২৩৪ বলের ম্যাচে ছক্কার সংখ্যা ৩১, চারের সংখ্যা ২২। অর্থাৎ ৫৩ বার বল গেছে সীমানার ওপারে। দুই ইনিংস মিলিয়ে রান হয়েছে ৪১৫। রান উৎসব দিয়ে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সিলেট পর্ব। চলতি মৌসুমের তৃতীয় আর বিপিএলে নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা অ্যালেক্স হেলস। তার ৭ ছক্কা আর ১০ চারে সাজানো ৫৬ বলে ১১৩ রানের অপরাজিত ইনিংসটিই ২০৫ রান করার পরেও জিততে দেয়নি সিলেটকে।
আগের দিন বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ নিজে রীতিমতো ঠুকে ঠুকে দেখে গেছেন সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের উইকেট। ছোট বাউন্ডারি আর ভালো উইকেট মানেই বড় রানের খেলা। যে কারণে টস জিতে ফিল্ডিং নেন রংপুর রাইডার্সের অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান। আগে ব্যাট করা সিলেটের রনি তালুকদার আর জর্জ মানসির কল্যাণে ভালো একটা শুরু পায়। পাওয়ার প্লেতে সিলেটের রান ১ উইকেটে ৫৫। রনি তালুকদারের ৩২ বলে ৫৪, জাকির হাসানের ৩৮ বলে ৫০ রানের ইনিংসের সঙ্গে শেষদিকে ৩ ছক্কায় জাকের আলী অনিকের ৫ বলে ২০ রান সিলেট স্ট্রাইকার্সের সংগ্রহটাকে নিয়ে যায় ৪ উইকেটে ২০৫ রানে। সিলেটের ২ উইকেট যায় সাইফউদ্দিনের খাতায়।
রংপুর রাইডার্স এখন পর্যন্ত খেলেছে চারটি ম্যাচ। সবকটি ম্যাচেই রংপুর শুরুতে উইকেট হারায়। কিন্তু এরপর শুরু হয় আসল খেলা! ঢাকায় ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে আগের ম্যাচেই একদিকের ওপেনার আজিজুল হাকিম তামিম ও ওয়ানডাউন তৌফিক খান দুজনেই আউট হন শূন্য রানে। এরপর সাইফ আর হেলসের ১১৩ রানের জুটিতে পাত্তাই পায়নি বরিশাল। সিলেটেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। ২০৫ রান তাড়ায় নেমে প্রথম ওভারেই শূন্য রানে আউট আজিজুল হাকিম তামিম। এরপর সাইফ এলেন। দৃশ্যটা বদলে গেল। গ্লোবাল সুপার লিগ থেকেই ব্যাটিংয়ের ধরনটা বদলেছেন সাইফ, এবারের বিপিএলে সেটা আরও কার্যকর হয়ে জেতাচ্ছে রংপুরকে। টানা দ্বিতীয় হাফসেঞ্চুরি, চার ম্যাচে তিনটাই চল্লিশোর্ধ ইনিংস, সেটাও ১৩৮ স্ট্রাইকরেটে। আসরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রান সাইফেরই। কাল সিলেটে খেলেছেন ৪৯ বলে ৮০ রানের ইনিংস। চার মেরেছেন মাত্র ৩টি, ছক্কা ৭টি!
তবে তা-ব চালিয়েছেন হেলস। রংপুরের হয়ে আগেও খেলতে এসেছিলেন এই ইংরেজ ওপেনার। সেবারও বিপিএলের রেকর্ড বইতে বেশ কিছু ওলট-পালট করে রেখে গিয়েছিলেন। এবারও করলেন। দ্বিতীয় উইকেটে ১৬.৫ ওভারে ১৮৬ রান যোগ করেন দুজন। বিপিএল ইতিহাসে যা যেকোনো উইকেটে চতুর্থ সর্বোচ্চ জুটি। ৫৪ বলে সেঞ্চুরি ছোঁয়া হেলসও মেরেছেন ৭টি ছক্কা। ৫৬ বলের ইনিংসে ১০টি চারও মেরেছেন এই ইংলিশ ওপেনার। বিপিএলে নিজের দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে সপ্তম সেঞ্চুরি করে অপরাজিত ছিলেন ১১৩ রানে। তার শেষ দুই ছক্কাতেই ২৯ ছক্কার রেকর্ড ছাপিয়ে এক ম্যাচে ৩১ ছক্কা দেখল বিপিএল, যা কোনো ম্যাচে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড।
সিলেটের ৪ উইকেটে করা ২০৫ রান ৬ বল আর ৮ উইকেট হাতে রেখেই টপকে গেছে রংপুর। ভালো উইকেটে বোলাররা লাইন লেন্থের সামান্য ভুলেই শাস্তি পেয়েছেন ছয় বা চার হজম করে। সবচেয়ে বেশি ধোলাইয়ের শিকার সিলেটের অধিনায়ক আরিফুল হক। এমন ব্যাটিং স্বর্গে তার নির্বিষ মিডিয়াম পেসের বিপরীতে ব্যাটসম্যানরা খেলেছেন আনন্দ নিয়ে! তিন ওভারে আরিফুল দিয়েছেন ৫১ রান, গড়ে ওভারপ্রতি ১৭ রান। ১৭ নম্বর ওভার করতে এসে ৩ ছক্কা আর ১ চার হজম করে ২৩ রান দেওয়ার পর অধিনায়ক আর বোলিংয়েই আসেননি। এত রান উৎসবের মধ্যেও তানজিম হাসান সাকিব ৪ ওভারে মাত্র ২৩ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট।
হারের পর সিলেটের অধিনায়ক শুনিয়েছেন উইকেট বেশি ভালো হওয়ার অজুহাত, ‘উইকেট খুব সহজ হওয়াতে সেøায়ার অতটা ধরছিল না, আসলে ইয়র্কার ছাড়া আর কোনো অপশন ছিল না, আমরা চেষ্টা করেছি, হয়নি।’ অন্যদিকে ম্যাচসেরা অ্যালেক্স হেলস বলেছেন, মাঠের আকৃতি দেখেই বুঝেছিলেন যে এখানে ২০০ রানও নিরাপদ নয়, ‘এই মাঠটা বেশ ছোট। আমি নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম যে খুব ভালো সূচনার দরকার নেই, মাঝের ওভারগুলোতেই পুষিয়ে নেওয়া যাবে। সাইফ খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। ম্যাচের ৬ থেকে ১০ ওভার এই সময়টায় আমি একটু আস্তে খেলছিলাম বাঁহাতি স্পিনারের বিপক্ষে, তখন ও রানরেটটা ধরে রাখে। আগে দেখেছিলাম চট্টগ্রামে খুব ব্যাটিং সহায়ক উইকেট হয়, এবার এখানেও হলো। আমি বাংলাদেশে খেলতে আসতে সবসময়ই ভালবাসি। আশা করছি আগামীতে আরও ভালো রান করব।’
রংপুরের অধিনায়ক সোহানও বলেছেন ভালো উইকেটের কথা, সেইসঙ্গে জানালেন দুইশর বেশি রান তাড়া নিয়ে তাদের কোন চাপ ছিল না, ‘মিকি আর্থার ও আশরাফুল ভাই, সবাই বলছিলেন যে এই মাঠে ২০০ রান ব্যাপার না। আমরা আগেই বুঝেছিলাম এখানে ১৮০-২০০ রান হবেই। আমরা রান তাড়ায় কোনো চাপ নিইনি।’ চাপ না নিয়ে টানা চার ম্যাচ জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে রংপুর রাইডার্স। অন্যদিকে সিলেট স্ট্রাইকার্স দুই ম্যাচ খেলে এখনো জয়ের মুখ দেখার অপেক্ষায়।
