কারামুক্ত হয়েই ফ্রিডম সোহেলের শক্তির মহড়া

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:১০ এএম

উনিশ বছরেরও বেশি সময় কারাভোগ শেষে মুক্তি পেয়েছেন ঢাকার একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী সোহেল রানা চৌধুরী ওরফে ফ্রিডম সোহেল। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি। কাশিমপুর জেলগেট থেকেই অন্তত ২০ জনের একটি অনুসারী দল তাকে ফুলের মালা পরিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে বাড্ডা এলাকায় নিয়ে আসে। ওইদিন রাতেই বাড্ডায় ঢুকে তার অনুসারীরা চালিয়েছে সশস্ত্র মহড়া। এ সময় এলাকায় অন্য এক গ্রুপের সঙ্গে তার অনুসারীদের দ্বন্দ্বে ওই রাতেই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বাড্ডার আলাতুন্নেসা স্কুলের পাশে। এ সময় তাদের ছোড়া গুলি এসে লাগে স্থানীয় বাড্ডা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ফারহান ফয়সালের শরীরে।

সোহেলের মুক্তির বিষয়টি গত শনিবার দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি বলেন, ‘ফ্রিডম সোহেল গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে কারামুক্ত হন।’ অন্যদিকে গোলাগুলির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ওইদিন রাতে আলাতুন্নেসা স্কুলের গলিতে ফয়সালের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সত্য। তিনি এখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। সুস্থ হলে মামলা করবেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।’

বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও এলাকার ত্রাস ছিলেন ফ্রিডম সোহেল। নব্বই দশকের শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ ওরফে ফ্রিডম মানিক, ফ্রিডম রাশু, জিসানদের সঙ্গে এক গ্রুপে সন্ত্রাসী কর্মকা- করতেন। ওই সময় আন্ডার ওয়ার্ল্ডের ভেতরের তার আধিপত্য না থাকলেও মুক্ত জীবনে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও অস্ত্র আইনে একাধিক মামলার এ আসামি প্রায় দুই দশক কারাগারে কাটিয়েছেন। কারাগারে বসেই নিজের অনুসারীদের দিয়ে শাহজাহানপুর, মতিঝিল, পল্টন, কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবারসহ টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কারামুক্ত হন ফ্রিডম সোহেল। কারাগার থেকে বেরিয়েই মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় তার এক আত্মীয়ের বাসায়।

বাড্ডার স্থানীয় অন্তত পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তারা বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে ২০-২৫ জনের মতো অনুসারী নিয়ে বাড্ডার আলাতুন্নেসা স্কুল গলিতে যান সোহেল। তখন রাত আনুমানিক ৯টা। সোহেল এসে স্কুলের পাশের গলিতে একটি বাসায় ঢোকেন ১০-১২ অনুসারীসহ। বাকিরা পাহারায় থাকেন ওই বাড়ির আশপাশের এলাকায়। পাহারায় থাকা অনুসারীরা স্কুলটির পেছনে একটি দোকানের সামনে হট্টগোল করতে থাকে। এমন সময় আলাউদ্দীন নামে এলাকার স্থানীয় এক যুবদল নেতা জিজ্ঞেস করেন, কেন এখানে হট্টগোল করছে। তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়, যা একপর্যায়ে মারামারি এবং গোলাগুলি হয়। এ সময় সন্তানের জন্য খাবার কিনতে বাসা থেকে নিচে নামেন স্কুলশিক্ষক ফয়সাল। তখন দুটি গুলি এসে লাগে তার বুকে ও পেটে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে সেদিন রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন।

ফয়সালের বড় ভাই মো. শাহিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাই একজন স্কুলশিক্ষক। ওইদিন রাত ১০টার দিকে তার বাচ্চার জন্য খাবার কিনতে বাসার নিচের দোকানে যাচ্ছিল। তখন দোকানের পাশেই হট্টগোল শুনে সেদিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এ সময় গুলি এসে লাগে তার বুকে। পরে তাকে হাসপাতালে আনা হয়। বর্তমানে জরুরি বিভাগে তার চিকিৎসা চলছে। ডাক্তার বলেছেন তার লিভারে একটি গুলি গেঁথে আছে। দ্রুতই অপারেশন করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফয়সাল এখনো অসুস্থ। সে সুস্থ হলে মামলা করা হবে। তবে বাড্ডা-থানা পুলিশ মেডিকেলে এসেছিল। বিস্তারিত দেখে ও জেনে গেছে।’

সেদিন ফ্রিডম সোহেল ওই এলাকায় ছিলেন এবং তার অনুসারীরা গুলি ছুড়েছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের তদন্তে অনেক কিছুই উঠে আসছে। অনেক কিছুই আমরা জানতে পারছি। যেহেতু মামলা হয়নি এবং বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি, তাই আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না।’

মুক্তির পর বাড্ডার ওই বাসায় সোহেলের যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে দেশ রূপান্তর। আকিবুল ইসলাম অনিক নামে সোহেলের এক আত্মীয় বলেন, ‘উনি (ফ্রিডম সোহেল) আমার মামা হন। তার সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক। দীর্ঘদিন থেকে তার মা আমাদের বাসায় থাকেন। তাই জেল থেকে বেরিয়েই উনি আমাদের বাসায় এসেছিলেন তার মাকে দেখতে।’

ফ্রিডম সোহেল বাড্ডায় ঢুকলে তার অনুসারীরা এলাকায় অস্ত্রসহ মহড়া দিয়েছে এবং তাদের ছোড়া গুলিতে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এ বিষয় আপনি জানেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অনিক বলেন, ‘গোলাগুলি এবং একজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সত্য। তবে এটার সঙ্গে তার (ফ্রিডম) সম্পৃক্ততা একেবারেই নেই। দেখুন, উনি ১৯ বছর পর জেল থেকে বেরিয়ে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। নিজের বিবেক দিয়ে চিন্তা করুন, উনি কি এ অবস্থায় দলবল নিয়ে এখানে আসবেন? সেদিনের ওই ঘটনা অনেকেই নানা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ঝামেলা করতে চাইছে।’ তাহলে এ ঘটনা কারা ঘটিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরেই বাড্ডা এলাকায় ধারাবাহিকভাবে এমন গোলাগুলি হচ্ছে। এলাকা অস্থির করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। যারা এসব করছেন তাদের কাউকেই আমরা চিনি না।’ এদিকে গোলাগুলির ঘটনায় নাম আসা আলাউদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন কাজে ফ্রিডম সোহেলের নিয়ন্ত্রণে থাকা কর্মী বাহিনী অপরাধ জগতে সক্রিয় থাকে। মিরপুর এলাকায় আছে তার নিজস্ব রাজনৈতিক বাহিনীর কর্মী। যাদের দলীয় পদকে সামনে এনে প্রভাবের রাজত্ব কায়েম করতে মাঠে নামছেন সোহেল। সেখানে তার হয়ে অন্তত ছয়জন সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এরই মধ্যে তার কর্মী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোকে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে কারাগার সূত্রে জানা গেছে, ফ্রিডম সোহেল কারাগারের ভেতরে টাকার বিনিময়ে মোবাইল ব্যবহার করে তার অনুসারীদের দিকনির্দেশনা দিতেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কামাল নামের এক কারাবন্দি তার মোবাইল দেখভাল করত।

অভিযোগের বিষয়ে ফ্রিডম সোহেলের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে মায়ের সঙ্গে দেখা করেই এলাকা ছেড়েছেন তিনি। নিজেকে আড়ালে রাখছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত