সম্ভাবনার এই সোনালি সময়েও নিষ্প্রয়োজনীয়-অবান্তর নানা ইস্যুতে বরবাদ হতে বসেছে সম্ভাব্য জাতীয় ঐক্য। ক্ষমা দূরে থাক, শেখ হাসিনা আজতক কোনো অনুশোচনা বা আফসোস করেছেন বলে তথ্য নেই। বরং উতরানোর সুযোগ আশা করার বাণী আছে। এ জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন ভার্চুয়াল জগৎ। বরাবরের মতোই উল্টাসিধা বলছেন। তার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ করায় সেগুলো গণমাধ্যমে আসছে না। এর বিপরীতে বিপ্লব-অভ্যুত্থানের সঙ্গে একটুও প্রাসঙ্গিক নয় এমন নানা বিষয় সামনে এনে গণ্ডগোল পাকানো হচ্ছে হরদম। খেলা আগেরটাই। নানা বিভক্তি পয়দা করে জাতিকে ঐক্যের পথ মাড়াতে না দেওয়া।
গণ-অভ্যুত্থানে যেজন্য মানুষ রাস্তায় নেমেছিল সেদিকে না গিয়ে দেশকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার আয়োজন ব্যাপক। নতুন নানা এজেন্ডা এনে ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট। সেই একই স্টাইল। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে ঢাকার মানুষকে গৃহবন্দি করে ঢাকা শহরে কেবল নরেন্দ্র মোদি, শেখ হাসিনার ছবি বা শেখ মুজিবের ছবি দিয়ে শহর সাজানো হয়েছিল। শহরের কোথাও বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি ছিল না, সেক্টর কমান্ডারদের ছবি ছিল না, জাতীয় চার নেতার ছবিও জায়গা পায়নি। তখন যারা চুপচাপ সেগুলো দেখেছেন এখন তারা সরকারি প্রকাশনায় মুক্তিযোদ্ধাদের কেন ছবি নেই এ প্রশ্ন তুলে ধুলায় গড়াগড়ি দিচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মকে সামনে রেখে স্বাধীনতার বিরোধিতা করে নিপীড়ন চালিয়েছে কতগুলো ধর্মনির্ভর দল। এর দায় ধর্মের নয় ধর্মকে যারা ব্যবহার করেছে তাদের। আবার আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে দুষ্কর্ম করেছে এর জন্য মুক্তিযুদ্ধ দায়ী নয়। আবার মুক্তিযুদ্ধ আর জুলাই অভ্যুত্থান সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু এ দুটোকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ঢের অপচেষ্টা চলছে। এ দেশের কোনো মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিয়ে অন্য কিছুকে রিপ্লেস করতে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগের বর্ণনা ও তাদের মালিকানাধীন মুক্তিযুদ্ধ আর এবারের বিজয়কে নিজেদের করার গোষ্ঠীর তৎপরতাও গেল আন্দোলনে হতাহতদের জন্য কষ্টের। আন্দোলনের শুরু হয়েছিল ছাত্রদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আবহ এখন আর সেখানে নেই। কোটা বাতিল ছাড়া গত চার মাসে শিক্ষায় বৈষম্য তাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নেই। এটি পলাতক ফ্যাসিস্টদের জন্য আশা জাগানিয়া। শেখ হাসিনা বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন ভারতের সহযোগিতায়, তা বায়নোকুলার দিয়ে দেখার বিষয় নয়। যে কারওই বোধগম্য। তিনি তাদের তত্ত্বাবধানে বেশ আছেন। নিজের পতন নিশ্চিতের পর এখন তার বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐক্যও অনিবার্য করলেন শেখ হাসিনা।
তার বিরুদ্ধে তেড়ে আসা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যাওয়াও তার নিজেরই কর্মফল। তার এক কাপড়ে পালানোর পর আন্দোলনকারীদের ঐক্যে টুকটাক গোলমালও পাকতে থাকে। ওই আন্দোলনে কার ভূমিকা বেশি ছিল, কার লোক বেশি হতাহত হয়েছে, এখন কারা বেশি খবরদারি করছে, ড. ইউনূস কি পারবেন পরিস্থিতি সামলাতে, সংস্কারে কতদিন লাগবে, নির্বাচনে দেরি হচ্ছে কেন? এ ধরনের নানা প্রশ্নে কিছুটা খটকা লাগতে থাকে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিও দুর্বল হতে থাকে। দলটির নেতাদের কেউ কেউ ভেতরে ভেতরে একটু-আধটু করে স্যোশাল কন্টাক্ট চালাতে থাকেন। এমন কথাও সামনে আসতে থাকে, আওয়ামী লীগের সবাই খারাপ না। সবাই তো লুট, পাচার করেনি। খুন-খারাবিতে সবাই জড়িত ছিল না। এ বিবেচনায় তুলনামূলক ভালো আওয়ামী লীগারদের দিয়ে দলটিকে আবার সংগঠিত করার গুঞ্জনও হালে পানি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে কথা ঘুরতে থাকে আওয়ামী লীগকে ছাড়া কি নির্বাচন করা ঠিক হবে? এ ধরনের একটি আবহ ভ-ুল করে দিলেন শেখ হাসিনা নিজেই। এক এক সময় তার মুখদোষে ঠাসা এক একটা বাজে কথার অডিও পায়। ফলে তার আশ্রয়দাতা দেশ ভারতের অতিতৎপরতা আরও সর্বনাশ করে দেয়। সরকার কঠোর হয়ে ওঠে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, বিএনপি, জামায়াতসহ ডান-বামের প্রায় সব দল ম্যাজিকের মতো এক হয়ে যায়। থেমে যায় তাদের মধ্যে শুরু হওয়া মনোমালিন্য ও কথার খোঁচাখুঁচি। অল্পতেই এক কাতারে সবাই শামিল হয়ে যায় জাতীয় ঐক্যের শামিয়ানায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি এখন এমন যে, প্রশ্ন করার জো নেই কে-কারা আছে জাতীয় ঐক্যে? আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়াকার্স পার্টিসহ ১৪ দল না থাকলে কি সর্বদলীয় ঐক্য হয় এমন প্রশ্ন করলে এখন ফুটপাতের হকার পর্যন্ত নগদে ধোলাই দেবে। জাতীয় ঐক্য তো এখন এদেরই বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির এখন এক কথায় প্রকাশ ‘ফ্যাসিস্ট’। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণকারী। পুরনো কথা সামনে আসছে নতুন করে। টানা ১৫-১৬ বছর আওয়ামী লীগের মিত্র হয়ে মন্ত্রিত্ব-এমপিত্বসহ ক্ষমতার ছানা-মাখন খেয়ে তাজা হওয়াদের মধ্যে জাতীয় পার্টি একটা মোচড় দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বলা শুরু করেছিল, তারাও আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট মনে করে। কিন্তু, অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পটিয়ে পাটিয়ে তাদের মন্ত্রী-এমপি বানিয়েছে। প্রতিদিনই তারা ফ্যাসিস্ট-দুর্বৃত্তায়নের সমালোচনা করতে থাকে। পরিমাণে একটু বেশি করে ফেলায় অন্যরা বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা কেসটা ধরে ফেলেন। তার ওপর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গিয়ে দেশটির স্পেশাল আতিথেয়তায় দেশে একের পর এক ষড়যন্ত্র ও নৈরাজ্য সৃষ্টির তথ্য-সাবুদ বাংলাদেশের অনেককে আহত করে। এরই সম্মিলন জাতীয় ঐক্য। ড. ইউনূসের পক্ষে পঙ্গপালের মতো শামিল হয়েছে দলগুলো। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের অপপ্রচার, হস্তক্ষেপ ও উসকানির বিষয়ে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে। তিনি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র চলছে উল্লেখ করে তা রুখে দিতে সব রাজনৈতিক দলের কাছে ঐক্য চেয়েছেন। কিন্তু ভেতরে এবং প্রকাশ্যে নমুনা ভালো নয়। ফরজ বাদ দিয়ে নফল নিয়ে টানাটানিটা বেশির চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে।
দেশের প্রশ্নে সবার এক হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অন্য উচ্চতার ইতিহাস তৈরি করেছে। বৈঠকে ভারতে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন তৎপরতা, আগরতলায় সহকারী হাইকমিশনে হামলা, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ ইত্যাদির তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এ সবের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ ও সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে এবং সরকারের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করা হয়েছে। বৈঠকে ভারতের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালীভাবে সরকারকে বিষয়গুলো মোকাবিলা করার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে আবার শেখ হাসিনার দুষ্ট ও উগ্রবাদী বক্তব্য গণমাধ্যমে না আসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের হওয়া চুক্তিগুলো প্রকাশ করা এবং রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দেশের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি বাতিলের দাবি জানানো হয় বৈঠকে। ৬৪ জেলায় একটি করে সম্প্রীতি সমাবেশ করার প্রস্তুতির পরামর্শ রয়েছে। বিজয়ের মাসে এমন একটি কর্মযজ্ঞ যেনতেন বিষয় নয়। এর আগে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে বিজয়ী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বসেছেন। পরদিন বসেছেন প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে। এর পরদিন বৈঠক করেন ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে। সবশেষে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে। এর আগে, ৪ ডিসেম্বর ঢাকার মিরপুর সেনানিবাসের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ কমপ্লেক্সে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স ২০২৪ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স ২০২৪-এর কোর্স সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সার্টিফিকেট দেন। সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশ কঠিন সময় পার করছে, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন বলে একটা বার্তা দেন। সেনানিবাস থেকে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়ার আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ঐক্য প্রশ্নে এর পরের আয়োজন হয় রাষ্ট্রীয় ভবনে। যা এ সময়ের একটি ঘটনাই নয়, দলিলও।
সেই দলিলকে বুকে ধারণ না করে বাড়তি কাজ ও কথার ব্যাপকতা কেবল ঐক্যকে ব্যাহত করবে না, বিভক্তিকে আমন্ত্রণ করবে। গিলতে বা উগলাতে ব্যর্থ হলে নতুনত্ব আসে না। প্যারোডি আসে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের উপলব্ধি এখানে আনতেই হয়। ‘যেকোনো বাজারে গেলে দুই-তিন ধরনের চাঁদাবাজ দেখা যায়। এদের ভেতর কিছু (চাঁদাবাজ) আগের সরকারের, কিছু লোক ভবিষ্যৎ সরকারের চাঁদাবাজ, আর কিছু লোক স্থানীয়। তারা পরস্পর সমঝোতা করে চাঁদাবাজি করেন।’ তার এ কথা ও উপলব্ধির মধ্যে আগামীর একটা বার্তা পরিষ্কার। যা ২৪-এর সঙ্গে যায় না। ৭১-এর সঙ্গেও নয়। নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বরের কথা এখন আগের মতো নেই। এবারের ৬ আগস্টে কোনো জাতীয় দৈনিক বা টেলিভিশনে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ৫ আগস্টও যেন এভাবে হারিয়ে না যায়, সেই ফরজ কাজের নমুনা কিন্তু নেই। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে, যুগে যুগে স্বৈরাচারের উত্থানে জনগণের হৃদয় থেকে এই ধরনের দিবস হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা জনগণের দোষ নয়। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর, নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বর বা চব্বিশের ৫ আগস্ট কোনোটির সঙ্গে কোনোটিকে মেলানো ঠিক নয়। আবার চেতনাগতভাবে ভিন্ন বা সাংঘর্ষিকও নয়। কিন্তু ফরজে গোলমাল থাকলে সংঘর্ষ-রিমিক্সসহ আরও কত কিছু হয়ে যায়!
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
