থার্ড টার্মিনালে আত্মসাৎ ৪ হাজার কোটি

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:৩৬ পিএম

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই প্রকল্প থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী ও বেবিচক সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও প্রকল্প পরিচালক এ কে এম মাকসুদুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এসব অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কমিশন গতকাল রবিবার এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে ৭ হাজার কোটি টাকার তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ২২ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামাদি স্থানীয়ভাবে ক্রয় করে বিদেশ থেকে আমদানি দেখানো, সয়েল টেস্টে অনিয়ম, নকশায় পরিবর্তন, কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। টার্মিনালটি বাইরে থেকে সুন্দর মনে হলেও সর্বস্তরে নিম্নমানের সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। প্রকল্পে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হয়েছে নকশা পরিবর্তনে। সাড়ে ৬ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। এতে পুরো প্রকল্পটি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের জন্য সিলেট থেকে পাথর কেনা হয়েছে। অথচ ইতালি থেকে পাথর ক্রয়ের কথা বলে প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা ইতালি ভ্রমণ করেন। এছাড়া ১৮শ স্কয়ার ফুট টাইলসের মান দেখতেও বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ রয়েছে প্রকল্প পরিচালকসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের শুরুর দিকে দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য নিম্নমানের ইকুইপমেন্ট ও পণ্য কেনা হয়েছিল। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের নজরে আসার পর এসব পণ্যের মান যাচাই করা হয়। এতে বেশিরভাগ পণ্য ও ইকুইপমেন্ট নিম্নমানের প্রমাণ হওয়ায় সেগুলো সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০-২৫টি পণ্য ফেরত পাঠিয়ে ওই পণ্যগুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়। এতে প্রকল্প পরিচালকসহ সিন্ডিকেটের কমিশন বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ হয়ে প্রকল্প পরিচালক দীর্ঘদিন এসব পণ্য বন্দর থেকে ছাড় করেননি। এমনকি ইউরোপীয় মানের হওয়ায় পণ্যগুলোর দামে যে ভেরিয়েশন হয়েছিল সেটির অনুমোদনও আটকে রাখেন।

অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পে বড় দুর্নীতি ঘটেছে নকশা পরিবর্তনে। এতে প্রায় ৭১১ কোটি থেকে ৯০০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, প্রকল্পের মূল নকশায় টার্মিনাল ভবনের পাইলিং করার কথা ছিল বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির স্টিল স্ক্রুয়েড পাইল (এসএসপি)। কিন্তু নকশা পরিবর্তন করে মান্ধাতা আমলের বোরড পাইলিং করা হয়। শুধু অর্থ লোপাটই নয়, এই নকশা পরিবর্তনের মাধ্যমে পুরো প্রকল্পটি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়, নকশায় পরিবর্তন আনায় প্রকল্প ব্যয় সাশ্রয় হয় ৯০০ কোটি টাকার বেশি। এই টাকা দিয়ে একটি অত্যাধুনিক ভিভিআইপি টার্মিনাল ও প্রকল্পকে ইউ আকৃতির রূপ দেওয়ার জন্য দুটি পিয়ার যুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে ফান্ডে কোনো টাকা নেই। প্রকল্পকে ইউ আকৃতির করার জন্য অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকা লাগবে। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে ৯০০ কোটি টাকা কোথায় গেল।

অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের সয়েল টেস্ট নিয়েও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের মূল কাজ শুরুর আগে সয়েল টেস্টের রিপোর্টে স্টিল স্ক্রুয়েড পাইল করা যাবে বলে জানানো হয়। কিন্তু ৬ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর সয়েল টেস্টের রিপোর্টে বলা হয়, টার্মিনাল ভবনের পাইলিংয়ে স্টিল স্ক্রুয়েড (এসএসপি) অনুপযুক্ত। তাই পাইলিং পরিবর্তন করতে হবে। একপর্যায়ে পরিবর্তন করা হয় পাইলিংয়ের নকশা।

এছাড়া প্রকল্পটি জাপানি কোম্পানির তত্ত্বাবধানে হলেও পুরো প্রকল্পের কেনাকাটা ও ইকুইপমেন্ট সংযোজনের অলিখিত নেতৃত্বে ছিলেন মন্ত্রী ও বেবিচক-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। তার ডান হাত হিসেবে সবকিছু সামলাতেন প্রকল্প পরিচালক মাকসুদুল ইসলাম। পুরস্কার হিসেবে পরপর তিন দফা চুক্তি নবায়ন করেন এই কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এত বড় একটি কাজে এমন অদক্ষ ও অযোগ্য প্রকল্প পরিচালক বাংলাদেশের আর কোনো প্রকল্পে দেখা যায়নি। তারপরও তিন দফা চুক্তি নবায়ন করেছেন শুধু সিন্ডিকেটের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে। মূলত অদক্ষ প্রকল্প পরিচালকের কারণে গত দুই বছরেও থার্ড টার্মিনালের অপারেশন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রকল্পের ঠিকাদার জানিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তির স্টিল স্ক্রুয়েড পাইল (এসএসপি) পরিবর্তন করে সাধারণ বোরড পাইলিং করায় ৭১১ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। পাইলিং পরিবর্তন করায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ১২শ থেকে ১৫শ কোটি টাকার বেশি অর্থ সাশ্রয় হয়েছিল। তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের ফাউন্ডেশনের কাজে প্রায় তিন হাজার পাইলিং লেগেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৪৯টি পাইল স্টিল স্ক্রুয়েড পাইল দিয়ে সম্পাদনের বিষয়টি চুক্তিতে উল্লেখ ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় কাজটিই ছিল এই স্টিল স্ক্রুয়েড পাইল। কিন্তু প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট যাচাই-বাছাই ছাড়াও ৭১১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের বিষয়টি মেনে নেয়। এতে কমপক্ষে সরকারের ১ হাজার কোটি টাকা বেশি অর্থ গচ্চা গেছে।

থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের তিনটি বড় কাজ নির্ধারিত ঠিকাদারের পরিবর্তে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ আছে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। কাজগুলো থার্ড টার্মিনালের অংশ হলেও মাকসুদুর রহমান সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য গোপনে চুক্তি বহির্ভূত অন্য ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়। এতে মোটা অঙ্কের টাকা ‘কমিশন বাণিজ্য’ হয়। পাশাপাশি সরকারকে গচ্চা দিতে হয় কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা। কারণ যেহেতু কাজটি থার্ড টার্মিনালের অংশ সেহেতু সংশ্লিষ্ট বিদেশি ঠিকাদার কাজ না করলেও তাদের এ জন্য মোটা অঙ্কের টাকার লাভ (ইনডাইরেক্ট কস্ট) দিতে হবে।

প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা, দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে থার্ড টার্মিনালে স্থাপিত অনেক যন্ত্রপাতির ওয়ারেন্টি শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে রয়েছে আরও অনেক যন্ত্রপাতি। ফলে এসব যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন করে ওয়ারেন্টি (রক্ষণাবেক্ষণ) মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চুক্তি করতে হবে বেবিচককে। এতে গচ্চা যাবে বাড়তি অর্থ।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল মুকতাদির চৌধুরী এবং সংরক্ষিত আসনের সাবেক মহিলা একজন এমপির নেতৃত্বে পুরো থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপিকে থার্ড টার্মিনাল ভবনের সিলিংয়ের কাজ দেওয়া হয়েছে। মূল প্রকল্পে এ ধরনের সিলিং ছিল না। বিদেশ থেকে আমদানি করা কারুকাজখচিত সিলিং লাগানোর এই কাজটি দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকায়। কারুকাজখচিত এই সিলিংটি দেখতে প্রথম প্রথম দৃষ্টিনন্দন মনে হলেও আস্তে আস্তে এটি প্রকল্পের বোঝা হয়ে দেখা দেবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার জন্য প্রকল্প পরিচালক মাকসুদুল ইসলাম জাপানি ঠিকাদার এডিসিকে পাশ কাটিয়ে তার পছন্দের কয়েকজন ঠিকাদার দিয়ে বেশ কিছু অতিরিক্ত কাজ করান টার্মিনালে। এর মধ্যে ভিভিআইপি সড়ক থেকে থার্ড টার্মিনালে প্রবেশের জন্য একটি সাধারণ ব্রিজ ছিল নকশায়। এই ব্রিজ তৈরির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক তার পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে ওই ব্রিজটির কাজ করান। তাতে খরচ হয় ১২ কোটি টাকার বেশি অর্থ।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মেগা প্রকল্প থার্ড টার্মিনালের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তড়িঘড়ি করে উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল থার্ড টার্মিনালের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তৃতীয় টার্মিনাল থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। এখন বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আগে টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব নয়। এখনো টার্মিনাল পরিচালনার মাস্টারপ্ল্যান (রূপরেখা) তৈরি হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত