মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মেডিকেল ক্যাম্পটি সংরক্ষণের দাবি

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৫৫ এএম

মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সারা দেশের অনেক স্থানেই গড়ে উঠেছিল অস্থায়ী চিকিৎসা ক্যাম্প। যুদ্ধের সময় এই মেডিকেল ক্যাম্পগুলোর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসার জন্য রাজবাড়ীতেও ছিল একটি মেডিকেল ক্যাম্প। প্রায় তিন মাস এই ক্যাম্পে যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে এই ক্যাম্পটির কথা এখনো অজানাই রয়ে গেছে অনেকের কাছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে ক্যাম্পটি সংরক্ষণ করা।

জানা যায়, রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া গ্রামে ১৯৪৭ সালে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধের সময় বিদ্যালয়টি একটি টিনের চারচালা ঘর ছিল। সেই সময়ে যা অস্থায়ী চিকিৎসা ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরে ঘরটি আধাপাকা করা হয়। ২০২২ সাল পর্যন্ত ভবনটিতে পাঠদান করা হতো। বর্তমানে নতুন ভবনে বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম স্থানান্তর হওয়ায় ভবনটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেথুলিয়া গ্রামে অবস্থিত ৪০ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই হাতের বাম পাশে একটি টিনশেড পাকা ভবন। ভবনটির একটি বারান্দা রয়েছে। চালের টিনগুলো মরিচা ধরে ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে।

রাজবাড়ী জেলা যুদ্ধকালীন কমান্ডার বাকাউল আবুল হাশেম বলেন, ‘আমি যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে আমার সঙ্গীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। সিদ্ধান্ত নিই রামকান্তপুর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের পাশে একটি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করব। তৎকালীন সিভিল সার্জন হুমায়ুন কবির এবং ডা. গোলাম মোস্তফা এগিয়ে আসেন। হাসপাতালে সেবা দেওয়া দুরূহ হওয়ায় লোকচক্ষুর আড়ালে মাটিপাড়া স্কুলের একটি ঘরে মেডিকেল ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়। ডাক্তার হিসেবে গোলাম মোস্তফা দায়িত্ব নিয়ে প্রতিদিন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে থাকেন। তিনি ইলিয়াস আলী নামে এক যোদ্ধার বড় অপারেশনও করেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন আলী মৃধা বলেন, ‘যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ২৫ বছর। তখন সদর হাসপাতালে বিহারিদের আনাগোনা থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা ভয়ে সেখানে যেতে পারতেন না। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেওয়া হতো গোপনে। বেথুলিয়া এলাকাটি নির্জন হওয়ায় এখানে নির্ভয়ে মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসা নিতে আসতেন। প্রতিদিনই কেউ না কেউ আহত হয়ে এখানে আসতেন। প্রায় তিন মাস এই ক্যাম্পে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর এই ক্যাম্পের কথা আর তেমন স্মরণে রাখা হয়নি। কয়েক বছর আগেও এটিকে স্কুলের ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। টিনশেডের এই ভবনটি এখন পড়ে আছে। নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ মানুষই জানে না এই ক্যাম্পের কথা। বর্তমান সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে এই ক্যাম্পটিকে সংরক্ষণের দাবি জানাই।’

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সোবাহান বলেন, ‘আমি এই স্কুলের শিক্ষক ছিলাম। এই সেবা দেওয়া হাসপাতালটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। স্মৃতি-জড়িত এই মেডিকেল ক্যাম্পটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত