সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টের কাছে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে (বঙ্গোপসাগরের গভীর খাত) মাছ ধরতে গিয়ে ভারতীয় কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হয়েছেন বাংলাদেশের দুই ফিশিং ট্রলারের ৭৯ নাবিক ও জেলে। গত সোমবার সকাল ১০টার দিকে তাদের আটক করা হলেও ভারতীয় কোস্ট গার্ড গতকাল বুধবার দাপ্তরিকভাবে বিষয়টি স্বীকার করেছে। আটক ওই নাবিক-জেলেদের উদ্ধারে গত সোমবারই ফিশিং ট্রলার দুটির মালিকদের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মৎস্য মন্ত্রণালয় ও নৌ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। নৌ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নাবিক ও ফিশিং ট্রলার দুটি উদ্ধারে সরকারের পক্ষ থেকে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশি কোনো ফিশিং ট্রলার ভারতীয় কোস্ট গার্ড আটক করেছে বলে জানিয়েছেন নৌ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মাকসুদ আলম। এ প্রসঙ্গে তিনি গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাগরের মাঝে কোনো সীমানা নেই। জিপিএসের মাধ্যমে সীমানা চিহ্নিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো জাহাজ যদি অন্য দেশের জলসীমায় প্রবেশ করে, তখন সাবধান করে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এভাবে আটক করা এবারই প্রথম।’
এদিকে আটক হওয়া নাবিক ও জেলেদের পরিণতি নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরা শঙ্কায় রয়েছেন। আটক হওয়া এফভি লায়লা-২ ও এফভি মেঘনা-৫ নামে ফিশিং ট্রলার দুটিতে ৭৯ নাবিক ও জেলে ছিলেন। এর মধ্যে মেঘনায় ছিল ৩৭ ও লায়লায় ছিলেন ৪২ জন। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের কথা হয় এফভি মেঘনা-৫-এর মালিক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের জাহাজ সাগরের মাঝখানে কখনো ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করে না। ঘটনার দিন আমাদের ও লায়লা জাহাজটি একই সঙ্গে হিরণ পয়েন্ট এলাকায় মাছ ধরছিল। হয়তো স্রোতের টানে বা কোনো কারণে ভারতীয় সীমানার এক বা দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু এর জন্য জাহাজ ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। গত সোমবার ধরার পরপরই আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করেছি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রেসপন্স (সাড়া) না পাওয়ায় নাবিকদের স্বজনদের কোনো আশার বাণী শোনাতে পারছি না।’
একই ধরনের মন্তব্য করেন এফভি লায়লা-২-এর মালিকানা কোম্পানি এস আর শিপিংয়ের মিন্টু সাহা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জাহাজগুলো প্রায় ২৫ কোটি টাকা দামের। ট্রলিং ফিশিংয়ে এসব জাহাজ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উভয় দেশের সীমানার মধ্যে সব জাহাজই চলাচল করে। আর সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড হলো মাছের আধার। এখানে সবাই মাছ ধরতে যায়। এখন জাহাজটি হয়তো মাছ ধরতে ধরতে একটু ভারতীয় সীমানার ভেতরে ঢুকে গেছে, তাই বলে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম।’
গভীর সাগরে মাছ ধরার জন্য ট্রলারগুলোকে সাগরে যেতে অনুমোদন দেয় সরকারের সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের কথা হয় সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক আবদুস সাত্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ট্রলার ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। তবে আমাদের জলসীমারও অনেক ভেতরে ভারতের বোট চলে আসে। তখন আমরা আটক করি। গত দুই মাসেও দুটি বোট আটক করা হয়েছে।’
বাংলাদেশের আটক হওয়া ট্রলার এবং নাবিক-জেলেদের পরিণতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নাবিকদের উদ্ধারের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কাজ করছে। আশা করছি, শিগগিরই সমাধান হয়ে যাবে।’
আটক ট্রলার এবং নাবিক ও জেলেদের ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজালাল। তিনি বলেন, ‘আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলবো।’
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, আটক বাংলাদেশি নাবিক ও জেলেদের গতকাল সকালে ভারতের প্যারা দ্বীপের একটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানা থেকে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয় হাসপাতালে। পরে তাদের আবারও ট্রলারে ফেরত পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে এস আর ফিশিংয়ের মিন্টু সাহা বলেন, ‘নাবিকরা ভালো আছেন। আজ (গতকাল) সন্ধ্য ৬টার দিকে তাদের পাঠানো ভয়েস বার্তায় আমরা জেনেছি, তারা সুস্থ আছেন এবং তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে। তারা আরও জানিয়েছেন, ভারতীয় কোস্ট গার্ড আমাদের (বাংলাদেশ) কোস্ট গার্ডের সঙ্গে কথা বলে কয়েকদিনের মধ্যে তাদের বাংলাদেশের সীমানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারে।’
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার জন্য অনুমোদিত ফিশিং ট্রলারের সংখ্যা ২৬৪টি। বড় আকৃতির এসব ট্রলার সাগরে মাছ ধরে থাকে। অন্যদিকে ভারতের ট্রলারগুলো ছোট আকৃতির, সেগুলোতে ১০-১৪ জন করে নাবিক ও জেলে থাকে। বিপরীতে বাংলাদেশের ট্রলারগুলো আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন। প্রতিটি ট্রলারে অন্তত ৪০ বা তার চেয়ে বেশি নাবিক-জেলে থাকেন।
