এমপিরা ছিলেন নিজ এলাকার জমিদার

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:৩৩ এএম

গত কয়েকটি সংসদের সদস্যরা নিজেদের এলাকায় জমিদারের মতো আচরণ করতেন। তারা আইনপ্রণয়নের চেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকলেও, সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখেননি। নিজেরা ব্যবসায়ী অথচ ব্যাংকের টাকা পাচারের ঘটনায় নিশ্চুপ ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে এসব প্রভাবশালী তাদের এলাকার হাওর-বাঁওড় খাল দখল করে নিয়েছেন। গণতন্ত্র থাকলে প্রান্তিক পর্যায় থেকে অনেক সম্পদ অর্থনীতিতে যোগ হতো। কিন্তু গণতন্ত্র না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। সম্পদ কিছু মানুষের হাতে চলে গেছে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) আয়োজিত বার্ষিক এবিসিডি সম্মেলনে অর্থনীতিবিদরা এসব কথা বলেন। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। 

চামচা পুঁজিবাদের উত্থান এবং কিছু মানুষের হাতে অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, একটি পুঁজিপতি শ্রেণি রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ও সুরক্ষা নির্ভর হয়ে উঠেছে। তার ভাষায় দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিকীকরণ, শিক্ষার অবক্ষয়সহ নানা সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ। এসব সমস্যা নতুন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, চামচা পুঁজিবাদের উত্থান এবং কিছু মানুষের অর্থনৈতিক শক্তি বেড়ে গেছে। এর ফলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অগণতান্ত্রিক আচরণ করেছে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নিজ এলাকায় জমিদার বনে গিয়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা।

তিনি তার ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’ থেকে একটি তথ্য উল্লেখ করে বলেন, এ সমস্যাগুলো কাঠামোগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো হয়েছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায়।

বিগত সরকারের সমালোচনা করে রেহমান সোবহান আরও বলেন, গত তিনটি নির্বাচন ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সেই নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আবার শুধু রাবার স্ট্যাম্পের মতো কাজ করতেন। ফলে অবসরে তারা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজে সময় ব্যয় করেছেন।

বিগত সরকারের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ও গুণগত মান নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও সে সময় দেশে দারিদ্র্যবিমোচনের গতি ভালো ছিল বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান। তার মতে, দারিদ্র্যের বহুমুখী সূচকেও বাংলাদেশ ভালো করেছে। মানব উন্নয়নেও ভালো করেছে।

বৈষম্যবিরোধী কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সারাজীবন বৈষম্যবিরোধী কথা বলে গেলাম কিন্তু উন্নতি কতটা হয়েছে, সেটি বড় প্রশ্ন। আমি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলাম প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়। তখন একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় আমার গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর গাড়িটি ঠেলে নিতে হয়েছিল। আর এখন যারা পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, তাদের গাড়িতে এসি লাগে। এমনকি কোটি টাকা দামি ব্র্যান্ডের গাড়িও ব্যবহার হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে আঞ্চলিক বৈষম্য আছে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে এ বৈষম্য অনেক বেশি। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামে তেমন বৈষম্য নেই।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘আমাদের এ সরকার খুবই স্বল্পকালীন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আগামী বছরই আমরা হয়তো একটি রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত সরকার দেখব। জানি না কী হবে।’

এর আগে তিনি বলেন, ‘আমরা কবে ধনী দেশগুলোকে পেরিয়ে আরও ধনী হব, সে রকম কিছু আমরা সবাই মিলে করতে পারি। কিন্তু কোনো দেশ কখনো হঠাৎ করে উন্নত হয়নি।’

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘মানুষের টাকা ব্যাংকে আছে, কিন্তু ব্যাংকের সব টাকা বাইরে চলে গেছে। সেই টাকা তো মানুষের। এখন ব্যাংকগুলোর এসব মানুষের টাকার জন্য রিসোর্স দরকার।’

ব্যালান্স শিটে টাকা থাকলেও বড় কোম্পানিগুলোর টাকা বাইরে চলে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যালান্স শিটে এখন দেখা যাচ্ছে যে অনেক টাকা আছে, কিন্তু আসলে দেশের ভেতরে তাদের কোনো রিসোর্স নেই। তাদের ওয়েজ দিতে হবে। ৩০ হাজার, ৪০ হাজার বা এক লাখ শ্রমিককে এক দিনে বিদায় দেওয়া যায় না। সেটা অনেক বড় অসন্তোষের সৃষ্টি করবে, যা এখন দেখা যাচ্ছে।’

পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘তাহলে কোথা থেকে এই টাকা আসবে? তার মধ্যে যদি এখন বলা হয় যে আমাদের আরও ইকুয়াল সোসাইটির দিকে যেতে হবে, যার অর্থ জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আরও রিসোর্স বিল্ড করতে হবে।’

তার মতে, ‘মার্কেট ইকোনমিকে ইকুয়াল করতে হলে অনেকে এখন বলেন, অর্গানাইজেশনাল ডেমোক্রেসি লাগবে। প্রান্তিক কৃষক বলি বা শ্রমিকের কথা বলি, তাদের অর্গানাইজেশনাল স্ট্রেন্থ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের চরের জমি দখল হয়ে যায়। হাওর অঞ্চলে অনেক জলাভূমি পড়ে আছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা দরকার। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা এগুলো দখল করে নিয়ে যান। স্থানীয়ভাবে এটা যদি শক্তিশালী থাকত, অর্গানাইজেশনাল ডেমোক্রেসি, গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি থাকত, তাহলে এখান থেকে অনেক রিসোর্স আসত। এটা যদি গরিবদের কাছে যেত, তাহলে অনেক লাভ হতো।’

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘পূর্ব এশিয়ায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নেয়, আর ৭০ শতাংশ ভোকেশনাল শিক্ষার দিকে যায়। আমাদের দেশে ২০ শতাংশ যায় ভোকেশনাল শিক্ষায়। তাদের আবার যারা পড়ান, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি, আছে মাত্র ২০ শতাংশ। অন্যদিকে জেনারেল এডুকেশনে প্রত্যেক জেলায় জেলায় বড় বড় ইনফ্রাস্ট্রাকচার হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের।’

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত এস গিল বলেন, মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বাঁচতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আর এই কর্মযজ্ঞে যেন উদ্যোক্তা তৈরি হয় ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। এজন্য মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।

ইন্দরমিত বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে কৌশলী হওয়ার পাশাপাশি সেবা ও উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়াতে বাংলাদেশকে উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে উল্লেখ করে ইন্দরমিত বলেন, ‘প্রতিযোগিতামূলক হওয়া মানে শুধু সস্তা শ্রম আর লো-টেকনোলজি না। এর বাইরে টেকনোলজিক্যাল ইনোভেশন এবং মানবসম্পদের উন্নয়ন দরকার। সেখানে ভূমিকা রাখবে শিক্ষা। দেশের শিক্ষা যে অবস্থায় আছে, এটা দিয়ে, এই মানবসম্পদ দিয়ে একদমই হবে না।’

সেমিনারে আগামীতে নিরবচ্ছিন্ন জ¦ালানি সরবরাহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজানোর পরামর্শ দেয় বিশ্বব্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত