কালকিনিতে তিন হত্যা : এলাকা পুরুষশূন্য

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ১০:০৬ পিএম

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের ভাদুরী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুইপক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ইউপি মেম্বর আতাউর রহমান আক্তার শিকদার ও তার ছেলে মারুফ শিকদারসহ তিনজন। এই ঘটনায় নিহতের পরিবার কালকিনির বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ও তার ভাই মশিউর রহমান রাজন বেপারীকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ এই হত্যাকাণ্ড চেয়ারম্যানের লোকজনই করেছে। 

এ দিকে এই ঘটনার পর থেকে এই এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও এলাকার মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে নিহতের স্বজনসহ এলাকাবাসীর কেউ ভয়ে কথা বলতে রাজি নন। তবে তারা জানান বিগত সরকারের সময়ে এই বাশগাড়ি ইউনিয়নে ১৫ টির বেশি হত্যাকাণ্ড, চোখ তুলে ফেলা, পঙ্গুসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। মামলা হামলা, জেলও খেটেছে অনেকেই। এখনো বেশীর ভাগ মানুষের নামে মামলা রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে নিহতের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাশগাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। তিনি একই ইউনিয়নের দক্ষিণ বাশগাড়ি এলাকার মৃত হাকিম বেপারীর ছেলে এবং কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মাদারীপুর-৩ আসনের সাবেক এমপি আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের সমর্থক ছিলেন চেয়ারম্যান সুমন। 

অপরদিকে মাদারীপুর-৩ আসনের আরেক এমপি আব্দুস সোবহান মিয়া গোলাপের সমর্থক ছিলেন একই ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বর আতাউর রহমান আক্তার শিকদার। তিনি একই ইউনিয়নের ভাদুরী এলাকার মতিন শিকদারের ছেলে এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন।

প্রথম দিকে চেয়ারম্যান সুমন ও মেম্বার আক্তার শিকদারের সম্পর্ক ভালো থাকলেও আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের রাজনীতির কারণে সর্ম্পক খারাপ হয়ে যায়। এরপরই চেয়ারম্যান ও মেম্বর এই দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। বিগত আওয়ামী লীগের সময় বাশগাড়ি ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারি ও হত্যার ঘটনা লেগেই থাকতো। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এলাকা থেকে পালিয়ে থাকেন চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ও মেম্বর আক্তার শিকদার।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমনের ভয়ে মেম্বর আক্তার শিকদার ও তার পরিবারসহ শিকদার বংশের অনেক পরিবার বাসা ভাড়া করে অন্যত্র থাকেন। কেউ বাড়িতে আসলে চেয়ারম্যানের লোকজনের ভয়ে আবার পালিয়ে যেতে হতো। গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত আক্তার শিকদার, তার চাচা আলা বক্স শিকদার, মোশারফ শিকদার, হেলাল শিকদার, আবুল কালাম শিকদার, দুলাল শিকদার, মামুন শিকদার, আকবর শিকদার, আজাহার ঘরামী, ইসমাইল শিকদার, আজহার হাওলাদারসহ প্রায় ১৫টির মতো ঘরে আগুন, ভাঙচুরসহ ঘরের সকল মালামাল লুট করে নিয়ে যান চেয়ারম্যান সুমনের লোকজন। এই খবর পেয়ে শুক্রবার রাতে মেম্বর আক্তার শিকদার ও তার ছেলে মারুফ শিকদার বাড়িতে আসেন। সেই সংবাদ জানতে পেরে চেয়ারম্যান সুমনের লোকজন শিকদার বাড়িতে হামলা চালায়। পরে দুই গ্রুপের মধ্যে সংর্ঘষ বাধে। এ সময় বাড়ি থেকে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করেন মেম্বর আক্তার শিকদার ও তার ছেলে মারুফ শিকদার। পরে কুপিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। সকালে পুলিশ একই ইউনিয়নের খাশেরহাট ব্রিজের নিচ থেকে হাত পা কাটা ও মুখ থেতলানো মেম্বর আক্তার শিকদার ও তার ছেলে মারুফ শিকদারের লাশ উদ্ধার করে। অপর নিহত পাশের এলাকা খুনের চরের সিরাজুল ইসলাম চৌকিদারকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা নেয়ার পথে মারা যান। এ সময় আহত হন আরো ১০ জন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের পা কেটে বিচ্ছন্ন করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে তাদের নাম জানা যায়নি। তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

এ দিকে এই ঘটনার পর থেকে বাশগাড়ি ইউনিয়নের ভাদুরী ও মধ্যচর এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভয় ও আতঙ্কে এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে এলাকায় উত্তেজনা থাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, সেনাবাহিনী ও র‌্যাব মোতায়েন আছে। 

প্রতিবেশি মোশারফ শিকদারের বয়স ৬২ বছর। তিনি চেয়ারম্যান সুমনের ভয়ে নিজ বাড়িতে থাকেন না। কালকিনিতে বাসা ভাড়া করে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে থাকেন। তার বাড়িটিও ভাঙচুর করা হয়েছে। লুট করা হয়েছে ঘরের সব মালামাল। তিনি জানান, কোনো কথা বললে চেয়ারম্যানের লোকজনও আমাকে মেরে ফেলবে। আমি তো কোনো কিছুর সাথে জড়িত না। আমার এক ছেলে বিদেশ থাকে অন্য ছেলে সিলেটে চাকরি করে। তবুও আমি ভয়ে নিজ বাড়িতে থাকতে পারি না। বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। এই অত্যাচার কবে শেষ হবে, আমি জানি না। এই বয়সেও নিজ বাড়িতে থাকতে পারছি না। 

নিহত আক্তারের চাচা আলা বক্স শিকদার বলেন, আমাদের তো সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ভাইয়ের ছেলে ও নাতিকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। আমাদের ঘরের সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। এখন আর ভয় পাই না। এই চেয়ারম্যান সুমন আমাদের মেরে ফেলবে, ফেলুক। তবুও এর বিচার চাই। এই অত্যাচার বন্ধ হোক। এইখানকার মানুষ একটু শান্তিতে থাকুক। প্রায় ১০ বছর আগে আমার ভাই আবুল বাশারকে ঐ চেয়ারম্যান সুমনের লোকজন হত্যা করে লাশ গুম করেছে। ভয়ে কিছু বলতে পারিনি। ঐ সময় থানাতেও অভিযোগ দেওয়ার সাহস হয়নি। এখন আবার আমার ভাইয়ের ছেলে ও নাতিকে হত্যা করলো। এইসব ঘটনায় চেয়াম্যানের বিচার চাই।

তিনি আরও বলেন, চেয়ারম্যানের লোকজনের ভয়ে এখানে আসতে পারিনি। যখন শুনলাম পুলিশ, সেনাবাহিনী ও মিডিয়ার লোকজন এসেছে, তখন সাহস করে আসলাম। এই অত্যাচার কবে বন্ধ হবে তা একমাত্র আল্লাহ জানে।

নিহত আক্তারের বড় চাচি সালমা বেগম বলেন, আপনারা ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন, সেগুলো চেয়ারম্যান সুমন ও তার ভাই রাজন দেখলে আমাদের খুন করে ফেলবে। ওরা আমাদের বাঁচতে দিবে না।  

ওই এলাকার চায়ের দোকানদার আবুল বাশার বলেন, এখানে মারামারি হত্যা প্রায় ঘটে থাকে। বর্তমানে তিনজন হত্যার ঘটনার পর পুরো এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। দোকানে কোনো ক্রেতা নেই। এই হত্যা ও মারামারি বন্ধ হোক, আমরা সবাই যেন শান্তিতে থাকতে পারি প্রশাসন যেন সেই ব্যবস্থা করে দেন।

নাম না প্রকাশে স্থানীয় কয়েকজন জানান, বিগত সরকারের সময়ে এই বাশগাড়ি ইউনিয়নে ১৫ টির বেশি হত্যাকাণ্ড, চোখ তুলে ফেলা, পঙ্গুসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। ফলে এখন এখানকার মানুষ একটু শান্তি চায়। এই মারামারি আর হত্যার ঘটনা দেখতে চান না। এত ঘটনার পরও চেয়ারম্যান সুমন অদৃশ্য কারণে ধরা ছোয়ার বাহিরেই আছে।  

নিহত আক্তার শিকদারের বাবা মতিন শিকদার বলেন, আমাদের বাড়ি-ঘর কয়েকদিন আগে সুমন চেয়ারম্যানের লোকজন পুড়ে দেয়, আর সেই পোড়া বাড়ি ঢাকা থেকে দেখতে আসছিল আক্তার আর আমার নাতি মারুফ। তাদের ওপর হামলা করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে সুমন ও তার লোকজন। আমার আর কোনো ছেলেও নাই, নাতিও নাই। আমার পুরো বংশ শেষ করে দিলো। আমি এদের বিচার চাই।

এ দিকে অভিযুক্ত বাশগাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমনের বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার ভাই রাজন বেপারীকেও পাওয়া যায়নি। তাদের ঘর তালাবন্ধ ছিল। 

এ সময় তাদের দুই চাচী সেফালী বেগম ও আফরোজা বেগম জানান, চেয়ারম্যান সুমন ও তার ভাই রাজন ঢাকাতেই থাকেন। তার মা অসুস্থ হওয়ায় অনেকদিন ধরে ঢাকাতে আছেন। তাহলে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে তারা কীভাবে জড়িত থাকেন। এগুলো মিথ্যা কথা। তারা কেউ জড়িত না। তাদের তো কোনদিন মারামারি করতেই দেখিনি। তারা অনেক ভালো মানুষ। এলাকার জনগণ তাদের অনেক ভালোবাসেন।

বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার দিন ফোনে জানান, সরকার পতনের পর এলাকা থেকে চলে যান মেম্বর এবং আবার নতুন করে দলবল নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। মধ্যেরচর এলাকার লোকজন তাদের প্রতিরোধ করতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে। বোমা বিস্ফোরণে মেম্বরসহ মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা হোক।

এদিকে মাদারীপুরে তিন হত্যার ঘটনার মাঠ পর্যায়ের তদন্তে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।  শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) দুপুরে নিহত তিন জনের বাড়িতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলেন। 

এসময় ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘ঘটনাটিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এভাবে তিন জন মানুষকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফলে হেড কোয়ার্টাস থেকে বিষয়টি মনিটারিং করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে বিষয়টি অনুধাবনের জন্যে আসা হয়েছে। এ ঘটনার সাথে সম্ভব্য খুঁটিনাটি দেখা হচ্ছে। তবে এখানে চেয়ারম্যান সুমন আর মেম্বার আক্তারের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে ঝামেলা ছিল, বিষয়টি এমনই বোঝা যাচ্ছে। তারপরেও তদন্ত করে স্পষ্ট হওয়া যাবে।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. সাইফুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলমসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত