সংকুচিত হচ্ছে ঢাবিতে সাংস্কৃতিক পরিসর!

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৪৮ এএম

সাংস্কৃতিক চর্চার পীঠস্থান বলা হয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাবি)। নির্দিষ্ট করে বললে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) জন্য সুপরিচিত। এখানে বসে গান, আড্ডা, কবিতার আসর। তবে সাংস্কৃতিক চর্চার এই পরিবেশ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। সম্প্রতি ঢাবি কর্তৃপক্ষের একটি বিজ্ঞপ্তি জারির পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

গত শনিবার শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ক্যাম্পাসে সন্ধ্যা ৬টার পর মাইক বাজিয়ে যেকোনো অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তার আগে ওইদিন রাতে টিএসসিতে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর প্রতিবাদে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গান বাজিয়ে প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সংশ্লিষ্ট সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উচ্চ শব্দে স্পিকার/মাইক/গাড়ির হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে সন্ধ্যা ৬টার পর টিএসসি, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর, হল ও আবাসিক এলাকায় স্পিকার/মাইক ব্যবহার করে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না।’

এরপর বিভিন্ন মহল থেকে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিসরকে সংকুচিত করা হচ্ছে। তারা আরও বলছেন, ঢালাওভাবে বন্ধ না করে শিক্ষার্থীদের অসুবিধা আমলে নিয়ে টিএসসিভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে সমাধানে আসা প্রয়োজন ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইনডোরে অনুষ্ঠান করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মাহির শাহরিয়ার রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন্ধ্যা ৬টার পরে টিএসসিসংলগ্ন এলাকায় মাইক ব্যবহার না করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত টিএসসিকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিসরকে সংকুচিত করবে। টিএসসি ও স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি রাজু ভাস্কর্য দাবি-দাওয়া ও আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এজন্য রোকেয়া হল এবং শামসুননাহার হলের শিক্ষার্থীদের শব্দদূষণের কবলে পড়তে হয় এটি যেমন সত্য, তেমনি টিএসসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের

সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র এটিও আমাদের মেনে নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অসুবিধা আমলে নিয়ে টিএসসিভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ- আলোচনার ভিত্তিতে সমাধানে আসা প্রয়োজন। ঢালাওভাবে সন্ধ্যা ৬টার পর মাইক ব্যবহার বন্ধের নির্দেশনা অগণতান্ত্রিক এবং সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করবে বলে আমরা মনে করি। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।’

এ নোটিস প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের নোটিস বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ সংকুচিত হবে। অবিলম্বে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক নোটিস প্রত্যাহার করতে হবে।’

গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সমন্বয়ক সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার অজুহাতে বিগত সময়ে প্রশাসন এ রকম বহু অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে অগণতান্ত্রিক এবং ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। আপাতদৃষ্টিতে এটি শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার কথা বলে করা হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথকে বন্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক পরিসরকে সংকুচিত করা।’

দীর্ঘদিন ধরেই ঢাবি শিক্ষার্থীরা শব্দদূষণের ভুক্তভোগী উল্লেখ করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুননাহার হলের শিক্ষার্থী আশরেফা খাতুন বলেন, ‘টিএসসি এরিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের দুটি আবাসিক হল। এখানে শুধু সাংস্কৃতিক না, সব ধরনের প্রোগ্রাম হচ্ছে। সেখানে উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো হয়। যেহেতু এটা আবাসিক হল, আবাসিক হলের পরিবেশ পাওয়াও আমার অধিকার। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শব্দদূষণের ভুক্তভোগী। যারা এই হলগুলোয় থাকে না, তারা বাইরে থেকে বুঝবে না এটা ছাত্রীদের জন্য কতটা অস্বস্তির কারণ। তাদের পড়াশোনার কোনো পরিবেশ থাকে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদিও টিএসসির উদ্দেশ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা, আমিও এখানে দ্বিমত পোষণ করছি না। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেই পারে। কেউ যদি বলে আমরা সংস্কৃতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি, তাদের বলে দিতে চাই, এখানে যে হলগুলো আছে, এই হলগুলোয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিক্ষার্থীরাও থাকেন। তারা নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে যুক্ত থাকেন। যে সংস্কৃতি এ ধরনের শব্দদূষণকে সমর্থন করে, সে ধরনের সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন থাকে। আমি বলতে চাই, সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে উচ্চ শব্দের কোনো সম্পর্ক নেই। সাংস্কৃতিক চর্চা শব্দদূষণ করা ছাড়াও করা যায়।’

সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতো বলে মনে করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক চর্চা ও ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে পারত। নারী শিক্ষার্থীদের সমস্যাটাও যৌক্তিক, সবার সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে এই সংকট কাটানো যায় সেটা নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করতে পারত প্রশাসন। এখানে সাংস্কৃতিক চর্চা হবে, রাজনীতি হবে, আন্দোলন হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধাগুলোও বিবেচনা করতে হবে। এ সবকিছুকে সমন্বয় করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা টিএসসি এবং আবাসিক হলের খোলা জায়গায় সন্ধ্যা ৬টার পর উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে অনুষ্ঠান না করতে নিরুৎসাহিত করেছি। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ক্ষতির কারণ হয়। এই অনুষ্ঠানগুলো ইনডোরে করলে কোনো সমস্যা নেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিকভাবে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি এ বিষয়ে আপত্তি জানায়, সিচুয়েশন (পরিস্থিতি) এলে আবার বসে কথা বলা যাবে। এটি আলোচনাযোগ্য বিষয়। যে কেউ কথা বলতেই পারে, দাবি জানাতে পারে। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্তটি নিয়েছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত