স্বল্প আয়ের মানুষের আমানতেও টান

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৯ এএম

দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়েছে ব্যাংক খাতে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়মের তথ্য ও প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাওয়ার পর এ খাতে গ্রাহকদের আস্থা কমেছে। এক দিকে যেমন আস্থা সংকটে মানুষ আমানত তুলে নিচ্ছে, অন্যদিকে টানা মূল্যস্ফীতির কারণেও সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতের কমেছে আমানত কমেছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে স্বল্প আয়ের মানুষের হিসাবে আমানত কমেছে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা। তবে আমানত কমলেও বিপরীতে বেড়েছে ঋণ বিতরণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

২০১০ সালে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সুবিধা দিতে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছিল সরকার। এগুলোকে নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্টস (এনএফএ) বলা হয়। এসব অ্যাকাউন্টের ন্যূনতম সার্ভিস চার্জ বা ফি নেই। সমাজের সব স্তরের মানুষের আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের আওতায় এসব অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। কৃষকরা ছাড়াও এসব হিসাবের আওতায় থাকেন পোশাকশ্রমিক, অতিদরিদ্র মানুষ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীরাসহ অনেকে। এর মধ্যে কৃষকদের হিসাব ও আমানত সবচেয়ে বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকগুলোতে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭৭ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪৮টি। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে স্বল্প আয়ের মানুষের অ্যাকাউন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭৮ লাখ ৭১ হাজার ৮৭৮টি। সেই হিসাবে তিন মাসে অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বেড়েছে ৯৪ হাজার ৪৩০টি বা শূন্য দশমিক শূন্য ৩৪ শতাংশ। বিপরীতে গত জুন শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা হিসাবের আমানত কমেছে  ৪৩৮ কোটি বা ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

সাধারণত চলমান সঞ্চয় হারের তুলনায় ‘নো-ফ্রিলস’ হিসাবগুলোতে বেশি হারে সুদ দেওয়া হয়। তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নো-ফ্রিলস হিসাবের আওতায়  কৃষকদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪০ কোটি,  অতি দরিদ্রদের ২৪৩ কোটি, পোশাকশ্রমিক ৩৬০ কোটি, মুক্তিযোদ্ধাদের হিসাবে ৮৮৪ কোটি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের হিসাবে ১ হাজার ৫৫১ কোটি ও অন্যান্য খাতে ৫৯৯ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে।

আমানত কমলেও তিন মাসের ব্যবধানে এসব হিসাবধারীদের ২০০ কোটি ও ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।

২০২৪ সালের জুন শেষে এসব হিসাবধারীদেরে এই স্কিম থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ছিল ৭৭৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার হিসাবধারীদের দুটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। তিন মাসে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৩৬ কোটি টাকা।

এ ছাড়া, চলতি বছরের জুন শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে আসা মোট প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ৭৩২ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে পাওয়া প্রবাসী আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি টাকা।

এদিকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, এটি গত জুন মাস শেষে ছিল ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে আমানত কমেছে ১৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা, যা গত তিন মাস আগে অর্থাৎ জুন মাস পর্যন্ত ছিল ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ১০১ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২২ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানেও আমানতের চেয়ে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত