দুই দশকেরও বেশি সময় আগে দেশ জুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড। এমএলএম (মাল্টি লেবেল মার্কেটিং) পদ্ধতিতে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল তখন। তবে এ অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে ডেসটিনি-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে, যার কেন্দ্রে ছিলেন ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীন ও আরও কয়েকজন। ‘ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি’ ও ‘ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেড’-এর নামে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
গত একযুগে মামলা, সাজা ও কারাবাসের পরেও এখনো ডেসটিনি বা ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে সুরাহা হয়নি। ডেসটিনি-সংক্রান্ত দুই আলোচিত মামলার একটিরও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর থেকে কারাগারে আছেন রফিকুল আমীন।
গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কারাগারে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ অনেকের ভাগ্য খুললেও রফিকুল আমীনের ভাগ্য প্রসন্ন হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের একটি মামলায় দুই বছরের বেশি সময় আগে ১২ বছরের কারাদ-ের রায় হয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা না দেওয়ায় একটি মামলায় তার তিন বছরের কারাদ- হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর আগে। দুই মামলাতেই তার সাজা খাটা শেষ হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। আর ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশনের নামে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ ও পাচারের একটি মামলার রায় হওয়ার কথা আগামী ১৫ জানুয়ারি।
রফিকুল আমীন ও দুদকের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেছেন বা করছেন এমন বেশ কয়েকজন আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রফিকুল আমীনের জামিন কিংবা কারামুক্তি নির্ভর করছে আইনি সমাধানের ও ভুক্তভোগীদের প্রতিকারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার ওপর। তার বিরুদ্ধে ট্রি প্ল্যান্টেশনের মামলায় মানি লন্ডারিং আইনের চার ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে, যাতে সর্বোচ্চ সাজা ১২ বছর এবং পাচারকৃত অর্থের দ্বিগুণ অর্থদণ্ড ও তা অনাদায়ে কারাবাস।
এ মামলায় রফিকুল আমীনের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি ট্রি প্ল্যান্টেশন মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তিও (১২ বছরের কারাদ-) হয়, তাহলেও সংশ্লিষ্ট আইনের ৩৫(এ) ধারা অনুযায়ী তিনি সুবিধা পাওয়ার অধিকারী।’ তিনি বলেন, অর্থদণ্ডের বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(বি) ধারার অর্থ হচ্ছে, আদালত সাজা সমন্বয় করে মুক্তির আদেশ দিতে পারে। যদি সেটা না হয়, ধরে নিলাম আদালত কিছু বলল না, সে ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে যখন আপিল ফাইল হবে, তখন অর্থদণ্ড স্থগিত হলে তার মুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা থাকবে না।’
প্রতিপক্ষের আইনজীবীর বিশ্লেষণে ভিন্নমত পোষণ না করলেও রফিকুল আমীনের জামিন ও কারামুক্তিতে আদালতের সিদ্ধান্তসহ আরও কিছু বিষয়ের সুরাহা প্রয়োজন বলে মনে করেন দুদকের আইনজীবী মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। ইউনিপে টু-এর মামলার রায়ে আসামিদের ১২ বছর করে কারাদণ্ড হয়। তবে, শর্ত হিসেবে আদালত বলেছিল, যত দিন পর্যন্ত জরিমানার অর্থ পরিশোধ করা না হয়, তত দিন পর্যন্ত আসামিরা বেরোতে পারবে না। এ বিষয়টি এ মামলার শুনানিতেও উল্লেখ করেছি। আসামিদের অর্থদণ্ড দেওয়া এবং তা অনাদায়ে কারাবাসের আরজি জানিয়েছি।’ এ প্রসঙ্গে আপিল বিভাগের আট বছর আগের একটি আদেশের বিষয়টি সামনে আনছেন দুদকের এ আইনজীবী।
২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ শর্তসাপেক্ষে ডেসটিনির ট্রি প্ল্যান্টেশন প্রকল্পের গাছ বিক্রি করে অথবা অন্য কোনোভাবে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করলে জামিন মিলবে বলে আদেশ দেয়। উচ্চ আদালতে রফিকুল আমীনের আইনজীবী উজ্জ্বল কুমার ভৌমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপিল বিভাগের আদেশটি ছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতি ও শর্তে। সেই শর্ত প্রতিপালিত হয়নি। জামিনও মেলেনি।’ তিনি বলেন, ‘দুদক তো তাদের কথা বলবেই। ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানের সুবিধা তিনি (রফিকুল আমীন) পেতেই পারেন। তবে সিদ্ধান্ত দেবে আদালত।’
এক মামলায় আপিল বিচারাধীন
ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ২০১২ সালের ৩১ জুলাই কলাবাগান থানায় মামলা হয় রফিকুল আমীনসহ ৪৬ জনের নামে। ২০২২ সালের ১২ মে ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত অর্থ পাচার মামলায় রফিকুল আমীনকে ১২ বছরের কারাদণ্ডাদেশ, ২০০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন বছর কারাদণ্ড দেয়। একই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট, সাবেক সেনাপ্রধান হারুন-অর-রশিদকে (ইতিমধ্যে জামিনে রয়েছেন) চার বছরের কারাদণ্ড, সাড়ে ৩ কোটি টাকার অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড’-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনকে (তিনিও কারাগারে) ১০ বছরের কারাদণ্ড, দেড় কোটি টাকার অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদণ্ড দেয় আদালত। বাকি ৪৩ আসামির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় হয়।
১২ বছর সাজার বিরুদ্ধে রফিকুল আমীনের আপিলের পর একই বছরের ৪ জুলাই হাইকোর্ট আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে অর্থদ-ের আদেশটি স্থগিত করে। এ মামলায় চলতি বছরের ৬ মার্চ হাইকোর্ট রফিকুল আমীনকে তার পাসপোর্ট জমা রাখাসহ বিভিন্ন শর্তে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আদেশ দেয়। জামিনের পক্ষে শুনানিকারী আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রফিকুল আমীন ১২ বছর ধরে কারাগারে আছেন এবং সাজা খাটা শেষ হয়েছে এ গ্রাউন্ডে জামিন চেয়ে আবেদনের পর তা মঞ্জুর হলেও অন্য মামলায় কারাগারে থাকায় তিনি মুক্তি পাননি। এরপর মামলার কী পরিস্থিতি, তা তার জানা নেই। আপিলকারীর আইনজীবী উজ্জ্বল কুমার ভৌমিক বলেন, ‘জামিনের আদেশ স্থগিত চেয়ে দুদক তখন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গেলেও এ বিষয়ে আদালত কোনো আদেশ দেয়নি। অন্য মামলায় কারাগারে থাকায় তিনি জামিন পাননি এবং আপিল এখনো বিচারাধীন আছে।’
রায়ের পর্যায়ে ট্রি প্ল্যান্টেশন মামলা
ডেসটিনির ট্রি প্ল্যান্টেশনের অর্থ পাচারের মামলাটি করা হয়, ২০১২ সালের ৩১ জুলাই কলাবাগান থানায়। রফিকুল আমীনসহ এতে আসামি করা হয় ১৯ জনকে। চলতি বছরের ২ মার্চ এ মামলায় হাইকোর্টে জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পর জামিন পেতে আপিল বিভাগে আপিল করেছিলেন রফিকুল আমীন। গত ৫ সেপ্টেম্বর তার জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এ মামলায় ২১৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ২৮ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য থাকলেও ওইদিন রায় প্রস্তুত না হওয়ায় ১৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করে আদালত। আসামিপক্ষের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, ‘৪৫ লাখ গ্রাহকের মধ্যে কেউ আদালতে সাক্ষ্যদানকালে বলেনি, আসামি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বা অর্থ আত্মসাৎ করেছে। আমরা মনে করি আসামিরা খালাস পাবেন।’ দুদকের কৌঁসুলি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, ‘শুনানিতে আমরা আমাদের যুক্তি উপস্থাপন করেছি। সাজাসহ অর্থদ-ের আরজি জানিয়েছি। এখন আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’
