লিবিয়ার অতীত-বর্তমানই কি সিরিয়ার ভবিষ্যৎ

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:০৪ এএম

ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের অব্যাহত প্রাণহানির মধ্যে সিরিয়ায় আকস্মিক ভূকম্পনের মতো প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের শাসনের পতন ঘটল। চলতি সপ্তাহে দামেস্কে সিরীয় বিদ্রোহীদের প্রবেশের মধ্য দিয়ে আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের শাসনের যবনিকাপাত হলো। মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘকাল শাসনক্ষমতা ধরে রাখা পরিবার যতগুলো রয়েছে, সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পাবে আধুনিক সিরিয়ার এই স্বৈরতন্ত্র। বাবা হাফিজ আল-আসাদের ৩০ বছরের শাসনের রেকর্ড অবশ্য ছেলে ভাঙতে পারলেন না।

আসাদের পতনকে দেখা হচ্ছে রাশিয়ার পরাভব এবং পশ্চিমা বিশ্বের কৌশলী জয় হিসেবে। কিন্তু সিরিয়ায় জনগণের ভাগ্যে কী আসবে, তা লাখ টাকার প্রশ্ন। এই বাঁকবদলের হাত ধরে দেশটিতে গণতান্ত্রিক বা প্রতিনিধিত্বমূলক অভিযাত্রার পথ কতটা প্রশস্ত হলো, সেই উত্তর সম্ভবত রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের কাছে জটিল অঙ্কের সমতুল্য।

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের প্রসঙ্গের পাশে অবধারিতভাবে আরব বসন্তের কথা উঠে আসে। গত দশকের গোড়ায় তিউনিশিয়ায় স্বৈরশাসক জাইন-এল-আবিদিনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া গণবিক্ষোভ মিসর, ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে। এর প্রভাবে তিউনিশিয়ায় শাসকের বিদায় হয়। মিসরে এক নয়া ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়, যা কি না স্বৈরতন্ত্রের অতীতের মতোই ভয়ংকর। ইয়েমেনের জাতিগত-ধর্মীয় বিভাজনের ক্ষত ধিকিধিকি আগুনের মতো জ্বলছে। বোমা, বন্দুক, বুলেটের সঙ্গে খাদ্যাভাবে দুঃসহ এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেখানে। অন্যদিকে, সিরিয়া পরিণত হয় বহুপক্ষীয় যুদ্ধের এক মৃগয়াক্ষেত্রে। তিউনিশিয়ার গণজাগরণ সত্যিকার অর্থে আরব তরুণদের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা পশ্চিমা পরাশক্তি এবং আরব শাসকদের যৌথ প্রযোজনায় ব্যর্থতার ইতিবৃত্ত হিসেবে ইতিহাসে এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। বড় ট্র্যাজেডি হয়ে রয়েছে আরব জাগরণের লিবিয়া অধ্যায়। আরব বসন্তের সময় গণবিক্ষোভের সপক্ষে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হামলায় লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার আল গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়। সেই থেকে লিবিয়ায় কোনো স্থিতিশীলতা নেই।

বাশার আল-আসাদ নিজের পতন ১৩ বছর ঠেকিয়ে রাখতে সমর্থ হলেও প্রায় ২৫ বছরের শাসনের সব শৌর্য মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে ধসে পড়ে। দামেস্ক পতনের অগ্রভাগে ছিল আবু মোহাম্মদ আল-জোলানির নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের জোট ‘হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)’। আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) এক সময়ের যোদ্ধা আল-জোলানি দামেস্ক বিজয়ের আগ মুহূর্তে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেসব সাক্ষাৎকার দেন; তাতে নিজের মতাদর্শে সংশোধনমূলক প্রতিশ্রুতি দেন। নিজেকে একজন পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির নেতা হিসেবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি সিরিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিধিব্যবস্থার দিকে নেওয়ার বিবৃতি তুলে ধরেন। রাজধানী জয়ের আগে তার সংগঠন ইদলিব প্রদেশের ২০ লাখ মানুষের শাসনকর্তা ছিল। প্রশ্ন উঠবে- সিরিয়ার অন্যান্য অংশে যারা আঞ্চলিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে রয়েছে, তারা দামেস্ককেন্দ্রিক নতুন বন্দোবস্তকে কতটা স্বাগত জানাবে! সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পক্ষগুলো দামেস্কে আল-জোলানির শাসন বিনাবাক্যে মেনে নেবে বিষয়টি ততটা সহজ নয়। সত্যিকার অর্থে, এইচটিএস জোটের সেই সক্ষমতাও নেই, যা দ্বারা দেশের সর্বত্র প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ যে, আসাদকে হটাতে বিদ্রোহীরা যে মরণ কামড় দিয়েছিল, তা সম্ভব হতো না; যদি তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে নিয়ন্ত্রণ না করতেন। মোটামুটিভাবে আসাদবিরোধীদের পারস্পরিক ‘অনাক্রমণ নীতি’ এবং আসাদপন্থি শিয়া যোদ্ধা দলগুলোর শক্তিক্ষয় হওয়ার মধ্য দিয়ে দামেস্কে সরকারি বাহিনীর চূড়ান্ত পতনের মুখে পড়েছে। গাজা যুদ্ধের সমান্তরালে সিরিয়ার মাটিতে আসাদপন্থি ইরানি মদদপুষ্ট যোদ্ধাদের কোমর ভেঙে দিয়েছে ইসরায়েল। উদ্ভূত বাস্তবতায় আসাদবিরোধীদের পারস্পরিক সহাবস্থানের নিশ্চয়তা না থাকলে সিরিয়াকে লিবিয়ার থেকেও কঠিন ভাগ্যবরণ করতে হবে। সিরিয়ায় আসাদের বাহিনী, আইএস এবং অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর বহুধাবিভক্ত লড়াইয়ের ইতিহাসের ক্ষত দগদগেই রয়েছে। চলতি বছরের নানা সময়েই এসব পক্ষের পারস্পরিক লড়াইয়ের অতীত রয়েছে। 

এইচটিএস আসাদবিরোধীদের ‘মিলিটারি অপারেশনস কমান্ড (এমওসি)’ জোটে নিয়ে এসে চূড়ান্ত আক্রমণের রূপরেখা সাজায়। এমওসি ঘোষণার তিন দিন পর ৩০ নভেম্বর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলেপ্পো দখলে নেয়। ৫ ডিসেম্বর এমওসি জোট দক্ষিণের হামা জয় করে। রাজধানী দামেস্ক থেকে উপকূলীয় শহর লাক্কাটিয়া ও তারতুসকে সংযোগকারী হোমস শহরের পতন হয় ৭ ডিসেম্বর। তারতুস আসাদের বাহিনীর দুর্গ বলে পরিচিত ছিল; তাই এর পতন যেন রাজধানীর পতনকে সময়ের ব্যবধানে পরিণত করে। এরপর সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘সাউদার্ন অপারেশন রুম’ দারা, আল-সুয়েদা ও কুয়েনেত্রা দখল করে দামেস্ককে উত্তর ও দক্ষিণে ঘিরে ফেলে। ৮ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম দামেস্কে প্রবেশ করে তারাই। পরে এইচটিএস যোদ্ধারা দামেস্কের দখল নিয়ে নেয়। এইচটিএস দামেস্কের নতুন সরকারব্যবস্থা তৈরির কেন্দ্রে রয়েছে। দেশের বাকি প্রান্তের সঙ্গে দামেস্কের সমন্বয় কীভাবে ঘটে, তাই এখন দেখার বিষয়।  

বহুপক্ষীয় যুদ্ধের অন্যতম সংগঠন ‘সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এসএনএ)’ উত্তর সিরিয়ার বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণকারী। তুরস্কের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আসাদবিরোধী লড়াই চালিয়ে আসা জোটটি ২০১৭ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত। এতে আরব জাতিগোষ্ঠীর সদস্য যেমন রয়েছে, আবার সিরীয় তুর্কমেন জনগোষ্ঠীর মানুষও এখানে যুক্ত। আইএস এবং কুর্দি জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সমধর্মী অবস্থান, আঙ্কারার সঙ্গে এসএনএর সুসম্পর্কের ভিত্তি। উল্লেখ্য, সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তবর্তী কুর্দি জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী জাগরণকে আঙ্কারা সহ্য করতে পারে না। এখন দামেস্কের নতুন শাসক হিসেবে আবির্ভূত হওয়া আল-জোলানির বাহিনীর সঙ্গে এসএনএর মৈত্রীর সম্পর্ক হলেও ভবিষ্যতে তা কী হবে, সেটি বলা মুশকিল। যুদ্ধসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর শাসনাধীন মুক্তাঞ্চল থাকার পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষক পরাশক্তিগুলোর মদদের কারণে সংগঠনগুলোর ঐক্য প্রক্রিয়া কঠিন। যেমন তুরস্ক সীমান্তের ওপাশে এসএনএর অস্তিত্ব ও প্রভাব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া থাকবে, কারণ সিরীয় শরণার্থীদের ফেরার পথ পরিষ্কার করতে এবং কুর্দিদের ঠেকিয়ে রাখতে তার ‘প্রক্সি’ তথা ‘ছায়া’ শক্তি প্রায়োজন।

আইএসবিরোধী লড়াই এবং আসাদের শাসন উৎখাত প্রশ্নে ‘সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)’ আরেকটি বৃহৎ জোট। কুর্দি জনগোষ্ঠীর ‘কুর্দিশ পিপলস প্রটেকশন ইউনিটস (ওয়াইপিজি)’ নামের সংগঠনটি ২০১৫ সালে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে আত্মপ্রকাশ করে, যাদের সঙ্গে নানা জাতিভুক্ত যোদ্ধারা রয়েছেন। আসাদের পতনের পর এসএনএর সঙ্গে তাদের সংঘাত আবারও ত্বরান্বিত হতে পারে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রশাসন মনে করে, আঙ্কারার সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত ‘কুর্দিস্তান ওয়াকার্স পার্টি (পিকেকে)’ ওয়াইপিজির বৃহত্তর ছাতার অন্তর্ভুক্ত। এদিকে, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনপুষ্ট সংগঠন ওয়াইপিজি। ইউফ্রেটিস নদী এসএনএ ও এসডিএফের শাসনাধীন এলাকাকে বিভক্ত করে দিয়েছে। এই দুই সংগঠনের আন্তঃসংঘাতের পাশাপাশি তাদের নিজ নিজ অবস্থানের সঙ্গে দামেস্কের যোগাযোগের গতিপ্রকৃতি আগামী দিনগুলোতে সুখকর কিছু হবে, এমন ভাবা অতি-কল্পনা। এখানে বড় সংকটের জায়গা হলো আদর্শিক অবস্থান। এসডিএফ তাদের ঘোষণাপত্রে একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও ফেডারেল শাসনব্যবস্থার কথা জানায়। অন্যদিকে, আল-জোলানির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলামপন্থি ভাবধারার প্রভাব রয়েছে।

সিরিয়ার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু অংশে আইএসের অবশেষ, আরও কিছু ছোট বিদ্রোহীর সংগঠনের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রধান তিন-চারটি বিদ্রোহী জোটই নিজ নিজ মুক্তাঞ্চল তৈরি করেছে। এসডিএফ এখন আল-রাকা, হাসাকা, দাইর আল-জাওর এবং আলেপ্পোর কিছু প্রত্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এসএনএ উত্তর সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। আর এইচটিএসের নেতৃত্বাধীন জোট দেশের বাকি অংশের নিয়ন্ত্রক। বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রার উল্টোদিকে আসাদের বাহিনীর সমর্থনে যারা লড়াই করেছিল, তাদের অনুপস্থিতি নজর কেড়েছে। ইসরায়েলের লাগাতার আক্রমণে সিরিয়ায় লেবানন-ভিত্তিক হিজবুল্লাহর সমর্থনপুষ্ট গেরিলারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছে। গাজা যুদ্ধের পর ইরানের ছায়াযুদ্ধের (প্রক্সি ওয়ার) যে জালের কথা বলা হচ্ছিল, তার ভেঙে পড়াটা করুণভাবে ধরা পড়েছে। আসাদবিহীন সিরিয়ায় শিয়াপন্থি যোদ্ধা দলের নতুন করে ডালপালা বৃদ্ধি করাটা সহজে সম্ভব হবে না।

সিরিয়ার নানা অঞ্চলে নানা গোষ্ঠীর প্রভাব অটুট থাকার বিষয়টি লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খায়। গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়ায় পূর্ব এবং পশ্চিমে বিভক্ত হয়ে রয়েছে এবং সেখানে দুটি সরকার ক্রিয়াশীল। প্রায় দেড় দশক ধরে সেখানে জাতিগত বিভক্তি আর সহিংসতা চলছে। খলিফা হাফতারের নেতৃত্বে সৌদি আরব, জর্ডান, আরব আমিরাতের সমর্থনে সরকার চলছে একদিকে, আর ওদিকে রাজধানী ত্রিপোলিকেন্দ্রিক শাসনের সমর্থনে পশ্চিমা বিশ্ব। যে গণতন্ত্র এবং গণআকাক্সক্ষার কথা বলে গাদ্দাফিকে উৎখাত করা হয়েছে, সেসব এখন মিছে প্রতিশ্রুতিতে পর্যবসিত হয়েছে। পশ্চিমা শাসকদের পাশাপাশি জাতিসংঘ লিবিয়ায় গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার ঐক্য সরকার গড়তে তৎপর হয়েছে। কিন্তু সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থই হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি গোত্রে গোত্রে সহিংসতার কারণে নানা প্রান্তে প্রশাসনিক প্রভাবই নেই। খালিফা হাফতারের বাহিনী ত্রিপোলি দখলের চেষ্টা চালাতে গেলে অতীতে বহু প্রাণহানি হয়। সিরিয়ার বিদ্রোহীরা অনেক আগে থেকেই নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বেসামরিক শাসন চালিয়ে আসছে। সিরিয়ার পক্ষগুলো দীর্ঘদিন যুদ্ধে সক্রিয়। সুতরাং লিবিয়ার এই পরিণতি দেখে সিরিয়া পর্বটি কল্পনা করা যায়; যা হয়তো আরও সংঘাতপ্রবণ, আরও বিভক্তিপূর্ণ এবং আরও জটিল কিছু হতে যাচ্ছে।

লেখক: অনুবাদক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত