গণ-অভ্যুত্থানের পরে পুলিশের মধ্যে যে অস্থিরতা, আতঙ্ক ও ভয় বিরাজ করছিল বর্তমানে তা কিছুটা কাটলেও এখনো পুরোপুরি কাজে ফিরতে পারেননি বাহিনীটির মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা। তাই পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফেরাতে স্থানীয় নাগরিকদের মতামত নিয়ে কাজ করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জোন বা বিভাগভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত মতবিনিময় সভা করছেন তারা। সেই সভায় নাগরিকদের চাওয়া-পাওয়া, পরামর্শ জানতে চাওয়া হচ্ছে। নাগরিকদের সঙ্গে এমন সভা করায় পুলিশ আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে ও আরও উদ্যমী হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিএমপি সূত্র জানায়, এখানো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা কাজে যোগ দেননি। আবার ডিএমপির পুলিশ সদস্যরা নতুন হওয়ায় নগরীর মানুষদের বুঝে উঠতেও সময় নিচ্ছেন। কেউ কেউ শহরের পুলিশিং কাজে বিরক্তও হচ্ছেন। এমন অবস্থায় পুলিশের মনোবল ফেরাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় থানাভিত্তিক নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন কর্মকর্তারা। সভায় থানার নাগরিকদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে তাদের প্রয়োজন ও পরামর্শ। এছাড়া নাগরিকরা পুলিশকে কীভাবে সহায়তা করবে ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে নাগরিকরা কী করতে পারে সে বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পরে পুলিশ যে পরিমাণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল তা আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আশা করছি সবার সহযোগিতায় অচিরেই ডিএমপিকে পুরোদমে সচল করতে সক্ষম হব। ডিএমপির সঙ্গে প্রতিটি থানা এলাকার নাগরিকদের মতবিনিময় সভা হচ্ছে। আমি কয়েকটি থানায় উপস্থিত হয়ে মতবিনিময় সভা করেছি, অতিরিক্ত কমিশনাররাও এই মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করছেন।
তিনি বলেন, ঢাকাবাসীর মতামত নিয়ে পুলিশি সেবা দিতে চাই। স্থানীয় নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের কোনো কিছুই করার থাকে না। তাই তাদের সুবিধা-অসুবিধা শুনে-বুঝে কাজ করছি। মাঠের পুলিশ সদস্যদের কাজে উৎসাহ দিতে নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি যত চাকরি আছে, সবচেয়ে কঠিন, কষ্টকর ও বিব্রতকর হলো পুলিশের চাকরি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানতে হবে, না হলে চাকরি থাকবে না। আবার কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানলে অনেক সময় জনগণের বিরাগভাজন হতে হয়। কখনো কখনো কিছু না করলেও পুলিশে চাকরি করার কারণেই লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের চাকরিই যেন কলঙ্কিত পেশার নাম হয়ে দাঁড়ায়। সেই অস্থিরতা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা, ট্রমার মধ্য দিয়ে অনেকেই জীবনযাপন করছেন। আতঙ্ক ও ভয়ে অনেকেই পূর্ণরূপে কাজে শামিল হতে পারছেন না। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
গত রবিবার রাজধানীর গুলশান শুটিং ক্লাবে পুলিশ, ছাত্র-জনতা ও গুলশান থানা এলাকার নাগরিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (লজিস্টিকস) হাসান মো. শওকত আলী বলেন, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশিংকে ফলপ্রসূ করতে হলে এবং সমাজ থেকে সমস্যা দূর করতে হলে শুধু পুলিশই নয়, পুলিশের পাশাপাশি জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।
এর আগে গত শনিবার ডিএমপির মিরপুর ও রমনা বিভাগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এমন মতবিনিময় সভা ডিএমপির ৫০টি থানা এলাকায় হবে। এই মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে পুলিশের মনোবল ও স্থানীয়দের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হবে বলেও জানান ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মাদ তালেবুর রহমান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ যে কালচারের মধ্যে ছিল সেখান থেকে বের হয়ে নতুন কালচারে পড়েছে। পুলিশ নতুন করে চিন্তা করছে, কাজের গতি বাড়াতে কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করছেন। এটি পুলিশকে পুরোপুরি সক্রিয় হতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, পুলিশ যে নগরী নিয়ে কাজ করবে সেই নগরীর মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পরমর্শ করা হলে পুলিশ সমাজের অপরাধমূলক কাজগুলো সহজে চিহ্নিত করতে পারবে ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে। কোথায় ইভটিজিং হচ্ছে, কোথায় ছিনতাই হচ্ছে, কোথায় মাদক ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে, কোথায় সিসি ক্যামেরা দরকার, কোথায় লাইটিংয়ের দরকার এসব তথ্য স্থানীয় লোকজনের কাছেই রয়েছে। তারাই বলতে পারবেন কোথায় কোনটা দরকার। মতবিনিময়ের আলোচনার মধ্যে পুলিশ সেই তথ্য পাবে।
এর আগে পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুলিশের মনোবল ফেরানো। পুলিশ যাতে জনগণের কাছে যায়, জনগণের সমস্যা বা অভিযোগ শোনে, সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। পুলিশ সব সময় জনগণের বন্ধু। সমাজটাকে ভালো রাখতে পুলিশের বিকল্প নেই। তাই সবাইকে দোষারোপ করে অপরাধীর কাতারে নেওয়া ঠিক নয়। যারা অপরাধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুলিশে যারা নিরপরাধ, তাদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
আইজিপির কথার সূত্র ধরে মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আইজিপি বলেছেন, তাদের কর্মের জন্য তারা ক্ষমাপ্রার্থী। কেউ যদি তাদের কাজের জন্য ক্ষমা চায় বা অনুতপ্ত হয় তাহলে তাদের সেই বিষয়ে সুযোগ দেওয়া উচিত। এছাড়া অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এদের মধ্যে যারা নিরপরাধ তাদের নাম বাদ দিয়ে যারা অভিযুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বদলি, পদোন্নতি, মিশনসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পুলিশের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের মাধ্যমে করতে হবে। অতি উৎসাহিত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের সার্বিক বিষয় জনগণকে অবহিত করা উচিত। এসব কাজ করতে পারলেই আমরা ভালো ও চৌকস পুলিশিং সেবা পাব। আর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে সেটা হচ্ছে, পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
