বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে ধারণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ভোট কবে হবে তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে কতটা সংস্কার করে নির্বাচনে যাওয়া হবে, তার ওপর। মোটাদাগে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে হতে পারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় জানালেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান। তিনি বলেছেন, ২০২৫ সালের শেষদিকে কিংবা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে পারে। অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি তোলার প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার সকালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস নির্বাচনের সম্ভাব্য এ সময়ের কথা জানান।
তবে প্রধান উপদেষ্টার এ বক্তব্যে দৃশ্যত সন্তুষ্ট নন বিএনপি নেতারা। তারা বলেন, সরকার আন্তরিক হলে প্রধান উপদেষ্টা উল্লিখিত সময়ের আরও আগেই নির্বাচন সম্ভব। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ধারণা নয়, বিএনপি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চায়। সংস্কারের নামে অযথা সময়ক্ষেপণ দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের সুযোগ করে দেবে। একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, খুব তাড়াতাড়ি মানুষের ইচ্ছার সময়ের মধ্যে নির্বাচনে না গেলে মানুষ বিক্ষুব্ধ হবে।
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে একই সঙ্গে নিখুঁত ভোটার তালিকা তৈরিসহ এ ধরনের আরও কিছু ‘অপরিহার্য’ কাজ নির্বাচনের আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমেই সম্পন্নের কথা বলেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
আর জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিচার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। যারাই বিচারের আগে কোনো নির্বাচনের ‘পাঁয়তারা’ করবে, তাদের জাতীয় শত্রু হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
দেশে সর্বশেষ (দ্বাদশ) সংসদ নির্বাচন হয়েছিল চলতি বছর ৭ জানুয়ারি। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় এলেও গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়। প্রবল আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। আর এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ শপথ গ্রহণ করে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারে জোর দিলেও নির্বাচনের সম্ভাব্য কোনো সময় জানানো হচ্ছিল না। অন্যদিকে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছিল। এর আগে সরকারের একাধিক উপদেষ্টা, এমনকি সেনাপ্রধানও নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন, তবে সেগুলো ছিল তাদের ব্যক্তিগত অভিমত, অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে কথা বলেন ড. ইউনূস। এ ছাড়া তিনি গুম কমিশনের প্রতিবেদন, শ্বেতপত্র, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, অর্থ পাচার, ঐকমত্য কমিশন গঠন, সংস্কার প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি সব প্রধান সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে নির্বাচন আয়োজন করার ব্যাপারে বারবার আপনাদের কাছে আবেদন জানিয়ে এসেছি। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কারণে আমাদের যদি, আবার বলছি ‘যদি’, অল্প কিছু সংস্কার করে ভোটার তালিকা নির্ভুলভাবে তৈরি করার ভিত্তিতে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়, তাহলে ২০২৫ সালের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়তো সম্ভব হবে। আর যদি এর সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রত্যাশিত মাত্রার সংস্কার যোগ করি তাহলে অন্তত আরও ছয় মাস অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। মোটা দাগে বলা যায়, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা যায়।’
অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, সেসব কমিশনের চেয়ারম্যানদের নিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন’ গঠন করবেন বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এর কাজ হবে রাজনৈতিক দলসহ সবপক্ষের সঙ্গে মতামত বিনিময় করে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য স্থাপন হবে সেগুলো চিহ্নিত করা এবং বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা।’ ছয় কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আগামী জানুয়ারিতেই ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন’ কাজ শুরু করতে পারবে এমন আশাবাদের কথাও জানান সরকারপ্রধান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যেহেতু জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা অন্তর্বর্তী সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, তাই তিনি নিজেই ওই কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তার সঙ্গে এ কমিশনের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। কমিশন প্রয়োজন মনে করলে নতুন সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর কাজের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন। এর একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সংস্কারের যে আকাক্সক্ষা, সেটি বাস্তবায়নে প্রতিটি কমিশনই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের কথা আমি একটু আলাদাভাবে বলতে চাই, কেননা এ দুটি কমিশনের সুপারিশের ওপর প্রধানত নির্ভর করছে আমাদের আগামী নির্বাচন প্রস্তুতি ও তারিখ।’
ইতিমধ্যে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘এখন থেকে তাদের হাতে দায়িত্ব ন্যস্ত হলো ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করার। তারা তাদের প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছেন। তাদের হাতে অনেক কাজ।’
প্রধান উপদেষ্টা মনে করেন, প্রথমে সবচেয়ে বড় কাজ হলো ভোটার তালিকা হালনাগাদ। তিনি বলেন, ‘এটা এমনিতেই কঠিন কাজ। এখন কাজটা আরও কঠিন হলো এজন্য যে গত তিনটা নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল না। ভোটার তালিকা যাচাই করার সুযোগ হয়নি কারোর। গত ১৫ বছরে যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য হয়েছে তাদের সবার নাম ভোটার তালিকায় তোলা নিশ্চিত করতে হবে। এটা একটা বড় কাজ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এখানে গলদ রাখার কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন পর এবার বহু তরুণ-তরুণী জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবে। অতীতে তাদের সে অধিকার এবং আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তাই এবারের নির্বাচনে তাদের ভোটদান একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে। এই অভিজ্ঞতাকে মসৃণ করার সব আয়োজন করতে হবে।’ আগামী নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তরুণ-তরুণী ভোটাররা ১০০ শতাংশের কাছাকাছি সংখ্যায় ভোট দিয়ে ঐতিহ্য সৃষ্টি করবে নিজের এমন প্রত্যাশার কথাও জানান ড. ইউনূস।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এবং সব সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের প্রতি আমার আহ্বান, সবাই মিলে আমরা যেন এই লক্ষ্য অর্জনে নানা প্রকার সৃজনশীল কর্মসূচি গ্রহণ করি। এখন থেকে সবাই মিলে এমন একটা ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পারি যে, স্থানীয় নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে সব কেন্দ্রে প্রথমবারের ভোটাররা ১০০ শতাংশের কাছাকাছি সংখ্যায় ভোটদান নিশ্চিত করবে। এটা নিশ্চিত করতে পারলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার সাহস করতে পারবে না।’
নতুন ভোটার ছাড়াও যাদের আগে থেকে ভোটার তালিকায় নাম থাকার কথা ছিল, তারা ভোটার তালিকায় আছেন কি না, তা নিশ্চিতের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধান উপদেষ্টা। ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কাজে বিশেষ মনোযোগ দিতে বলেন।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের বিষয়েও জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এবার আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট দেওয়া নিশ্চিত করতে চাই। অতীতে আমরা এ ব্যাপারে অনেকবার আশ^াসের কথা শুনেছি। এই সরকারের আমলে এটা যেন প্রথমবারের মতো বাস্তবায়িত হয় এটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই। এর জন্য একটা নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা করতে হবে।’
তবে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি এবং সংস্কারের জন্য যে সময় প্রয়োজন, সে কথা আবারও মনে করিয়ে দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘সবকিছুই সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এর সঙ্গে যদি আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও উন্নত করতে চাই, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলে প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিস্তৃতি ও গভীরতা অনুসারে নির্বাচন কমিশনকে সময় দিতে হবে।’
লক্ষ্য পূরণে সবাইকে গণঅভ্যুত্থানের ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সজাগ থাকুন। নিজের লক্ষ্যকে জাতির লক্ষ্যের সঙ্গে একীভূত করুন। পৃথিবীর কোনো শক্তিই আমাদের লক্ষ্য অর্জন থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।’
প্রধান উপদেষ্টা সকাল ১০টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তার ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে সম্প্রচার করা হয়। ভাষণের শুরুতেই তিনি স্মরণ করেন মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ আর অগণিত শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ জনতার আত্মত্যাগের কথা; যার ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সেই অর্জনকে আমাদের দোষে সম্পূর্ণতা দিতে পারিনি। সর্বশেষ এবং প্রচণ্ডতম আঘাত হানল এক স্বৈরাচারী সরকার। সে প্রতিজ্ঞা করেই বসেছিল এ দেশের মঙ্গল হতে পারে এমন কিছুই সে অবশিষ্ট থাকতে দেবে না।’
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ‘স্বৈরাচারী’ সরকারের পতনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ বছরের বিজয় দিবস বিশেষ কারণে মহা আনন্দের দিন। মাত্র চার মাস আগে একটি অসম্ভব সম্ভব হয়ে গেল, দেশের সবাই মিলে একজোটে হুংকার দিয়ে উঠল, পৃথিবীর ঘৃণ্যতম স্বৈরাচারী শাসককে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে আমাদের প্রিয় দেশকে মুক্ত করেছে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থান। যে হাজার হাজার শহীদ এবং আহতদের আত্মত্যাগ এবং ছাত্র-জনতার অটুট ঐক্যের মাধ্যমে এই গণঅভ্যুত্থান সম্ভব হলো, তাদের সবাইকে স্মরণ করি এবং আজ এবারের মহাবিজয়ের দিনে সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে তাদের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।’
গণঅভ্যুত্থানের ঐক্য এখনো অটুট আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, একটি বৈষম্যহীন দেশ গড়ার তাগিদে ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রক্ত দিয়ে চার মাস আগে নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যে ঐক্য গড়ে তুলেছিল, সে ঐক্য এখনো পাথরের মতো মজবুত আছে। মাত্র কয়েক দিন আগে জাতি আবার গর্জে উঠে সমগ্র পৃথিবীকে সে কথা জানিয়ে দিয়েছে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার সংকল্পে আমরা অটুট আছি।’
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন পূর্তিতে গত ১৭ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে। এটা আর থামবে না। প্রধান উপদেষ্টার এই আশ্বাসের পরও রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা থেকে গিয়েছিল। অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, সরকার কেন নির্বাচনের সম্ভাব্য দিন-তারিখ ঘোষণা করছে না? রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি নেতারা প্রায় প্রতিদিনই সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার কথা বলে আসছেন। আবার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে সরকারের উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকেও একেকজন একেক রকম আভাস-ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন।
গত ১৭ অক্টোবর চ্যানেল আইয়ের ‘আজকের পত্রিকা’ অনুষ্ঠানে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছিলেন, আগামী বছরের মধ্যে নির্বাচন করাটা সম্ভব হতে পারে। তবে এতে অনেকগুলো ফ্যাক্টর আছে। এটি তার প্রাথমিক অনুমান বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
আর সর্বশেষ নির্বাচনের সময় নিয়ে গত ৭ ডিসেম্বর কথা বলেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সেদিন তিনি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আগামী বছর নির্বাচিত সরকার দেখব।’ অবশ্য তিনি এও বলেছিলেন, নির্বাচিত সরকারবিষয়ক এই মত একান্তই তার ব্যক্তিগত। শেষমেশ কী হবে, তিনি জানেন না।
তার আগে গত সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান নির্বাচনের প্রত্যাশিত সময় নিয়ে কথা বলেছিলেন। ওই সাক্ষাৎকারে সেনাপ্রধান বলেছিলেন যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই নির্বাচন হওয়া উচিত। তবে উপদেষ্টারা এবং সেনাপ্রধানের নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে এসব মত ব্যক্তিগত বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছিল। আগামী নির্বাচন কবে হবে, তা প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও প্রেস উইং জানায়।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা : অর্থনীতির সাফল্যের ব্যাপারে দেশে ও বিদেশে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলেও প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকসহ সব দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার সক্ষম হয়েছে। তারা নতুন উদ্যোগে ও নতুন উৎসাহে আমাদের সঙ্গে নতুন আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এগিয়ে এসেছে।’
অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের ব্যাপারে আরোপ করা বিধিনিষেধ এখন আর নেই। অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, অর্থনীতি তখন ভেঙে পড়ার অবস্থায়। গত চার মাসে এ অবস্থার বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা আর নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। কোনো ব্যাংক বন্ধ করে দিতে হয়নি। ব্যাংক যতই দুর্বলই হোক, তাকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ড. ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজন ও সংস্কার ছাড়াও আপনারা আমাদের ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। ফ্যাসিবাদী সরকারের কাছ থেকে আমরা বিপর্যস্ত এক অর্থনীতি পেয়েছি। আমাদের বৈদেশিক রিজার্ভ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের মাসের তুলনায় ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি। সামগ্রিকভাবে ২০২৪ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি ১৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। গত বছর একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ১৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বছরের হিসাবে এই প্রান্তিকে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এসবের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।’
মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সাফল্য আমরা এখনো পাইনি। তবে আমার বিশ্বাস, মূল্যস্ফীতি শিগগিরই কমে আসবে। গত কয়েক মাসে বাজারে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। আমরা সরবরাহ বাড়িয়ে, আমদানিতে শুল্কছাড় দিয়ে, মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে ও বাজার তদারকির মধ্য দিয়ে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এখনো পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। এটা সম্ভব হলে আমরা আশা করি, জিনিসপত্রের দাম আরও কমে আসবে। আমরা আপনাদের কষ্টে সমব্যথী। তবে আমরা জানি, সরকারের কাজ শুধু সমবেদনা জানানো নয়; আমরা আপনাদের কষ্ট কমিয়ে আনতে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
আসন্ন পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে সবার সহযোগিতা চান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাদের কাছে ওয়াদা করেছে, বাজারে পণ্য সরবরাহের কোনো সংকট হবে না। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে যদি কেউ কৃত্রিম কোনো সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করে, আমরা তাকে কঠোর হাতে দমন করব। বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে বিকল্প কৃষিবাজার চালু করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
