মাদক-স্বর্ণ চোরাচালানের দ্বন্দ্ব আঁচ করছে পুলিশ

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:৩৩ এএম

ডাকাতির উদ্দেশ্যে নয়, বরং বড় ধরনের কোনো চোরাচালানের জন্য চাঁদপুরের মেঘনায় লাইটারেজ জাহাজে সাত খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা আগে থেকেই ওই জাহাজের লোকজনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হয়তো বড় ধরনের কোনো মাদকের চালান কিংবা স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা কেন্দ্র করে এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

এদিকে চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে লাইটারেজ জাহাজে খুন হওয়া সাতজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শহরের স্বর্ণখোলা এলাকায় অবস্থিত মর্গ থেকে জেলা প্রশাসক, নৌ-পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ সময় নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য তাদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকার চেক ও নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া আক্রান্ত জাহাজের মালিকপক্ষ মাহাবুব মোর্শেদ বাদী হয়ে হাইমচর থানায় একটি মামলা করেছেন।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, জাহাজের প্রতিটি মানুষ তাদের প্রত্যেকের কেবিনে বিছানায় শোয়া অবস্থায় ছিল এবং বাইরে থেকে তাদের প্রত্যেকের রুমের দরজা বন্ধ ছিল। প্রত্যেককেই মাথায় ও গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু জাহাজের কোনো মালামাল লুট হয়নি। চুরি কিংবা ডাকাতির উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হলে মালামাল তো লুটপাট করা হতো। তবে তদন্ত শেষে এ হত্যাকা-ের আসল উদ্দেশ্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

জাহাজের মাস্টার নিহত কিবরিয়ার ছোট ভাই আউয়াল হোসেন বলেন, ‘গত ৩০ বছর ধরে আমার বড় ভাই এই পেশায় কাজ করে আসছেন। আমরা কখনো কারও সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব বা মনোমালিন্যের খবর পাইনি। তিনি সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। আমাদের জানামতে তার এত বড় শত্রু ছিল না যে তাকে হত্যা করতে পারে।’

জাহাজের আরেক সদস্য নিহত মাজেদুলের বাবা আনিছুর রহমান। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে স্বজনদের নিয়ে ছুটে আসেন চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে। ছেলের মৃত্যু শোকে পাথর আনিছুর কিছুক্ষণ পরপরই মূর্ছা যাচ্ছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিকশাচালক এই পিতা বলেন, ‘অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মাজেদুল জেএসসি পরীক্ষা শেষে মাত্র ১০ দিন আগে এই জাহাজে লস্করের চাকরিতে যোগদান করে। তার তো কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল না।’ দ্রুত ছেলের হত্যাকারীদের আটক করে সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানান তিনি।

এ হত্যাকা-ের ঘটনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চার ও জেলা পুলিশ বিভাগের উদ্যোগে তিন সদস্যবিশিষ্ট পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একরামুল সিদ্দিকিকে প্রধান করা হয়েছে। বাকি তিন সদস্য হলেন চাঁদপুর নৌ-পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লা আল মামুন, জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার রাশেদুজ্জামান, জেলা কোস্ট গার্ডের স্টেশন কমান্ডার ফজলু হক।

অন্যদিকে জেলা পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) রাশেদুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত সদর সার্কেল মুকুল চাকমা এবং হাইমচর থানার ওসি মো. ইয়াছিন। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে উভয় তদন্ত কমিটির তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এ ব্যাপারে চাঁদপুর নৌ অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিক অবস্থায় মনে হচ্ছে এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আগে থেকেই হত্যাকারী হয়তো জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে ছিলেন। ধরন দেখে মনে হচ্ছে রাতের খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক কিছু খাওয়ানো হয়েছে। অজ্ঞান করে এই নৃশংসতম ঘটনা ঘটানো হয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ রুমে ছিল। প্রত্যেককে মাথায় ও গলায় আঘাত করে সুনিপুণভাবে হত্যাকান্ড সম্পন্ন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ডাকাতির ঘটনায় যে ধরনের উপসর্গ থাকে, এই ঘটনায় তেমন কিছু দেখা যায়নি। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এটি কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়। জাহাজে মূল্যবান জিনিসপত্রসহ কয়েক কোটি টাকার সার ছিল। কিন্তু জাহাজ পরিদর্শন শেষে কোনো কিছু খোয়া যাওয়ার ঘটনা দেখতে পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন দিক মাথায় রেখে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটন করে দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারব।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মোহাসীন উদ্দিন বলেন, মামলাটি একটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে দেখছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন আসামিদের আটক করা যায় সেজন্য প্রাশাসন কাজ করে যাচ্ছে। এ ঘটনা কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাছাড়া মৃতদের পরিবারের সদস্যদের ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

এর আগে গত সোমবার হাইমচর উপজেলার মাঝিরচর এলাকায় মেঘনা নদীতে নোঙর করে রাখা এমভি আল বাখেরা নামের একটি লাইটারেজ জাহাজ থেকে পাঁচজনের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশ। এ সময় মুমূর্ষু অবস্থায় আরও তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে পথিমধ্যে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে একজন মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মেসার্স বৃষ্টি এন্টারপ্রাইজের মালিকানাধীন জাহাজটি মূলত চট্টগ্রামের কাপ্পো থেকে সারবোঝাই করে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীর দিকে যাচ্ছিল।

হামলার ঘটনায় নিহতরা হলেন জাহাজের মাস্টার ফরিদপুর সদর উপজেলার জোয়াইর গ্রামের মো. কিবরিয়া, তার আপন ভাগ্নে এই গ্রামের জাহাজের লস্কর শেখ সবুজ, জাহাজের সুকানি নড়াইল লোহাগড়া উপজেলার পাঙ্গাচর গ্রামের আমিনুল মুন্সী, এই উপজেলার জাহাজের ইঞ্জিনচালক মো. সালাউদ্দিন, মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার চরযশোবন্তপুর গ্রামের জাহাজের লস্কর মো. মাজেদুল, একই উপজেলার পলাশবাড়িয়া গ্রামের জাহাজের লস্কর সজিবুল ইসলাম এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার মো. রানা। এই ঘটনায় মুমূর্ষু অবস্থায় বেঁচে থাকা একমাত্র ব্যক্তি হলেন জুয়েল। তিনি বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন।

মামা-ভাগ্নের জন্য আহাজারি : ফরিদপুর চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার ইশানবালা খালের মুখে নোঙর করা এমভি আল-বাখেরা নামের জাহাজে যারা হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন তাদের দুজনের বাড়ি ফরিদপুরে। নিহত এ দুজন সম্পর্কে মামা ও ভাগ্নে। নিহত ওই দুজনের বাড়ি ফরিদপুর সদরের গেরদা ইাউনিয়নের জোয়ারের মোড় এবং বাখু-ার চরজোয়াইর এলাকায়। নিহত গোলাম কিবরিয়া বিশ্বাস (৬৫) এবং ভাগ্নে সবুজ শেখ (২৬)। গোলাম কিবরিয়া ওই জাহাজের মাস্টার ছিলেন। নিহত অন্যজন গোলাম কিবরিয়ার ভাগ্নে সবুজ শেখ। তিনি ওই জাহাজের লস্কর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সোমবার বিকেলে এ খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর শোকের মাতম ওঠে উভয়ের পরিবারে। সবুজ মাত্র ২৫ দিন মামা কিবরিয়ার সঙ্গে জাহাজের কাজে যোগ দেন। সবুজের মা রাজিয়া বেগম ছেলের জন্য বিলাপ করছেন আর জ্ঞান হারাচ্ছেন। সবুজ শেখের মেজো ভাই মিজানুর রহমান বিপ্লব বলেন, ‘আমার ভাই মারা যাওয়ার সংবাদটি পাই মঙ্গলবার সকালে। আমরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না যে, সবুজ মারা গেছে। এভাবে আমার ভাইকে কেউ হত্যা করতে পারে না। কীভাবে একসঙ্গে এত মানুষকে হত্যা করা হলো।’

মাগুরার দুই যুবকের বাড়িতে শোকের মাতম : নিহত সাত শ্রমিকের মধ্যে দুজনের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পলাশবাড়িয়া গ্রামের মুন্সি সজিবুল ইসলাম (২৬)। অন্যজন একই ইউনিয়নের চরযশোবন্তপুর গ্রামের মাজেদুল ইসলাম (১৭)। নিহতদের মধ্যে সজিবুল পাঁচ মাস আগে বিয়ে করেন। নিহত সজিবুল ও মাজেদুলের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছলে দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা শোকে পাগলপ্রায়।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন ফরিদপুর ও মাগুরা প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত