টি-টোয়েন্টির বাস্তবতায় স্বাগতম

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:১৮ এএম

বাবা জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন দুর্ভাগ্যের প্রতীক। বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ খেলা দলের ১৬তম সদস্য! দলের সঙ্গে থেকেছেন, এক শহর থেকে অন্য শহরে গেছেন ঠিকই কিন্তু কখনো খেলার সুযোগ আসেনি। আনুষ্ঠানিক ১৫ জনের স্কোয়াডেও নাম নেই। তার ছেলে জিশান আলমও বুঝলেন, কেবল সেঞ্চুরি করাটাই সৌভাগ্য নয়। জাতীয় ক্রিকেট লিগের টি-টোয়েন্টি সংস্করণ এনসিএল টি-২০ এর প্রথম দিনের খেলায় সিলেটের হয়ে সেঞ্চুরি করেছেন তরুণ জিশান, ৫৩ বলে করেছেন ১০০ রান। কিন্তু তারপরও জেতেনি তার দল কারণ, ঢাকার আরিফুল ইসলাম ৪৬ বলে ৯৪ রান করে দলকে জিতিয়ে দিয়েছেন ৬ উইকেটে।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর বাইরে শুধুমাত্র স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা একটা টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের দাবি ছিল সব মহলেই। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টির আন্তর্জাতিক সংস্করণে বাংলাদেশ দলের ক্রমশ পিছিয়ে পড়ার পেছনে ঘরোয়া আসরের অভাবের কথা বলেছেন অংশীজনরা। তেমন একটি আসর অবশেষে মাঠে গড়িয়েছে, প্রথম ম্যাচটা হয়েছে টি-টোয়েন্টির উত্তেজনার সবটুকু ধারণ করেই। ম্যাচের ফল নিষ্পত্তি হয়েছে শেষ বলে ছক্কায়। কিন্তু বাকি ৩টি ম্যাচ অনেকটাই পানসে। ঢাকা মেট্রো ৩১ রানে হারিয়েছে বরিশালকে, বৃষ্টি আইনে খুলনার বিপক্ষে ১১ রানে জিতেছে রাজশাহী। তবে চট্টগ্রাম রংপুর ম্যাচটায় কোনো দল দেড়শ রানই করতে পারেনি, শেষ পর্যন্ত ৫ উইকেটে জিতেছে রংপুর। হার দিয়ে  হয়েছে তামিম ইকবালের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন।

বাংলাদেশের ক্রিকেটার ওজন কম, শারীরিক শক্তি কম; তাই তারা ছক্কা মারতে পারেন না! এই ব্যর্থতার পেছনে জাতীয় দলের একজন কোচ দাবি করেছিলেন যে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ওজন কম! কাল সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিশান এবং আরিফুল দেখিয়েছেন, আকারে ক্যারিবীয়দের মতো দানবীয় না হলেও ছক্কা মারার কায়দাটা তাদের জানা আছে। তবে এজন্য খেলা হতে হবে স্পোর্টিং উইকেটে! সিলেটের মাঠ মিরপুরের মতো নয়, এখানে বাউন্স ভালো এবং বল ছোটেও জোরে। সঠিক কৌশল অবলম্বন করে খেললে এখানে স্রেফ টাইমিংয়ের জোরেই ছক্কা মারা সম্ভব। জিশান মেরেছেন ১০টা ছক্কা, এর মধ্যে ৫টা মেরেছেন টানা। ঢাকার অফস্পিনার আরাফাত সানি জুনিয়রের করা ওভারের প্রথম বল বাদে বাকি প্রতিটি বলেই। ৮ ছক্কা আর আধ ডজন ৪ মেরেছেন আরিফুল ইসলামও। তবে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছক্কাটা মেরেছেন শুভাগত হোম। শেষ বলে জয়ের জন্য ঢাকার প্রয়োজন ছিল ৫ রান, অর্থাৎ ছক্কা মারতেই হবে। তোফায়েল আহমেদের বলে লংঅফ দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দলকে জিতিয়েছেন শুভাগত হোম।

জিসানের ১০০ রানের ইনিংসের পরও সিলেট কেন ম্যাচটা হারল, তার কারণ তার সতীর্থরা। চারদিনের ম্যাচের আসরে সর্বোচ্চ রান করা অমিত হাসান আছেন টি-টোয়েন্টি দলেও,একটা চমৎকার ব্যাটিং উইকেটে অমিত খেলেছেন ২৫ বলে ২৬ রানের ইনিংস। তাতে দুটো মাত্র বাউন্ডারি। ৬ষ্ঠ ওভারে অমিত ব্যাট করতে নেমেছিলেন, ১৫তম ওভারে আউট হয়েছেন। এখানেই খেলাটা ধীরগতির করে দিয়েছেন অধিনায়ক। একদিকে জিশান ১৮৮ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করলেও অমিতের ১০৪ স্ট্রাইকরেটে ব্যাটিং দলের ইনিংসটা বড় হতে দেয়নি। তোফায়েলের ৮ বলে ৯ রানও মেটায়নি পরিস্থিতির দাবি। সিলেট ২০ ওভারে করেছে ৪ উইকেটে ২০৫ রান। আরেকটু ঝুঁকি নিয়ে খেলে রানটা বাড়ানোর চেষ্টা থাকলে  হয়তো জয়েই শুরু করতে পারত এনসিএল ফোর-ডে এর চ্যাম্পিয়নরা।

ঢাকার কোনো ব্যাটসম্যানই বল নষ্ট করেননি। সাইফ হাসান ২ বলে ০ করে চলে যাওয়াতে বরং উপকারই হয়েছে। আশিকুর রহমান শিবলির ১৪ বলে ১৭, আরিফুলের ৪৬ বলে ৯৪ আর মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনের ২৩ বলে ৩০* রানের  ইনিংসের সঙ্গে শুভাগত হোমের ১৮ বলে ৩১ রানের ইনিংসটাই জিতিয়েছে ঢাকাকে। একটা বড় ইনিংস একা যে ম্যাচ জেতাতে পারে না, বরং টি-টোয়েন্টি ক্ষণস্থায়ী কিন্তু প্রভাব রাখে এ রকম কয়েকটা ইনিংসই যে শেষ পর্যন্ত  ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়, সেটাই বুঝল সিলেট। ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ২০৭ রান করে ঢাকা ম্যাচটা জিতেছে ৬ উইকেটে। সান্ত¡না পুরস্কার হিসেবে ম্যাচসেরার খেতাবটা পেয়েছেন জিশান আলম।

লম্বা সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেটে মাঠে নেমেছেন তামিম ইকবাল। আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন অনেক আগেই, খেলেন শুধু বিপিএলে। কুড়ি বিশের ক্রিকেটটা যে তার কাছে বিষের মতোই, সেটা আবারও প্রমাণ করলেন এই বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। মিরপুরের অনুশীলনে বড় বড় ছক্কা মারা তামিম সিলেটে গিয়ে ১০ বলে ১৩ রান করে বোল্ড হয়েছেন রংপুরের পেসার এনামুল হকের বলে। ১টা চার ১টা ছয়, দুই বলেই নিয়েছেন ১০ রান, ১ বলে হয়েছেন আউট। বাকি ৭ বলে করেছেন ৩ রান। সতীর্থ মাহমুদুল হাসান জয়ের রানআউটেও রেখেছেন ভূমিকা। তামিম যেমন খেলেছেন, তেমনি খেলেছে তার দল চট্টগ্রাম। ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৩২ করেছে বন্দরনগরীর দলটি, জবাবে তানবীর হায়দারের ৪১, আকবর আলির ২৫ আর শেষদিকে আলাউদ্দিন আলির ৪ বলে ১০ রানের ক্যামিওতে ১৬.৫ ওভারে ৫ উইকেটে ১৩৫ রান করে জিতেছে রংপুর।

বরিশালের বিপক্ষে ঢাকা মেট্রো জিতেছে ৩১ রানে, হাফসেঞ্চুরি করেছেন নাঈম শেখ ও ইমরানুজ্জামান। মেট্রোর ৪ উইকেটে করা ১৯২ রান তাড়া করতে নেমে ৮ উইকেটে ১৬১ রানে আটকে গেছে বরিশাল। সিলেট স্টেডিয়ামের আউটার মাঠে খুলনার ৭ উইকেটে করা ১৭২ রানের জবাবে রাজশাহী ৩ উইকেটে ১৫৩ রান করে ১৭.২ ওভারে। এরপর আলোর স্বল্পতায় খেলা থামিয়ে দেওয়া হলে বৃষ্টি আইনে ১১ রানে জিতে যায় রাজশাহী। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতে আসা আজিজুল হক তামিম হাফসেঞ্চুরি করেছেন, ৩১ বলে করেছেন ৫৩ রান। তবে হাবিবুর রহমান সোহানের ৩৮ বলে ৬৬ রানের ইনিংসটার কাছে মার খেয়ে গেছে তার ইনিংস, যেটা হতে পারে এই তরুণের জন্য শিক্ষাও। টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ার-প্লে কাজে লাগিয়ে ১৮০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করতে না পারলে সেটা দলের খুব একটা কাজে আসে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত