উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল মঙ্গলবার রাত রাত ১১টা ৪৬ মিনিটে কাতারের আমিরের পাঠানো একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন তিনি। যাওয়ার আগে বেগম জিয়া তার সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি প্রধানকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দর এলাকায় উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার নেতাকর্মী।
যুক্তরাজ্য বিএনপি জানিয়েছে, কাতারের রাজধানী দোহায় এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে আজ বুধবার (স্থানীয় সময়) সকাল ৮টায় হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। বিমানবন্দরে তাকে ভিআইপি প্রটোকল দেবে হিথ্রো কর্তৃপক্ষ।
খালেদা জিয়াকে হিথ্রো বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত থাকবেন তার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও পুত্রবধূ ডা. জোবাইদা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতাকর্মীরা। হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সে খালেদা জিয়াকে সরাসরি পশ্চিম লন্ডনের ‘লন্ডন ক্লিনিক’ নামে একটি প্রাইভেট চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানেই তার চিকিৎসা হবে।
এই ক্লিনিক সম্পর্কে যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা জানান, শত বছরের পুরনো এই বেসরকারি হাসপাতালের ব্রেস্ট, ইউরোলজি, সুনাম রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন ও সেলুলার থেরাপিতেও রয়েছে সুনাম। ১৯৩২ সালে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটির অবস্থান সেন্ট্রাল লন্ডনের ডেভনশায়ার প্লেস ও মেরিলিবন সড়কে। এটি ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে পরিচিতি। লন্ডন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েলস উইলিয়ামের স্ত্রী প্রিন্সেস অব ওয়েলস ক্যাথরিন, রাজা তৃতীয় চার্লস, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, তার স্বামী ফিলিপ অব এডিনবরা। এছাড়া এ হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। লন্ডন ক্লিনিকের বহির্বিভাগে প্রতি বছর গড়ে এক লাখ ১০ হাজার মানুষ চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন ২৩ হাজার রোগী।
বহুবিধ রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবি ছিল বিএনপির দীর্ঘদিনের। দলটি এই দাবিতে আন্দোলন করেছে। তার পরিবারের তরফ থেকেও সরকারের কাছে বারবার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু কোনোটিই কাজে আসেনি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সব দ্বার উন্মুক্ত হয়। খালেদা জিয়া মুক্তি পান। একই সঙ্গে তার উন্নত চিকিৎসার প্রস্তুতি শুরু করে দলটি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে একাধিকবার বিদেশ যাওয়ার তারিখ পরিবর্তন করা হয়। বেগম জিয়ার এই চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়াকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ কাজ করছে।
গতকাল রাতে দেশ ছাড়ার আগে হাজার হাজার নেতাকর্মীর ভালোবাসায় সিক্ত হন খালেদা জিয়া। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় প্রবেশ করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি গেটের সামনে থাকা নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকুন। রাস্তা ফাঁকা রাখারও আহ্বান জানান তিনি। ফিরোজায় খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতিমা, প্রয়াত ভাই সাঈদ ইস্কান্দারের সহধর্মিণী নাসরিন ইস্কান্দারসহ আত্মীয়-স্বজন ও দলের নেতাকর্মী এবং বিমানবন্দরে দলের মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বেগম জিয়াকে বিদায় জানান।
রাত ৮টা ১০ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন খালেদা জিয়া। ক্রিম কালারের একটি গাড়িতে করে বাসা থেকে রওনা হওয়ার সময় তার পাশে বসা ছিলেন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথি। ফিরোজা থেকে গুলশান ২-এর গোলচত্বর ও কাকলী মোড় হয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে গাড়িবহরটি বিমানবন্দরে প্রবেশ করে। পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কড়া নিরাপত্তার পাশাপাশি কয়েক হাজার নেতাকর্মী খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে গুলশানের বাসা থেকে এস্কর্ট দিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়।
বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিদায় জানাতে বিকেল থেকেই বিমানবন্দর সড়কের দুই পাশে অবস্থান নেন দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী। এ সময় জনদুর্ভোগ এড়াতে ঢাকা মহানগর বিএনপি ও এর সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের আগেই বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে তাতেও দুর্ভোগ পুরোপুরি এড়ানো যায়নি। বিএনপি নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে সড়কের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়াকে বিদায় জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু নেতাকর্মীদের অনেকে রাস্তায় নেমে আসেন। এতে গাড়িবহরের গতি মন্থর হয়ে যায়। এ সময় সড়কে প্রবল যানজটও দেখা দেয়।
এদিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় আগেই খালেদা জিয়ার ইমিগ্রেশন শেষ করা হয়। তবে বিমানবন্দরে দেরিতে পৌঁছানোয় তার ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যেতে পারেনি। দুবার ফ্লাইটের সময় পরিবর্তন করা হয়। রাত পৌনে ১২টার দিকে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি শাহজালাল বিমানবন্দর ছেড়ে যায়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে চিকিৎসকসহ ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল লন্ডনে গেছে। সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন শর্মিলা রহমান ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. এনামুল হক চৌধুরী, দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ সিদ্দিকী, মো. সাহাবুদ্দিন তালুকদার, নুর উদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ আল মামুন, শরীফা করিম স্বর্ণা, খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, সহকারী একান্ত সচিব মো. মাসুদুর রহমান, প্রটোকল অফিসার এস এম পারভেজ এবং গৃহকর্মী ফাতিমা বেগম ও রূপা শিকদার।
অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, হিথ্রো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে উনাকে সরাসরি সেখানে (লন্ডন ক্লিনিক) নিয়ে যাওয়া হবে। এই হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপারেন্টের সুবিধা আছে। এ বিষয়ে সেখানকার চিকিৎসকরাই সিদ্ধান্ত নেবেন।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অসুস্থতার কথা জেনে লন্ডনে যাওয়ার জন্য রাজকীয় বহরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছেন জানিয়ে জাহিদ বলেন, কাতারের আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি সোমবার রাতে হয়রত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এই বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে রাজকীয় কাতারের ৪ জন চিকিৎসক এবং প্যারা মেডিক্সরা রয়েছেন।
২০২১ সালের নভেম্বরে খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন চিকিৎসকরা। তার পরিবার ও দলের পক্ষ থেকেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে বারবার আবেদন-নিবেদন জানানো হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার প্রতিবারই তা উপেক্ষা করে। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকে ৬ মাস পরপর তার সাজা স্থগিত করার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছিল। এমন অবস্থায় ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্দেশে খালেদা জিয়াকে স্থায়ী মুক্তি পান। এভারকেয়ার হাসপাতালে থেকে ওই সুসংবাদ পান তিনি। মুক্তির পরপরই তাকে বিদেশ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে বিএনপি।
দীর্ঘদিন থেকে লিভার সিরোসিস, কিডনি, হার্ট, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা ও এর দিন-তারিখ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনা চলছিল। একাধিকবার তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। খালেদা জিয়াসহ সফরসঙ্গীদের কারও কারও ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতাও ছিল। শেষে ৭ জানুয়ারি বিদেশ যাত্রার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয় এবং সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বেগম জিয়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের ভিসাও নিয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেও যেতে পারেন খালেদা জিয়া। ফেরার পথে তার ওমরাহ করার আগ্রহ রয়েছে।
