রানাকে উপযুক্ত যত্ন নেওয়ার কথা। তারেক আজিজের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল পেসারের যতেœর ব্যপারটা। বিসিবির এই কোচ জানালেন, ‘যত্নের বিষয়টা আসলে শারীরিক মানসিক উভয়ই। তার খাবার, ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট, ট্রেনিং, বোলিং অনুশীলন থেকে শুরু করে জিম, ওয়েট ট্রেনিং, মাসল বিল্ডিং, রিকভারি সবকিছুই খুব যত্নের সঙ্গে করা যাতে তাকে আমরা সেরা অবস্থায় পাই। বোলারকেও বুঝতে হবে কোন উইকেটে গতি পাওয়া যাবে আর কোন উইকেটে পাওয়া যাবে না। কখন বল জোরে করতে হবে, কখন না এই বোধটাও আসতে হবে।’
তরুণ বয়সে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও ছিলেন ভয় ধরানো গতির বোলার। কিন্তু অদ্ভুত সব চোট, একের পর এক অস্ত্রোপচার তাকে পরের দিকে বানিয়ে দিয়েছিল মিডিয়াম পেসার, একটা সময় তো চার পা দৌড়ে অফস্পিনের গতিতেই বল করেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। আশা জাগানো এবাদত হোসেনও চোট, অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায়। নাহিদের যাত্রাটা সবে শুরু, গতিসীমার মতো যাত্রাপথটাও যেন দীর্ঘ হয় তার। ধূমকেতু হয়ে ক্ষণিকের আভা ছড়িয়েই যেন হারিয়ে না যান নাহিদ, কিংবা অকালেই যেন ফুরিয়ে না যান অযত্নে অবহেলায়। তখন বলা যাবে রিকশার দেশ হলেও আমাদের ফেরারি গাড়ির মতো গতির নাহিদ রানা আছেন।
তাইজুল দেখিয়ে দিলেন, বিদেশের মাটিতেও তিনি কার্যকর
তাসকিনকেই ট্রফি দিয়ে দিলেন জেইডেন সিলস
‘সবাই আমার পরামর্শ মেনেছে’ -বললেন মাস্টারমাইন্ড মিরাজ
‘আব্বা বেঁচে থাকলে রাত জেগে খেলা দেখত’