জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যারা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে বুকে গুলি আলিঙ্গন করে, তারা রাস্তায় নেমেছে। তারা রাস্তা ছেড়ে পালায় না। যারা জনগণকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, গায়ের জোরে, গুলির জোরে দমন করতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তারাই পালিয়ে গেছেন। অথচ তারা বড় গলায় বলেছিলেন, ওমুক (শেখ হাসিনা) পালায় না। আরেকজন (ওবায়দুল কাদের) বলেছিলেন, যাব কোথায়, তোমার বাড়ি গিয়ে উঠব, এখন কোথায় আপনি? নিজের পরিচয় দিতে পারেন না কেন? তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনার কয়রা উপজেলা সদরের কপোতাক্ষ কলেজ ময়দানে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘আবু সাঈদ রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র। সে তার দাবির সপক্ষে বুক পেতে দিয়েছিল। চিৎকার করে বলেছিল, “বুকের ভেতর তুমুল ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর”। গভীর আত্মবিশ্বাসে চিৎকার করে বলেছিল, আমার দেশের মানুষ অন্তত আমার বুকে গুলি করবে না। কিন্তু পরপর তিনটি গুলি করে তাকে নির্মমভাবে ফেলে দেওয়া হলো। হত্যা করার পর বলা হলো আবু সাঈদকে সরকারের নির্দেশে হত্যা করা হয়নি। আন্দোলনকরীরা হত্যা করেছে এবং তাকে গুলি করা হয়নি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু না, আল্লাহ দফায় দফায় জুলুম বরদাশত করলেন না। আবু সাঈদের এ অবস্থা দেখে সারা দুনিয়া কেঁপে উঠল, শুধুু বাংলাদেশ না। দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে তার জন্য প্রতিবাদ হলো। মানবাধিকার সংগঠনগুলা প্রতিবাদ করল, বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রতিবাদ করল। সে জনগণের মুক্তির আন্দোলনের দৃশ্যময় প্রতীক হয়ে বীর হয়ে উঠল। আর বাংলাদেশের যুবক-যুবতীরা বলল, আমাদের এক ভাই দেশ এবং জনগণের দাবি আদায়ের জন্য যেভাবে জীবন দিয়েছে আমরা লাখো যুবক-যুবতী সেই দাবি আদায়ে রাস্তায় নেমে পড়লাম।’
শেখ হাসিনার সরকারের তীব্র সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘তারা বলল, তারা বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে এনে হাজির করেছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। মহাসড়ক খুঁজে পাওয়া না গেলেও রোল মডেল খুঁজে পাওয়া গেছে। শেখ হাসিনার বোনের মেয়ে টিউলিপ, ইংল্যান্ডে সৌভাগ্যক্রমে একজন মন্ত্রী হয়েছিল। এখন রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের সে এবং তার পরিবার তার খালা, তার মা এবং সে তিনজনে মিলে ৫৭ হাজার কোটি টাকা চুরি করেছে। এখন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। এই লজ্জা শুধু তাদের নয়, এ লজ্জা দেশবাসীর। তাদের পরিবার ২৬ লাখ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে চুরি করে বিদেশে নিয়ে গেছে। আর দেশে বস্তায় ভরে মাটির নিচে কত টাকা যে লুকিয়ে রেখেছে, তা আল্লাই জানেন।’
আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘১৪ সালের নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন, ১৮ সালে হয় নিশিরাতের নির্বাচন আর ২৪ সালে হয় ডামি নির্বাচন। সুতরাং এমন নির্বাচন আর দেশবাসী দেখতে চায় না। ডামি নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু এ দেশের ছাত্র-জনতার মাধ্যমে আল্লাহ তাদের সে অপশাসন থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আগামীতে আমরা এমন নির্বাচন চাই, যেখানে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে দলগুলো সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে। কারণ এ দেশকে কারও হাতে আর আমরা জিম্মি হতে দেব না।’
কয়রা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে ও খুলনা জেলা সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমানের পরিচালনায় কর্মী সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা এমরান হুসাইন, সাতক্ষীরা জেলা আমির মাওলানা শহিদুল ইসলাম মুকুল প্রমুখ।
এর আগে ডুমুরিয়া উপজেলার আঠারো মাইল বাজারে এবং পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ফুটবল ময়দানে পথ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ভারতের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের প্রতিবেশী হিসেবে সম্মান করি, আপনারাও আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে সম্মান করতে শিখুন। ভারত থেকে চোখ রাঙিয়ে আর বাংলাদেশকে শাসনের চিন্তা করবেন না। বাংলাদেশের মানুষ এখন চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস সঞ্চয় করেছে। বুক খুলে দিয়ে ডানা মেলে বলতে পারে গুলি কর, সেই দেশের মানুষকে আর ভয় দেখাবেন না। অনুরোধ করব, আমরা শান্তিতে থাকি, সবাই শান্তিতে থাকুক। আমরা কারও অভ্যন্তরীণ বেশি হস্তক্ষেপ করি না। আমাদের ব্যাপারে কেউ হস্তক্ষেপ করুক, সেটাও আমরা চাই না। সেখান (ভারত) থেকে আমাদের জন্য অশান্তি সৃষ্টি করবেন না।’
