হেলায় অবহেলায় শিক্ষা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:১৫ এএম

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছিল করোনাভাইরাস। সে সময় ব্যাহত হয় প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর পড়ালেখা। ধাপে ধাপে এ অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে গত কয়েক বছরে বারবার হোঁচট খেয়েছে দেশের শিক্ষাক্ষেত্র। সর্বশেষ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষাক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যা আরও তীব্র হয়। আন্দোলনের কারণে প্রায় চার মাস বন্ধ ছিল সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরপর তা খুললেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি। নানা দাবি, আন্দোলনে শিক্ষা কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হচ্ছে। কাটছে না সেশনজটের শঙ্কাও। অন্যদিকে ঘন ঘন শিক্ষাক্রম পরিবর্তনে দিশেহারা হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সরকারের নানান উদ্যোগ থাকলেও উপেক্ষিত থাকে শিক্ষা। সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার ছয়টি কমিশন গঠন করলেও, সেখানে জায়গা হয়নি শিক্ষার। এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায় শিক্ষাবিদদের।

২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের কারণে প্রায় ছয় মাসের সেশনজটে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে এখনো বের হতে পারেননি তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৫ মাসে সেমিস্টার এবং ১১ মাসে বর্ষ শেষ করার পরিকল্পনা নিলেও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা দেখা যায়নি। একই শিক্ষাবর্ষের হয়েও সবাই একই সঙ্গে অনার্স কিংবা মাস্টার্সের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। আবার অনেকের ফলও প্রকাশ হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের অনেক বিভাগের শিক্ষার্থী সম্প্রতি ঘোষিত ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় আবেদন করতে পারবেন না। অথচ একই বর্ষের অনেক শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে যাওয়ায় আবেদন করতে পারবেন।

সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরব থাকতে দেখা যায়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলনে নামেন। অন্যদিকে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা তিতুমীর বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। যাত্রীবাহী ট্রেনে ঢিল ছুড়ে আহত করেন শিশুসহ অনেক যাত্রীকে। এ ছাড়া ঢাকা কলেজ এবং সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে ভাঙচুর ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হয় সংঘর্ষ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) আজিজ হল ও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের লতিফ হলের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এসব ঘটনায় বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম।

এ ধরনের ঘটনা চোখ এড়ায়নি শিক্ষা উপদেষ্টার। শিক্ষার পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে ইতিমধ্যে তিনি দেশের সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ছয়টি নির্দেশনা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নানাবিধ ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং কিছু ক্ষেত্রে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার (মব জাস্টিস) মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুন্ন করার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখা এবং শিক্ষার মান অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

বারবার শিক্ষাক্রম পরিবর্তনে হোঁচট : স্বাধীনতার পর দেশে শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন এসেছে সাতবার। এ সময়ে মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে তিনবার। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে গত দেড় দশকে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও অধিক সময় পার হলেও দেশের শিক্ষাক্রম কী হবে, তা এখনো দেশের বাস্তবতার নিরিখে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই ঘন ঘন শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। একটি নতুন শিক্ষাক্রমে অভ্যস্ত হতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেক সময় চলে যায়। এভাবে একের পর এক নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।

ব্রিটিশ শাসনামল থেকে চলে আসছে পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি। এ শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে হুট করে ২০২৩ সাল থেকে অভিজ্ঞতানির্ভর মূল্যায়ন শুরু করেছিল গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। এ শিক্ষাক্রমে শেখানোর পন্থা, মূল্যায়ন ব্যবস্থাসহ শিক্ষার প্রচলিত পদ্ধতিই বদলে ফেলা হয়েছিল। একের পর এক শিক্ষাক্রম পরিবর্তনে পাল্টে যায় শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি। এতে দিশেহারা হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবক মহলে তুমুল সমালোচিত নতুন শিক্ষাক্রম থেকে গত ১ সেপ্টেম্বর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। শিক্ষকদের প্রস্তুতির ঘাটতি, পাঠ্য বিষয়, মূল্যায়ন নিয়ে অস্পষ্টতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবকে দায় দিয়ে এ শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, এতে অপচয় হয়েছে জনগণের শত শত কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন শিক্ষাক্রম থেকে সরকার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় শিক্ষক প্রশিক্ষণের পুরো টাকাই অপচয় হয়েছে।

শিক্ষা কমিশন না হওয়ায় ক্ষোভ : অন্তর্বর্তী সরকারের বয়স চার মাস হলেও শিক্ষা ও শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার নিয়ে তেমন কোনো সুখবর পাওয়া যায়নি। দেশের নানাক্ষেত্র সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হলেও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে কোনো কমিশন হয়নি। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠনের সময়ই ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা দরকার ছিল। সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাও শিক্ষা কমিশনসহ আরও কিছু সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বললেও, দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন’-এর জন্য গঠিত সমন্বয় কমিটিও সমালোচনার কারণে বাতিল করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বিভিন্ন কমিশন গঠন হলেও কোনো শিক্ষা কমিশন হয়নি, যা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি সরকারের সময়কার সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বিভিন্ন কমিশন গঠিত হলেও কোনো শিক্ষা কমিশন গঠন হয়নি, যা দুঃখজনক। অথচ আমরা একটি পার্মানেন্ট শিক্ষা কমিশন আশা করেছিলাম। স্বাধীনতা-পরবর্তী বেশ কয়েকবার শিক্ষা কমিশন গঠন করা হলেও, তা যথাযথ সুফল বয়ে আনতে পারেনি। আমরা চাই এই দফায় একটি শিক্ষা কমিশন গঠন হবে। যারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে শিক্ষা সংস্কারে কাজ করবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ‘শিক্ষা নিয়েই তো প্রথম সংস্কার কমিশন হওয়া উচিত। যত কমিশনই হোক, মানুষ যদি সুশিক্ষিত না হয়; কোনো সিস্টেমে কাজ হবে না। শিক্ষকদের যদি অবমূল্যায়ন করা হয়, তাহলে শিক্ষকতা পেশার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হবে না।’

গুচ্ছ পরীক্ষা নিয়ে আসছে না সিদ্ধান্ত : গত কয়েক বছর ধরে দেশের ২৪টি সাধারণ ও বিজ্ঞানপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে জিএসটি গুচ্ছ, তিনটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে প্রকৌশল এবং নয়টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কৃষিগুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও খরচ কমাতে এ উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। তবে গুচ্ছ ভর্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, সময়ক্ষেপণ, উপাচার্যদের সিদ্ধান্তহীনতা, ভর্তিতে নানা জটিলতার কারণ দেখিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুচ্ছ থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি নিতে চায় নিজস্ব কাঠামোতে। গত ২৭ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তিতে গুচ্ছ পদ্ধতির বিষয়ে জরুরি বৈঠক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী বেশি এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে মতামত দেয়।

তবে গুচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতির পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখনই এ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে না আসার অনুরোধ জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। গত রবিবার গুচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের কাছে এ ব্যাপারে একটি চিঠি দিয়েছেন তিনি। চিঠিতে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে প্রচলিত গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়টিতে এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি কোনো পক্ষ।

নতুন উপাচার্য নিয়োগেও স্বস্তি নেই : বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘আওয়ামী দোসর’ পুনর্বাসন করার অভিযোগে ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে উপাচার্য পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম ও প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সুচিতা শরমিন। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি তিনি। তার বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ রয়েছে। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে বারবার বলার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জুলাই আন্দোলনে হামলাকারী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে গত ২৬ নভেম্বর রাতে শিক্ষার্থীদের একাংশের বাধার মুখে যোগদান করতে এসেও ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন নতুন কোষাধ্যক্ষ আবু হেনা মোস্তফা কামাল খান। এরপর থেকে তিনি আর ক্যাম্পাসে আসেননি। পরদিন সন্ধ্যায় উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য পদত্যাগ না করায় ২৮ নভেম্বর তার কার্যালয়ে তালা দেন। শিক্ষার্থীদের ওই অংশকে নিয়ে রবিবার সকাল থেকে পাঁচ ঘণ্টা বৈঠক করেন উপাচার্য। কিন্তু সমঝোতা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।

স্বাভাবিক হয়ে শিক্ষায় ফিরতে পারছেন না অনেকে : রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা আল রাজি (ছদ্মনাম) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাসার কাছেই তিনি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলনের মধ্যে দেখেছেন অনেক কিছু। আন্দোলন ও বিজয়ের পর বেশ কিছুদিন পার হয়ে গেলেও এখনো স্বাভাবিক হতে পারছেন না রাজি। জানান, তার ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। এ ছাড়া তার মেজাজ উগ্র হয়ে আছে। কথা শুনলেই বিরক্ত লাগছে। এমন অবস্থায় গত ২১ আগস্ট জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে এখন দিন পার করছেন।

শুধু রাজি নন, এমন অসংখ্য শিক্ষার্থী এ ধরনের সমস্যায় ভুগছেন। মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকের মতে, আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের সহিংসতার ভয়ংকর স্মৃতি ফিরে ফিরে আসতে পারে। সবসময় অনিশ্চয়তা, বিপদের আশঙ্কায় তটস্থ থাকতে পারেন। সব মিলিয়ে পড়াশোনায় আগের মতো আগ্রহ বা মনোযোগ পেতে কারও কারও সমস্যা হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, ‘যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্যাতন, হত্যা, গুলিবর্ষণের ঘটনাগুলো দেখেছে এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখতে হবে।’

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে কিছুটা পরিবর্তন এলেও শিক্ষার সামগ্রিক খাত আগের মতোই রয়েছে। কোনো ধরনের সংস্কার এখনো দেখা যায়নি। একটা যথাযথ শিক্ষা কমিশন খুবই প্রয়োজন ছিল। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেটা করা যেত। এ ছাড়া পরিকল্পিত কোনো কারিকুলাম হয়নি, শিক্ষায় বাজেট বাড়েনি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। শিক্ষা নিয়ে সরকারকে এখনো সিরিয়াস মনে হয়নি। শিক্ষাকে দুর্বল করে আপনি যতই সংস্কার করেন, কাজের কাজ হবে না।’

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এসএমএ ফয়েজ বলেন, ‘একটা নতুন অবস্থায় সবকিছুকে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে। এখানে কিছু কিছু সমস্যা থাকবে এটা অস্বাভাবিক নয়। আমার বিশ্বাস, ছাত্ররা যেহেতু অত্যন্ত পজিটিভ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন প্রশাসন এসেছে, তারা কাজ করছে। আশা করি সমস্যাগুলো বের করে তারা সমাধান নিয়ে আসবে।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে গত ৩ ডিসেম্বর মতবিনিময় সভা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার প্রসঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরামর্শ শোনেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। যেন বাংলাদেশে কেউ শিক্ষিত না হয়ে উঠতে পারে, দক্ষ হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য পরিকল্পিতভাবে এটা করা হয়েছে। বেকারত্ব তৈরি করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক কিছু নেই। এটা আমাদের ঠিক করতে হবে। তরুণদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত