বিজয় দিবস উদযাপন করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বরিশালে আওয়ামী লীগ সন্দেহে জাতীয় নাগরিক কমিটির কর্মসূচিতে মহানগর কৃষক দলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গতকাল সোমবার সকালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষ হয়। এ সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ নেতাকর্মী আহত হন। পূর্বশত্রুতার জের ধরে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপি সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান পক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে বিজয়স্তম্ভে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে দুদফা সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ১২ জন আহত হয়েছেন। গতকাল সকালে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের একজনকে গুরুতর অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সোনারগাঁয়ে বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষ: গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপি সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নানের পক্ষের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। দীর্ঘদিন ধরে রেজাউল করিম ও আজহারুল ইসলাম মান্নানের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। উপজেলা পরিষদ চত্বরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজহারুল ইসলাম মান্নান তার লোকজনকে সকাল ৯টায় আসতে বলেন। অন্যদিকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের লোকজনকে সকাল ১০টায় আসতে বলেন। সেই মোতাবেক দুজন নেতাকর্মীদের নিয়ে উপজেলা পরিষদে আসেন। তবে আজহারুল ইসলাম মান্নান শ্রদ্ধা জানানো শেষে কিছু নেতাকর্মীসহ বেলা ১১টার দিকে সেখানেই অবস্থান করেন। এ সময় রেজাউল করিমের লোকজন সেøাগান দেওয়া কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।
এতে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনসহ উভয় পক্ষের মামুন, আব্দুল আলী, সোলায়মান, কবির হোসেন, মাসুদ মিয়াসহ ১০ জন আহত হন। আহতদের সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, ‘প্রশাসন আমাদের সময় বেঁধে দিয়েছে। আমরা আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে ফুল দিতে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ফুল দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় অতর্কিতভাবে হামলা চালানো হয় আমার নেতাকর্মীর ওপর, যা খুবই দুঃখজনক।’
সোনারগাঁ থানা বিএনপি সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান বলেন, ‘রেজাউল করিমের লোকজন শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসে উসকানিমূলক কথা বলার কারণে নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করার কারণে আমাদের লোকজন আহত হয়েছেন।’
সোনারগাঁ থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুল বারী বলেন, ‘বিএনপির দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। এমন কিছুটা হইহল্লা না হলে বাংলাদেশের রাজনীতি আছে এটা বুঝবেন কেমনে?’ তিনি আরও বলেন, ইটের আঘাতে দু-তিনজন আহত হয়েছেন। এখনো কেউ অভিযোগ দিতে আসেননি।
কুড়িগ্রামের বিএনপির দুই গ্রুপে সংঘর্ষ, আহত ১২: কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে বিজয়স্তম্ভে ফুল দেওয়া কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে দুদফা সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ১২ জন আহত হয়েছেন। গতকাল সকালে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের একজনকে গুরুতর অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
জানা যায়, গতকাল সকালে ভূরুঙ্গামারী বাসস্ট্যান্ডের বিজয়স্তম্ভে প্রথমে ফুল দেয় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তফা গ্রুপ। এরপর বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শাহিন শিকদারের লোকজন ফুল দিতে গেলে মোস্তফা গ্রুপের লোকজন বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এরই জের ধরে সকাল ১০টার দিকে শাহিন শিকদারের পক্ষের দলীয় কার্যালয়ের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে উভয় পক্ষের ৯ জন নেতাকর্মী আহত হন। পরে মোস্তফা গ্রুপের সমর্থকরা শাহীন গ্রুপের উপজেলা অফিসের সাইনবোর্ড নামিয়ে তালা লাগিয়ে দেন। পরে বিকেল ৪টার দিকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা শহরের সাদ্দাম মোড়ে শাহিন শিকদারের বাড়িতে ভাঙচুর করেন বিপক্ষ গ্রুপের লোকজন। এ সময় ১০টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। আহত হন তিনজন।
আ.লীগ ভেবে জাতীয় নাগরিক কমিটির কর্মসূচিতে হামলা : বরিশালে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ সন্দেহে জাতীয় নাগরিক কমিটির কর্মসূচিতে হামলা চালিয়েছেন মহানগর কৃষক দলের নেতাকর্মীরা। এতে আয়োজিত দোয়া ও আলোচনা সভা পন্ড হয়ে যায়। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর সোহেল চত্বরে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ উঠেছে, বরিশাল মহানগর কৃষক দলের নেতাকর্মীরা সভায় হামলা চালিয়ে চেয়ার ভাঙচুর, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা এবং নেতাকর্মীদের মারধর করেছেন। এ ঘটনায় জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় এক যুগ্ম সদস্য সচিবসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে সভা শুরুর কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একদল লোক সভাস্থলে ঢুকে হট্টগোল শুরু করেন। তারা চেয়ার ভাঙচুর এবং ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন। এরপর ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন বলে সভা আয়োজকদের গালাগাল করতে থাকেন এবং কয়েকজনকে মারধর করেন।
নাগরিক কমিটির বরিশাল মহানগরের সংগঠক মো. সাজ্জাদুর রহমান শাকিল গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমাদের পূর্বঘোষিত আলোচনা সভার মধ্যে কৃষক দলের লোক এসে আমাদের আওয়ামী লীগের লোক বলে আখ্যা দেন। তারা ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন এবং চেয়ার ছুড়ে মারেন। আমাদের কেন্দ্রীয় এক যুগ্ম সদস্য সচিবকে মারধর করে তাকে বিবির পুকুরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।’
আহতদের মধ্যে রয়েছেন জুলাই বিপ্লবে আহত শিক্ষার্থী হামজালাল, তার মা রুমানা বেগম এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য জিএম মেহেদী হাসান ও মো. আসিফ এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু। আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণের পর থানায় অভিযোগ করতে যান।
জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে দোয়া ও আলোচনা সভা করছিলাম। হঠাৎ আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে আমাদের নেতাকর্মীরা আহত হয়েছেন। আমরা থানায় গিয়ে অভিযোগ দিয়েছি এবং হামলার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
বরিশাল মহানগর কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার মো. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে আওয়ামী লীগপন্থিরা সড়ক আটকে প্রোগ্রাম করছেন। তাদের এ ধরনের কর্মকান্ডের কারণে বাগ্বিতন্ডা হয়। পরে আমরা তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিই।’
মহানগর কৃষক দলের সদস্য সচিব সাঈদ তালুকদার বলেন, ‘আমরা ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোচনা সভা থেকে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, “আওয়ামী লীগ সরকার, বারবার দরকার”। এমন স্লোগান শুনে আমাদের কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে সামান্য অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়েছেন। এখানে বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
