নিখোঁজ ছেলের কবরের সন্ধান চান মা

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:২৫ পিএম

এক অসহায় বৃদ্ধা মায়ের আর্তি, আমার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো প্রতীক্ষায় আছি, ছেলে ফিরে আসবে মায়ের কোলে, মা বলে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু সেই প্রতীক্ষা যেন আর শেষ হয় না। মায়ের প্রশ্ন- এ প্রতীক্ষার অবসান কি কখনো হবে না? আমার ছেলে কি ফিরবে না? যদি ছেলে বেঁচে না থাকে তা হলে তার কবরের সন্ধান দিন।

মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুরে ফেনী প্রেসক্লাবে আয়োজিত মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ ফেনী ইউনিটের আয়োজনে মতবিনিময় সভায় এমন কথা বলেন গুমের শিকার মাহবুবুর রহমান রিপনেরর মা রওশন আরা ।

১০ বছর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয় ফেনীর যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনকে। কয়েক বছরে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে, চেষ্টা চালিয়েও পরিবার তার হসিদ পায়নি। ২০১৪ সালের মার্চের ২০ তারিখে রাতের আঁধারে রিপনের বাড়ি থেকে ঘরের দরজা ভেঙে কালো পোশাকধারীরা চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। যখন রিপনকে নিয়ে যায়, তখন তার একটি শিশু কন্যা রেখে যায়। নিখোজেঁর পরে আরেকটি কন্যা সন্তান জম্ম নিলেও সে এখনো বাবার মুখ দেখেনি। রিপনের মা মামলা করতে গেলেও থানায় মামলা নেয়নি।

বাবার জন্য সন্তান কাঁদছে, সন্তানের জন্য কাঁদছে মা। স্বামীর জন্য স্ত্রী কাঁদছে, ভাইয়ের জন্য ভাই। নিখোঁজ রিপনের জন্য পরিবারের সদস্যদের শুধু কান্না আর কান্না। হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের ফিরে পেতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে, এমন প্রশ্নই স্বজন হারানো মানুষগুলোর।

রিপনের ভাই মাহফুজুর রহমান সোহাগ বলেন, আমাদের কারো প্রতি কোনো অনুযোগ, অভিযোগ নেই। শুধু আমাদের পরিবারের সদস্যকে ফেরত চাই। 

মাহবুবুর রহমান রিপন ২০০৫ সালে বিয়ে করেন আকলিমা আক্তারকে। স্বামী নিখোজেঁর পর নয় বছর অপেক্ষা করে গত বছর (২০২৩) অন্যত্র বিয়ে করেন। রিপনের দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে অতি কষ্টে জীবনযাপন করছেন বলে জানান তিনি। বড় মেয়ে নিশাদ নবম শ্রেণিতে ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে ছোট মেয়ে ফারিয়া।

মাহবুবুর রহমান রিপনের মা রওশন আরা বলেন, শেখ হাসিনা পালানোর পর অনেক মা আয়না ঘর থেকে তাদের সন্তান ফেরত পেলেও আজও আমি ছেলেকে ফেরত পাইনি। যারা গুম করেছে তাদের কোনো বিচারও পাইনি। 

মৃত্যুর আগে নিজের ছেলেকে দেখে যাওয়ার আকুতি জানালেন গুমের শিকার রিপনের মা। তিনি বলেন, আজকে এত বছর হয়ে গেছে দুই নাতিন নিয়ে আছি। ছেলের কোনো খোঁজ পাই না। আপনারা দোয়া কইরেন, মরার আগে যেন আমার ছেলেকে দেখে যেতে পারি।

রিপনের বাড়িতে গেলে সাংবাদিক এসেছে এই খবরে বোরকা পরে সন্তানের ছবি গলায় নিয়ে সামনে আসেন মা রওশন আরা। তার ধারণা সাংবাদিকরা ছবি তুলে পত্রিকায় দিলে সন্তানের সন্ধান পাবেন। এখনও প্রায়ই রিপনের মা সন্তানের ছবি গলায় নিয়ে আন্তর্জাতিক গুম দিবসসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যান। রিপনের মতো আর কোনো ছেলে যেন গুমের শিকার না হয় সেজন্য রাষ্ট্রকে জোরালো ভূমিকা রাখার দাবি জানান। 

মা রৌশন আরা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হারালে তিনি অবশ্যই ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতেন। কিন্তু আমার মত অভাগা মা গুমের শিকার হওয়া ছেলের বিচারের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ১০ বছরও মেলেনি বিচার। ১০ বছর আগে আমার ছেলে যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হলেও মামলা নেয়নি থানা। আজও হসিদ পায়নি ছেলের।’ ছেলেকে ফেরত দেওয়াসহ রিপনের মত আর কোনো ব্যক্তি যেন গুমের শিকার না হয় সেজন্য রাষ্ট্রকে জোরালো ভ‚মিকা রাখার দাবিও জানান মা রৌশন আরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনী জেলার সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, যাদের গুম করা হয়েছে, তারা জীবিত থাকলে ছেড়ে দিন। আর জীবিত না থাকলে কবরের খোঁজ দিন। শেখ হাসিনার সরকার ভিন্নমত দমনের লক্ষ্যে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষকে গুম করা হয়েছে। অধিকাংশ গুমের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও দলীয় লোকজন জড়িত।

ভাই মাহফুজুর রহমান সোহাগ জানান, শিগগিরই তাদের পরিবার নিখোজঁ ভাইকে ফেরত পেতে নতুন করে মামলা করবেন। 'মানবাধিকার লঙ্ঘন রুখে দাঁড়াও, অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন কর' ¯স্লোগানে মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এ কে এম আবদুর রহিম। অধিকার ফেনীর ফোকাল পার্সন সাংবাদিক নাজমুল হক শামীমের সঞ্চালনায় মূলপ্রবন্ধ পাঠ করেন শেখ আশিকুন্নবী সজীব। অতিথি ছিলেন সাংবাদিক রবিউল হক রবি, মুহাম্মদ আবু তাহের ভূঁইয়া, অধ্যাপক আহম্মেদ আলী, মহি উদ্দিন খোন্দকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত