স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন একেকটা, একেক ধরনের নির্বাচনব্যবস্থা। আমরা এ ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে চাই। এজন্য আমরা সংসদীয় পদ্ধতিতে সব নির্বাচন করার প্রস্তাব দেব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা একটা একীভূত আইন করতে চাই। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় করতে হবে, আমরা এমন প্রস্তাব করব।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) সম্মেলন কক্ষে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, বর্তমান যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, পৌরসভাগুলোর আয় নেই, বেশিরভাগের বেতন বাকি আছে। তাই পৌরসভাগুলোকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হতে পারে। পাশাপাশি জেলা পরিষদগুলোর সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর বাজেট বা প্রজেক্টগুলোর কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। তাই একে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে জেলা পরিষদের নির্বাচনব্যবস্থা পরিবর্তন দরকার রয়েছে। আমরা চাই জেলার আন্ডারে যতগুলো উপজেলা আছে, সেই উপজেলাগুলো থেকে মেম্বার নির্বাচিত হবে। এ ছাড়া একটি জেলা প্ল্যানিং নামে সংস্থা হবে। তারা সব উন্নয়ন প্ল্যান করবে এবং বাস্তবায়নের দিকটা দেখবে। এভাবে আমরা চিন্তাভাবনা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত লোকাল গভর্নমেন্টের ইলেকশনে খরচ হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। সমন্বিতভাবে যদি এই নির্বাচন করা হয়, তাহলে খরচ ৬০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসত। সংসদসহ সব নির্বাচন একসঙ্গে করা হলে খরচ ১ হাজার কোটি টাকার মতো হতে পারে। তাই আমাদের প্রস্তাব হবে, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করে ফেলা। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহের মধ্যে আমরা আমাদের প্রস্তাব সরকারের কাছে দিতে চাই। নির্দিষ্ট করে বললে ২৪ ফেব্রুয়ারি।’
ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘স্থানীয় কাজে এমপিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সংবিধান সংস্কার কমিশন দেখছে। তবে আমাদের ওখানে সাজেশন থাকবে, এমপিরা যাতে লোকাল গভর্নমেন্টের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ না রাখেন। স্থানীয় সরকারের আয় বাড়াতে কীভাবে লোকাল গভর্নমেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, সে বিষয়টিও দেখা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে আরও কার্যকর করতে আমরা জনগণের পরিমাণের ভিত্তিতে ওয়ার্ডগুলো ভাগ করার প্রস্তাব করব।’
তিনি বলেন, ‘এখন লোকাল গভর্নমেন্ট বহু ইউনিটে ভাগ করা রয়েছে। ভবিষ্যতে এটাকে ওয়ান ইউনিট করা যায় কি না, আমরা সে রকম প্রস্তাব নিয়ে ভাবব। এটা এখনই করা সম্ভব। এটা একটা সুদূরপ্রসারী চিন্তা। সবার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটাও চিন্তা করা হবে। মামলা কমাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা বাড়ানো ও সালিশ সিস্টেমকে আরও লিগালাইজ করার কথা চিন্তা করা হচ্ছে।’
ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘একজন মেম্বার বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাদের অনেক চাঁদা দিতে হয়, সমাজ এটা তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আইন এই খরচ বা তাদের কাজের সময় দেখায়নি। কিন্তু সেটা জনগণের মাধ্যমেই নির্ধারণ হয়ে গেছে। এ অবস্থার পরিবর্তন কী হবে, সেটা ঠিক করা হবে।’
স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও চাকরিজীবীদের নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে উল্লেখ করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মেম্বার পদের ক্ষেত্রে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া উচিত। স্কুল-কলেজের শিক্ষক বা চাকরিজীবীদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের নির্বাচনে সুযোগ দিলে তাদের আর্থিক সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে এবং এটা পার্টটাইম হিসেবে তারা করতে পারবে।’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুপারিশ বেশি আসছে। আমাদের কাছে সুপারিশ আসছে আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার জন্য। মানুষ বলছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি না থাকায় তারা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না। একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা দূরীকরণের জন্য তারা আগে স্থানীয় নির্বাচন চাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড সদস্য, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর এবং উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের কার্যকর ভূমিকা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করতে হবে। ‘না’ ভোটের পরিমাণ বেশি হলে আবার তফসিল ঘোষণা করতে হবে। এ ছাড়া বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। একক প্রার্থী থাকলে সেখানে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করতে হবে। কত শতাংশ ভোট পড়লে নির্বাচন বৈধ হবে, সেটি নির্ধারণ করে দিতে হবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সব সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন করবেন জনপ্রতিনিধিরা। সরকারি কর্মচারীরা শুধু সাচিবিক ভূমিকা পালন করবেন।
স্থানীয় সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনে জনপ্রতিনিধিরা সংসদ সদস্যদের প্রভাবমুক্ত থাকবেন। সংসদ সদস্যরা তাদের কার্যক্রমে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। জনপ্রতিনিধিদের কার্যক্রমের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়া ও তার প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এ ছাড়া প্রতিবছর শেষে জনপ্রতিনিধির কাজের মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা একটি নীতিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
