নিরাপত্তার চাদরে সচিবালয়

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:১১ এএম

বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুনের ঘটনার পর সচিবালয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে আগুন লাগার পর গতকাল রবিবার ছিল প্রথম কর্মদিবস। এদিন উপদেষ্টা, সচিব ও সংস্থা প্রধান ছাড়া অন্য কারও গাড়ি সচিবালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অতিরিক্ত সচিব থেকে নিচের দিকের কর্মকর্তারা প্রবেশ পথে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন।

এদিকে সাংবাদিকদের সচিবালয়ে প্রবেশে আজ সোমবার থেকে অস্থায়ী পাস দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি)। গতকাল পিআইডির এক তথ্যবিবরণীতে এ কথা জানানো হয়। এ ছাড়া আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মন্ত্রণালয়গুলো বিভিন্ন স্থানে অফিস করেছে।

গতকাল সকালে ১ নম্বর গেটে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা হাসান তারেক সাংবাদিকদের বলেন, ‘উপদেষ্টা, সচিব, সংস্থা প্রধান ও আগুনের তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তাকে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।’ জরুরি দর্শনার্থীদের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আবদুল গণি রোডে পৃথক বুথ চালু হয়েছে। ১ নম্বর গেট দিয়ে ঊর্ধ্বতনরা গাড়ি নিয়ে ঢুকছেন। ২ ও ৫ নম্বর গেট দিয়ে বাকিরা হেঁটে প্রবেশ করছেন।

এদিকে তথ্যবিবরণীতে বলা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের স্বার্থে দর্শনার্থী, সাক্ষাৎপ্রার্থী ও সাংবাদিকদের সচিবালয়ে প্রবেশে নিষেধ করা হয়েছিল। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আগের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পুনর্মূল্যায়ন করছে, শিগগির নতুন করে স্থায়ী বা অস্থায়ী কার্ড আর পাস দেওয়া হবে। সোমবার থেকে সাংবাদিকদের অস্থায়ী পাস দেওয়া হবে।

সচিবালয়ে সীমিত আকারে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।

সাংবাদিকদের সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য তিন হাজারের বেশি কার্ড দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তবে সাংবাদিকতার আড়ালে অনেক অসাংবাদিক এসব কার্ড ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা এই কার্ডগুলো পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পেশাদার সাংবাদিকদের অবশ্য এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই’ যোগ করেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা।

গতকাল থেকেই সচিবালয়ে প্রবেশ পাসের বিশেষ সেলের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। অস্থায়ী পাসের আবেদন নেওয়া শুরু হয়েছে। সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় সব বেসরকারি প্রবেশ পাসধারীদের সচিবালয়ের প্রবেশ পাস বাতিল করা হয়। একই বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে সাংবাদিকদের প্রবেশে। ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, ডিএমপি, ১৫ আবদুল গণি রোডে অবস্থিত সচিবালয়ে প্রবেশ পাসের বিশেষ সেল থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এখানে সাংবাদিকসহ অন্যান্য অস্থায়ী বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে অস্থায়ী পাস নিচ্ছেন। ফরম পূরণের সময় আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের ফটোকপি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগের যে কার্ড রয়েছে সেটা ফটোকপি দিয়ে নির্ধারিত আবেদন ফরমসহ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাগজপত্রসহ জমা দিতে হবে। তারপর সেল থেকে তিন দিনের মধ্যে আবেদনকারীকে জানানো হবে।

মন্ত্রণালয়ের কাজ চলছে রেল ও নগর ভবনে : আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বিকল্প অফিস প্রস্তুত করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের ১৩, ১৪ ও ১৫ তলায় স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন বিভাগ এবং রেল ভবনের ১০ তলা সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের কার্যক্রম চলছে। গতকাল থেকে কাজ শুরু হলেও কিছু সংস্কারকাজ শেষে আজ সোমবার থেকে মন্ত্রণালয় দুটির কাজ পুরোদমে শুরু করার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

গতকাল সকাল থেকে নগর ভবনের তিনটি ফ্লোর ধোয়ামোছা, রঙ করা, ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। চেয়ার-টেবিল বসানোর কাজও শেষ। ডেকোরেশনের সব কাজ সম্পন্ন করে মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রতিটি কক্ষকে সাজানো হয়েছে। এর আগেই ১৩ তলা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন বিভাগের অফিস। ১৪ ও ১৫ তলা প্রায় দেড় বছর ধরে ফাঁকা ছিল।

১৪ তলায় গিয়ে দেখা গেছে, এরই মধ্যে উপদেষ্টা ও সচিবের কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তলার ১৩২৪ নম্বর কক্ষে উপদেষ্টার কক্ষে নতুন আসবাবপত্র বসানো হচ্ছে। অন্য কর্মকর্তারা কোন কক্ষে বসবেন, তা নির্ধারণ করে কাগজ সাঁটানো হয়েছে। ১৩ ও ১৫ তলার কক্ষগুলো একইভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই আমরা কাজ শুরু করে দিই। আমরা চারটা মিটিং করেছি। যেখানে সচিব সরাসরি এবং উপদেষ্টা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘আপদকালীন নগর ভবনে অফিস প্রস্তুত করা হয়েছে। টুকটাক যেসব কাজ বাকি ছিল সেগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে।’

রেল ভবনে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় : সচিবালয় আগুনের ঘটনায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অফিস রেল ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখন থেকে রেল ভবনে অফিস করবেন এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। গতকাল সকালে রেল ভবনের দশমতলায় গিয়ে কর্মকর্তাদের অফিস করতে দেখা যায়। তবে দশমতলায় রুমগুলো পুরোপুরি ঠিক না থাকায় এখনো অর্ধেকের বেশি কর্মকর্তা কক্ষ পাননি। দশমতলায় ফ্লোরগুলোর টাইলস লাগানোর কাজ চলছে। কিছু জায়গার রুমগুলোতে এখনো দরজা লাগানো হয়নি। মূলত এই ভবন এতদিন খালি পড়েছিল। যার জন্য নতুন করে অনেক কিছু করতে হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলেছেন, গতকাল সকাল থেকেই অফিস করছি কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ রুম এখনো ঠিক নেই। তাই বলে কাজ তো আর থেমে থাকবে না। এ জায়গায় আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এখন রুমগুলোর সব কাজ দ্রুত শেষ হলে আমাদের অফিস করতে সুবিধা হবে। তাছাড়া রুম ঠিক না থাকায় অনেক সিনিয়র কর্মকর্তাও বসতে পারেননি। আশা করছি দ্রুতই সব ঠিক হয়ে যাবে।

গত বুধবার রাত ২টার দিকে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। প্রায় দশ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভায় ফায়ার সার্ভিস। আগুনে ৭ নম্বর ভবনের ৬, ৭, ৮, ৯ এ চারটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে অষ্টম ও নবমতলায় ক্ষতি হয়েছে বেশি, সেখানকার অধিকাংশ নথি পুড়ে গেছে। এসব তলায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়; অর্থ মন্ত্রণালয়; ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি বিভাগের অফিস ছিল।

সচিবালয়ে আগুন প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা আজ : সচিবালয়ে আগুনের ঘটনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন আজ সোমবার অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তদন্তের স্বার্থে কিছু আলামত ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনে এসব আলামত পরীক্ষার জন্য বিদেশেও পাঠানো হবে।

গতকাল রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার বাইরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান।

প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সাংবাদিকদের অবহিত করা হবে কি না জানতে চাইলে আজাদ মজুমদার বলেন, এটা প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়ার পর তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন। তদন্তকাজ শেষ করতে কত সময় লাগবে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে, তাদের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টা, কমিটি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষ মিলে ঠিক করবেন তদন্তটি সম্পন্ন করতে আসলে কত দিন লাগবে। এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।

অগ্নিকাণ্ড ইস্যুতে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়নি জানিয়ে উপপ্রেস সচিব বলেন, সচিবালয় এখন ক্রাইম সিন এরিয়া। আগুনের তদন্ত চলমান থাকায় মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আলামত যেন নষ্ট না হয়, ক্রাইম সিন রক্ষায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ সোমবার) থেকে সাংবাদিকরা অস্থায়ী পাসের ভিত্তিতে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে ১৬০ জন সাংবাদিক ও টেলিভিশনের ৪০ জন ক্যামেরাপারসনকে অস্থায়ী পাস দেওয়া হবে। এ ছাড়া পুলিশের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সাংবাদিকরাও পাস নিতে পারবেন।

গত বুধবার ছিল বড়দিনের ছুটি। এদিন গভীর রাতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে আগুনে ৭ নম্বর ভবনে। আগুনে এই ভবনে থাকা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক এবং টেলিযোগাযোগ বিভাগ; যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র পুড়ে গেছে। পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে কম্পিউটার ও আসবাব। দেয়াল ও মেঝেতেও বড় ক্ষতি হয়েছে। ভবনটির ক্ষতিগ্রস্ত তলাগুলো আপাতত ব্যবহার করার সুযোগ নেই। এজন্য অস্থায়ীভাবে বিকল্প অফিস করছে মন্ত্রণালয়গুলো।

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে গত বৃহস্পতিবার একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ঘটনার তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।

শেখ হাসিনার গ্রাফিতি ‘ঘৃণাস্তম্ভ’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনার গ্রাফিতিটি মুছে ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, ভুল বোঝাবুঝি থেকে গ্রাফিতিটি মুছে ফেলা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওনারা ওই গ্রাফিতিটি আবার নতুন করে করবেন। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় আইনের বলে জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার গ্রাফিতিসহ ক্যাম্পাসে যতগুলো স্মৃতি স্মারক রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণ করা হবে।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার গ্রাফিতিকে ‘ঘৃণাস্তম্ভ’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত