ইউরোপের দেশগুলোর ২৮ হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগামী সোমবার হবে সেই বৈঠক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রফিকুল আলম গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের সঙ্গে ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের এমন আলোচনার উদ্যোগ এবারই প্রথম।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে রফিকুল ইসলাম জানান, বৈঠক ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারও বৈঠকে থাকবেন। এর মধ্যে ঢাকায় অবস্থানরত ৭ দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দিল্লি থেকে অনাবাসী ২০ রাষ্ট্রদূত যোগ দেবেন। এ বৈঠক বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
জনকূটনীতি বিভাগের মহাপরিচালক বলেন, আসন্ন যৌথসভায় তারা বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউভুক্ত সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি ইইউর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক পর্যালোচনা, সহযোগিতার নতুন ও সম্ভাবনাময় বিভিন্ন ক্ষেত্র, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী জিএসপি প্লাস বাণিজ্য সুবিধাদি, জলবায়ু পরিবর্তন সৃষ্ট অস্তিত্ব সংকট মোকাবিলা, দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি একটি টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে উভয়ের অঙ্গীকার ও করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হবে।
সশরীরে উপস্থিতি ছাড়া শিক্ষার্থীদের ভিসা দেবে না দিল্লির ৪ ইউরোপীয় মিশন : নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইউরোপের চার দেশের কাছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসার জন্য বিকল্প ব্যবস্থার অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে সশরীরে উপস্থিতি ছাড়া তারা ভিসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশের দূতাবাস ভারতে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বর্তমানে ভারতের ভিসা না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। এ সমস্যা সমাধান কীভাবে হবে? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ভূমিকা রাখবে? এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে আনতে না পারার কারণ কী? এসব প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিভাগের মহাপরিচালক বলেন, এটি সত্যি যে ইউরোপের অধিকাংশ দেশের দূতাবাস ভারতে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ মোট ১৩টি দূতাবাস ঢাকায় রয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা অন্যান্য দেশের পাশাপাশি মূলত ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল ও গ্রিস এ চার দেশের ভিসার জন্য আবেদন করেছেন।
তিনি বলেন, ভারতীয় ভিসাসংক্রান্ত জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত এসব দেশের দূতাবাসের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াও সেখানকার (নয়াদিল্লি) বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে ফিজিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্টের বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছিল। এ ছাড়া সেসব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসও সংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করে এ বিষয়ে কার্যকরী বিকল্প ব্যবস্থার অনুরোধ জানিয়েছে।
তিনি বলেন, বারবার অনুরোধের পরও এসব দেশ তাদের অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট আইনের বরাত দিয়ে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত দূতাবাসে সশরীরে উপস্থিতি ছাড়া বিকল্পের বিষয়ে অপারগতা প্রকাশ করে। তবে পূর্ব ইউরোপ ও সিআইএসভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ভালো অগ্রগতি দেখতে পেয়েছি।
রফিকুল আলম বলেন, ঢাকায় অবস্থিত মোট ৫১টি দূতাবাসের মধ্যে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্কসহ ইউরোপের ১৩টি দূতাবাস রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম সীমিত থাকার কারণে নয়াদিল্লির বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া দূতাবাস হতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া গমনেচ্ছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের তৃতীয় কোনো দেশে অবস্থিত বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া দূতাবাস থেকে ভিসা প্রদানের জন্য অনুরোধ জানায়। রোমানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে অবস্থিত রোমানিয়া দূতাবাস থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা দিতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশের অনুরোধে কাজাখস্তান সরকারও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যাংককে অবস্থিত কাজাখস্তান দূতাবাস থেকে ভিসা প্রদানের সম্মত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বুলগেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত বুলগেরীয় দূতাবাস হতে ৮৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে ভিসা প্রদানে সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে অতি সম্প্রতি বুলগেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জানুয়ারি ২০২৫ থেকে তারা ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদান করতে আগ্রহী।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কে সমস্যা হবে না : বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈপরীত্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো বৈপরীত্য দেখা যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুদীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ অংশীদার। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় রয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ দশকের সম্পর্কে বাংলাদেশ ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় দলের অধীন সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের পাঁচ দশকের সম্পর্ক পর্যালোচনা করলে এটা সহজেই অনুমেয় যে, ক্ষমতাসীন দলের পরিবর্তন হলেও তাদের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থান এবং জাতীয় লক্ষ্যসমূহ অনেকটাই অপরিবর্তিত থাকে। আমরা আগের ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈপরীত্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
হাসিনাকে ফেরাতে ভূমিকা নেওয়ার সময় আসেনি : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আদালত বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো আবেদন এসেছে কি না জানতে চাইলে মুখপাত্র বলেন, আমার জানামতে এখনো পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আমাদের যে ভূমিকা নেওয়ার কথা, তা প্রয়োগ করার সময় এখনো আসেনি।
১০ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভারত-বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে রফিকুল আলম বলেন, এফওসিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে যত উপাদান আছে, সবই রাখার চেষ্টা করা হয়। কখনো আলোচ্যসূচি ঠিক করার ক্ষেত্রে দুপক্ষের সম্মতি লাগে। এটা এখন পর্যন্ত চলমান। তবে সাধারণভাবে যেটা বলা যায়, বাণিজ্য আছে, কানেকটিভিটি আছে, সীমান্ত আছে, পানি আছে। এ বিষয়গুলো আলোচনায় থাকবে। আরও অনেক উপাদান নিশ্চয়ই আছে, এই মুহূর্তে আমার কাছে সেটা নেই। ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে চুক্তির বিষয়ে জানানো নিয়ে রফিকুল আলম বলেন, যেহেতু একটা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, এটা অবশ্যই বিবেচনা করা হবে।
‘যুক্তরাজ্যের একটি আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখবেন শেখ হাসিনা’ বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের জানা পত্রিকার মাধ্যমে। তিনি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেবেন। আপনারা যেমনটা জানেন আমরাও তেমনটাই জানি। কীভাবে এ ফ্যাসিলেটেড হচ্ছে সেটা আমার বক্তব্য দেওয়ার বিষয় নয়। তিনি ভারতে আছেন, ভারত সরকার কীভাবে এটা হ্যান্ডেল করছে এটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।
আগরতলা সহকারী হাইকমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগরতলা মিশন থেকে এখন কনস্যুলার সেবা প্রদান বন্ধ আছে নিরাপত্তাজনিত কারণে। পরিস্থিতি উন্নতি ঘটলে আপনারা জানতে পারবেন।
ব্রাজিলের সঙ্গে ১৩ চুক্তি নিয়ে আলোচনা : দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের সঙ্গে ১৩টি নতুন খাতে সমঝোতা স্মারক ও চুক্তির আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এর মধ্যে রয়েছে কৃষি, ক্রীড়া, দ্বৈতকর প্রত্যাহার, সরাসরি জাহাজ চলাচল, বিমান চলাচল, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। অধিকন্তু এ চুক্তির আওতায় বিগত সেপ্টেম্বর মাসে ব্রাজিল সরকার পশুসম্পদ খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রায় ৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রেরণ করে, যার বেশিরভাগই ব্রাজিল সরকার বহন করবে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যে তুলা গবেষণা ও উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
