নানা ধর্ম-রীতিনীতি থাকবে কিন্তু আমরা এক পরিবার

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৪১ এএম

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আমরা পরস্পরের শত্রু নই। আমাদের নানা ধর্ম থাকবে, নানা রীতিনীতি থাকবে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশি, এক পরিবারের সদস্য। শতপার্থক্য সত্ত্বেও আমাদের জাতীয়তার প্রশ্নে আমরা এক কাতারে চলে আসি।’

জাতীয় ঐক্য গঠনের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে দেশের চলমান বিভিন্ন সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। বৈঠকে দেশি-বিদেশি নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন দেশের সব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতারা। তারা নিজেদের ঐক্য অটুট রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইসলামসহ সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে ঢাকায় একটি বিশ্ব শান্তি ও সম্প্রীতি সমাবেশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন বিভিন্ন ধর্মের নেতারা।

সংখ্যালঘু সমস্যার বিষয়ে অবাধ, সত্য তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা যায়, সে বিষয়ে ধর্মীয় নেতাদের পরামর্শ চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, তথ্যের মধ্যে গরমিল হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য জানতে চাই। সত্য জানার প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে চাই। কীভাবে নিরাপদে তথ্য সংগ্রহ করব, যে তথ্য দিচ্ছে তা যেন বিব্রত না করে তাও নিশ্চিত হতে হবে। সতর্কতার পরও ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু দোষীকে বিচারের আওতায় আনা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সব দাবিদাওয়া বাদ দিলেও একটা দাবি পরিষ্কার, সেটা হলো আমাদের সবার বলার অধিকার, ধর্মের অধিকার, কাজকর্মের অধিকার।

বৈঠকে অন্যদের মধ্যে অংশ নেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা, ইসলামী বক্তা ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আহমাদুল্লাহ, বায়তুল মোকাররমের খতিব আবদুল মালেক, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব সাজেদুর রহমান, হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মুহিউদ্দিন রাব্বানী, জুনায়েদ আল হাবিব ও মুনির হোসাইন কাসেমী, বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) মহাসচিব মাহফুজুল হক প্রমুখ। বৈঠকে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারাও যোগ দেন।

ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। সেগুলোর জবাব খুঁজে পাওয়ার জন্যই আপনাদের সঙ্গে বসা। জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই এ সরকার যখন গঠন হয়, আগস্টের ৮ তারিখ আমি যখন বিমানবন্দরে উপস্থিত হলাম। তখন সবার কাছে আন্তরিকভাবে একটা আহ্বান জানিয়েছিলাম। সেটা কোনো রাজনৈতিক বা শ্রোতাপ্রিয় বক্তব্য ছিল না। বলেছিলাম আমরা একটা পরিবার। আমাদের নানা মত থাকবে, নানা ধর্ম থাকবে, নানা রীতিনীতি থাকবে কিন্তু পরিবার একটা, আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। এটাতেই জোর দিয়েছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের শতপার্থক্য সত্ত্বেও আমরা কারও শত্রু না। পরস্পরের শত্রু না। আমরা এক জায়গাতে, এক কাতারে ওখানে চলে আসি। যেখানে আমাদের জাতীয়তার প্রশ্ন আছে, পরিচয়ের প্রশ্ন আছে। আমরা বাংলাদেশি, আমরা এক পরিবারের সদস্য।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘শপথ গ্রহণের পর শুনলাম যে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার চলছে। এরপরই আমি খোঁজ নিই এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরে চলে যাই। সেখানে আমাকে কিছু দাবিদাওয়া দেওয়া হলো। তবে একটি দাবি হচ্ছে আমাদের সবার সমান অধিকার। বলার অধিকার, ধর্মের অধিকার ও কাজকর্মের অধিকার। সেগুলো আসবে সংবিধান থেকে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেগুলো নিশ্চিত করা। আমি তাদের আন্তরিকভাবেই বলেছিলাম যে, আমরা এটা দেখব নিশ্চিত করার ব্যাপারে। সংবিধান নাগরিককে যে দায়িত্ব দিয়েছে, সেগুলো তার কাছে পৌঁছে দেওয়া ও নিশ্চিত করা আমার কাজ। তারপরও শুনলাম সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হচ্ছে। তো আমি সবার সঙ্গে বসলাম এবং কথা বললাম যে এখান থেকে কী করে তাদের উদ্ধার করতে পারি?’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘পূজার আগে আমি মনে করলাম এই সময়ে হামলা হবে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কোনোরকম হামলা না হয়। দুর্গাপূজা পুরো জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছিল। তখন তৃপ্তি পেলাম একটু তো কাজ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘এখন আবার নতুন কথা, হামলা হচ্ছে, অত্যাচার শুরু হচ্ছে। বিদেশি গণমাধ্যম বলব না, প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। আমি খোঁজ নিচ্ছি, কী হচ্ছে? সবদিকে দেখলাম এটা হচ্ছে না। এক খবরে বলা হচ্ছে, আরেক খবরে বলা হচ্ছে না, তথ্যের মধ্যে ফারাক আছে। এটা ঠিক না। এটার অবসান হতে হবে। আমরা যে তথ্য পাচ্ছি, তা ভুল হতে পারে। ভুল তথ্যের ওপর বসে থাকার কিছুই নেই, এটার অর্থ অন্ধের মতো বসে থাকা। ভেতরে গিয়ে দেখতে হবে। খোঁজ নিতে হবে তথ্যের গরমিল কেন? তাতে ওরা যা বলছে তা কি মিথ্যা প্রচার? না, আমরা যা বলছি তা মিথ্যা প্রচার। সত্যটা কোথায়?’

সরকারের লক্ষ্যের কোনো ফারাক নেই উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সঠিক তথ্য কীভাবে পাব, সেটা আমাদের জানতে হবে। তাৎক্ষণিক খবর পেলে যাতে সমাধান করা যায়। যে দোষী তাকে বিচারের আওতায় আনা সরকারের দায়িত্ব।’

ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তথ্যপ্রবাহ কীভাবে পাব, দোষীকে কীভাবে ধরব? এমন বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। যার নাম দিয়েছি নতুন বাংলাদেশ। এটা আমাদের করতে হবে। আপনাদের কথা বলে সন্তুষ্ট করে আজকের মতো বিদায় দিলাম তা নয়। এটা দ্রুত করতে হবে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, আমাদের বর্তমানেই করে যেতে হবে।’

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতারা একমত : বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ধর্মীয় নেতারা।

ইসলামি বক্তা ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের দেশের সংখ্যালঘুরা নিরাপদে আছেন, এ লক্ষ্যে সরকার যেমন কাজ করছে, ধর্মীয় নেতারাও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধান উপদেষ্টাকে আমরা এই বার্তাটি দিতে চেয়েছি যে, আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি।’

রমনা হরিচাঁদ মন্দিরের সহ-সম্পাদক অবিনাশ মিত্র বলেন, ‘আমরা যারা বাংলাদেশে আছি, আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। কিন্তু বিভেদটা কোথায়? যারা বিভেদ তৈরি করছে তারা আমাদের মধ্যে ঢুকে বিদেশে বসে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। তারা স্বার্থ হাসিল করবে এটা আমরা চাই না। এটা বাংলাদেশ। এখানে আমরা সবাই সমানভাবে মিলেমিশে আছি। কোনো সমস্যা নেই। যারা আমাদের আইনজীবী ভাইকে হত্যা করেছে সে কি হিন্দু, মুসলিম নাকি দুষ্টলোক, তা নিশ্চিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।’

বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয় বলেন, ‘দেশে যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকে। আমরা যেন মিলেমিশে থাকতে পারি। এটা আমাদের ঐতিহ্য। সে বিষয়ে যেন প্রধান উপদেষ্টা ব্যবস্থা নেন। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) আমাদের কথা মন দিয়ে শুনেছেন।’

রমনা সেন্ট ম্যারিজ ক্যাথেড্রালের প্রধান পুরোহিত আলভার্ট রোজারিও বলেন, ‘বুধবার রাজনৈতিক দলগুলো যে কথা বলেছে তার সঙ্গে আমরা একাত্মতা পোষণ করেছি। আমরা একটা স্পর্শকাতর সময় পার করছি। এ সময়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ইসকনের ঘটনায় মানুষের মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে হবে।’

আলভার্ট রোজারিও বলেন, ‘আমাদের ইসকনের যে ভাই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, আইনে যদি কোনো পথ খোলা থাকে তার জামিনের বিষয়টা বিবেচনা করা হয়।’

গারো পুরোহিত জনসন মুরি কামাল বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। যেসব মিডিয়া অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের আমরা প্রতিরোধ করব। আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। এই সরকারকে আমরা সহযোগিতা করব।’

এর আগে গত মঙ্গলবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। পরদিন বুধবার দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত