শুধু সাতক্ষীরার নয় সারা দেশের ইয়াসিন হতে চাই

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৬:৪৮ এএম

নেপালে কাবাডি লিগে খেলতে যাবেন। জীবনের প্রথম বিদেশের কোনো লিগে সুযোগ পেয়েছেন। অনুভূতি কেমন?

ইয়াসিন আরাফাত : নেপালে আমি ধনঘাটি দলের হয়ে খেলব। এই অনুভূতি আসলে বলে বোঝানো যাবে না। সেখানে নিজেকে প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ পাব। আমি সেখানে ভালো করলে নৌবাহিনী ও দেশের জন্য কিছু করতে পারব। যখন শুনেছি নেপালের টুর্নামেন্টে বাইরের খেলোয়াড় নেবে, তখন থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম। নিজেকে প্রস্তুতই করছিলাম নৌবাহিনীতে। আরদুজ্জামান মুন্সি স্যার, তুহিন তরফদার স্যাররা সহায়তা করেছেন। হঠাৎ শুনি আমাদের নাম চলে এসেছে। তখন থেকে আনন্দের জোয়ারে ভাসছি। তখন থেকে পরিশ্রম আরও বাড়িয়ে দিয়েছি।

নেপালে খেলে কেমন টাকা-পয়সা পাবেন জানেন?

ইয়াসিন : ওখানে কত টাকা পাব, কী পাব তা নিয়ে ভাবছি না। প্রথমবারের মতো বিদেশে খেলার সুযোগ পেয়েছি। চেষ্টা করব নিজেকে প্রমাণ করতে, দেশের সুনাম, নৌবাহিনীর সুনাম বৃদ্ধি করতে। টাকা-পয়সা যা আসার আসুক।

কাবাডিতে আসার গল্পটা শুনতে চাই।

ইয়াসিন : আমি কাবাডি খেলা শুরু করি ২০১৭ সালে আমার নিজের সাতক্ষীরা জেলায়। তখন আমার বয়স ১৪-১৫ হবে। তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। তখন সবার মতো আমিও ক্রিকেট আর ফুটবল খেলতাম বন্ধুদের সঙ্গে। একদিন আমাদের এক বন্ধু জানায় পাশের গ্রামের ফারুক স্যার চান ছোটদের কাবাডি শেখাতে। আমরা মজার ছলে ওনার কাছে যাই কাবাডি খেলতে। ২০১৭ সালে ওনার কাবাডি অ্যাকাডেমিতে একসঙ্গে ৩৯জন একসঙ্গে ভর্তি হই। ফারুক স্যার আমার প্রথম জীবনের কোচ। ক্লাস এইট পর্যন্ত ওনার কাছে খেলাটা শিখি। এরপর ইন্টার স্কুল কাবাডিতে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। এরপর জেলা দল থেকে বিভাগীয় দল হয়ে ২০২১ সালে ঢাকায় খেলার সৌভাগ্য হয়। ঢাকায় এসে ফেডারেশনের সদস্য মনীর স্যারের ম্যানসিটি ক্লাবে খেলি। এরপর ২০২২ সালে গোপালগঞ্জ একতা ক্লাবের হয়ে খেলি। সেই দলের অধিনায়ক ছিলাম। ২০২২ সালেই আমরা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে চাকরি হয়ে যায়। আর ২০২৩ সালে জাতীয় দলের ক্যাম্পে প্রথম ডাক পাই। ২০২৩ সালের প্রথম দিকে তৃতীয় বঙ্গবন্ধু কাপের প্রাথমিক ক্যাম্পে সুযোগ পেয়েছিলাম। তবে পারফরম্যান্স একটু খারাপ ছিল বলে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ে যাই। তবে ২০২৪ সালে চতুর্থ বঙ্গবন্ধু কাপে জাতীয় দলের হয়ে আমার অভিষেক হয়। এখন আমি নিয়মিত জাতীয় দলের খেলোয়াড়। এভাবেই নৌবাহিনীর হাত ধরে আমার এগিয়ে যাওয়া।

এত খেলা থাকতে কাবাডিতে আসার কারণ?

ইয়াসিন : যে খেলা ছোটবেলায় শখ করে খেলেছি, সেটাকেই এখন পেশা হিসেবে নিয়েছি। ভালো লাগলেও কাবাডি খেলতে হবে, না লাগলেরও খেলতে হবে। তবে এখন আমাদের কাবাডি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে খারাপ লাগার কোনো কারণ নেই।

কাবাডিতে উচ্চতা একটা বড় ব্যাপার। আপনার এই উচ্চতায় (৫ ফুট ৮ ইঞ্চি) কি খেলাটা কঠিন না?

ইয়াসিন : কাবাডিতে উচ্চতা একটা বড় ব্যাপার। কম উচ্চতার খেলোয়াড়দের এই খেলাটা একটু কঠিন। আমারও উচ্চতা কম। তবে এটা নিয়ে আমার কোনো মন খারাপ নেই। কারণ আমাদের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও আমার সিনিয়র টিমমেট তুহিন তরফদার স্যারেরও কিন্তু উচ্চতা কম। তবে উনি আমাদের দেশের অন্যতম সেরা কাবাডি খেলোয়াড়। ওনাকে দেখেই আমি উদ্বুদ্ধ হই। উনি আমার আইডল।

বেশিদিন তো হয়নি জাতীয় দলে এসেছেন। সিনিয়রদের কাছ থেকে তো অনেক কিছু শিখতে পারছেন?

ইয়াসিন : এই খেলাটা হয়তো অন্য খেলার চেয়ে আমাদের দেশে পিছিয়ে। তবে আমাদের যারা সিনিয়র খেলোয়াড় আছেন, তাদের সঙ্গে মিশলে, অনেক উজ্জীবিত হওয়া যায়। আমাদের বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধিনায়ক আরদুজ্জামান মুন্সি আছেন, তুহিন স্যার আছেন। ওনাদের সঙ্গে কথা বললে আপনিতেই খেলার প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়।

এখানে খেললে তো সেভাবে আর্থিক নিরাপত্তা মেলে না?

ইয়াসিন : বোঝার আগেও কাবাডি খেলেছি, বুঝেও কাবাডি খেলছি। যখন বুঝতে পারলাম যে খেলাধুলা করলেও আপনাকে উপার্জন করতে হবে, তখনই সার্ভিসে ঢুকে যাই। এখন চাকরির প্রয়োজনে খেলি।

নৌবাহিনীর চাকরিটা কি স্থায়ী?

ইয়াসিন : হ্যাঁ, আমি নৌবাহিনীতে আছি ল্যান্স কর্পোরাল হিসেবে। এছাড়া গণবিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে।

পরিবারে কে কে আছেন?

ইয়াসিন : পরিবারে পাঁচ সদস্য। বাবা, মা, ছোট ভাই, ছোট বোন আর আমি। বাবা কৃষক। ছোট ভাই বিকেএসপিতে কাবাডি বিভাগে পড়ালেখা করছে। ও বিজয় দিবস কাবাডিতে বাংলাদেশ জেল দলে খেলছে।

সাতক্ষীরা থেকে অন্য খেলার অনেক বড় বড় তারকা উঠে এসেছে। মোস্তাফিজুর রহমান, সাবিনা খাতুন, শিরিন আক্তার, মাসুরা পারভীন। ওদের মতো বড় তারকা হতে ইচ্ছে করে না?

ইয়াসিন : যখন ছোট ছিলাম, তখন দেখতাম শিরিন আপুরা এলাকায় এলে সংবর্ধনা পেতেন। তখন তাদের দেখে খুব ভালো লাগত। কখনো ভাবিনি তারা একদিন আমাকেও চিনবেন। এখন তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়। তারা আমাকে কাবাডি খেলোয়াড় হিসেবে চেনেন। সারা দেশে হয়তো এখনো সেভাবে পরিচিত হইনি। তবে সাতক্ষীরায় সবাই নৌবাহিনীর ইয়াসিন নামে আমাকে চেনেন। তবে শুধু সাতক্ষীরার নয় সারা দেশের ইয়াসিন হতে চাই। এ জন্য কঠোর পরিশ্রম করছি।

ফেডারেশনের কাছে আপনার চাওয়া কী?

ইয়াসিন : ফেডারেশনে এখন নতুন কমিটি এসেছে। দক্ষ সাধারণ সম্পাদক নেওয়াজ সোহাগ স্যার আছেন। তিনি আমাদের জন্য চেষ্টা করছেন অনেক কিছু করার। ফেডারেশনের কাছে তো চাওয়ার শেষ নেই। তারপরও বলি, যদি একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হতো, তাহলে আমরা আরও কিছু উপার্জন করতে পারতাম। এছাড়া যদি ক্লাব লিগ, প্রিমিয়ার লিগ হয় তবে কিছু টাকা পাব। প্রতি বছর যাতে আমরা কিছু আর্থিক সহযোগিতা পাই, এটাই ফেডারেশনের কাছে চাওয়া।

আগে বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে ভালো করত, পদক পেত। এসএ গেমসেও ভালো করত। এখন সেটা হয় না।

ইয়াসিন : আমার তো লক্ষ্য অনেক। তবে সবার আগে নিজেকে ঠিক রাখা, সুস্থ রাখা মূল লক্ষ্য। সামনে যে ক’টি টুর্নামেন্ট আছে, আমি চেষ্টা করব নিজেকে সেরা পর্যায়ে রাখার। এরপর বড় মঞ্চে দেশের জন্য সুনাম এনে দিতে চাই।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত