বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিশ্রুতি হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনের মানোন্নয়নে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যার ভিত্তি হবে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। আমরা একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেব, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম সমন্বয় করবে।’
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এলজিইডি-আরডিইসি ভবনের মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে প্রতিবন্ধী নাগরিক শ্রেণির সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। এতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে একটা ন্যায্য টাকা দিতে চাই। দেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আপনাদের নিয়োগ করলে প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্স সমন্বয়ের একটা চিন্তাও আমাদের আছে। উদ্যমীদের সহজে ঋণ দেওয়া, সরকারি চাকরিতে একটি নির্দিষ্ট অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সংস্কার এনে কীভাবে সুবিধা দেওয়া যায়, তা ভাবা হবে। স্বাস্থ্যসেবা পেতে হাসপাতালগুলোয় বিশেষ ইউনিট করা হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হবে।’ তিনি বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে কথা বলছি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের পরিবারের অংশ। আমাদের সমাজের অংশ। আপনারা আমাদের প্রেরণার উৎস। আপনাদের অনুভূতিগুলোকে আমি শ্রদ্ধা করছি। প্রকৃত সক্ষমতা মেধা দিয়ে প্রমাণ হয়। আমি একজন রাজনীতির কর্মী হিসেবে প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সামনের বাংলাদেশে কোনো বৈষম্য হবে না। গত ১৬ বছরে আপনাদের মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিএনপি সব সময় আপনাদের পাশে থাকবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে আপনাদের অধিকার রক্ষা করার। যার ভিত্তি হবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আল্লাহর কৃপায় আপনাদের মতো কঠিন শারীরিক বা মানসিক পরীক্ষার মুখোমুখি হইনি, তারা অনেক সময় বুঝতেই পারি না কী অসীম বাধা অতিক্রম করে আপনারা স্বপ্ন দেখেন এবং আমাদেরও স্বপ্ন দেখতে শেখান। আপনারা আমাদের মনে করিয়ে দেন, সব অক্ষমতাকে জয় করে সমাজের প্রতিটি মানুষ মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চায় এবং দৃঢ়তার সঙ্গে সসম্মানে বাঁচতে পারে। আপনাদের সেই সাহস, সংকল্প ও শক্তি আমাদের জন্য প্রেরণার উৎস। এটি আমাদের উদ্বুদ্ধ করে একটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘নতুন আইন প্রণয়ন, বিদ্যমান আইনের সঠিক বাস্তবায়ন, বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি, কিংবা সেই অর্থের সুষ্ঠু বণ্টন যেভাবেই হোক, আমরা চেষ্টা করব আপনাদের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করতে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেকের জন্য সমান ন্যায্যতা ও একটি ফেয়ার শেয়ার নিশ্চিত থাকবে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘সুবর্ণ নাগরিক কার্ড নামক যে তথাকথিত কার্ড রয়েছে, সেটিকে গতিশীল করে আমরা এর আওতায় স্বাস্থ্য বীমা, শিক্ষা বৃত্তি, পরিবহন ডিসকাউন্টসহ অন্যান্য সামাজিক সুবিধা প্রদান করতে চাই। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা যাতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন, আমরা তাদের জন্য বাস্তবসম্মত ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব। বিশেষত আউটসোর্সিং, ডেটা প্রসেসিং এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিন্তু মেধাবী তরুণদের জন্য সুনির্দিষ্ট কারিগরি ও কাঠামোগত সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি, ট্যাক্স ওয়েভার এবং ওয়ার্ক স্টেশন সৃষ্টির সুযোগ কার্যকরভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার বিষয়টি বিবেচনা করব এবং তাদের স্বাস্থ্যসেবা বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করতে চাই। বিএনপি সরকার গঠন করলে, জেলাপর্যায়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থাকবে, যেখানে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ, ব্রেইলসহ ইনক্লুসিভ এডুকেশনের আধুনিক পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে।’
প্রতিবন্ধীদের সাফল্য হিসেবে পটুয়াখালী একজন বাকপ্রতিবন্ধী ও একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী, মৌলভীবাজারে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এবং কুমিল্লার একজন চলার শক্তিহীন প্রতিবন্ধীর কাজ করে করে অর্থ উপার্জনের চারটি গল্প তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘তাদের গল্প আমাদের শিখিয়েছে বাধা শুধু একটি শব্দ, যা চেষ্টার মাধ্যমে জয় করা সম্ভব। আমাদের দায়িত্ব তাদের লড়াইকে সম্মান জানানো, তাদের পাশে দাঁড়ানো।’
অনুষ্ঠানে মুক্ত আলোচনায় বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক প্রতিবন্ধীরা তাদের দুঃখ-বেদনা এবং প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইনের সংশোধনসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আজকে এখানে এসে আমার কাছে নতুন জগৎ উন্মোচিত হয়েছে, এখানে না এলে এর সঙ্গে পরিচিত হতে পারতাম না। আমরা আপনাদের সহযাত্রী। ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আপনাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদের (পিএনএসপি) সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব (হুইলচেয়ারে বসা প্রতিবন্ধী) এবং আরেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইফতেখার মাহবুবের সঞ্চালনায় মতবিনিময় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, নির্বাহী কমিটির সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. পারভেজ রেজা কাকন ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দেড় শতাধিক প্রতিবন্ধী নাগরিক এতে অংশ নেন।
এই মতবিনিময় অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন, বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা শারমিন পুতুল, জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম রনি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিক এম সাঈদ খান, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ফারহান আরিফ।
