সাংবিধানিকভাবে এই দেশ অসাম্প্রদায়িক। শুরু থেকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে অস্বীকার করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে বরাবর করা হয়েছে সামাজিকভাবে একঘরে। এটাই বাংলাদেশের মানুষের সর্বজনীন চরিত্র। প্রকৃত অর্থে এই দেশ কখনোই মৌলবাদীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, এখনো নেই। বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই সহাবস্থান, সমানাধিকারে বিশ্বাস করে। অসাম্প্রদায়িক এই দেশ সবসময়, সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে অস্বীকার করে সর্বধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে আন্তরিকভাবে। দেশের মানুষ অনেকবার জোটবদ্ধভাবে সেই প্রমাণ দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার অচলায়তন ভেঙে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে অনেকবার। সেভাবেই এ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে। তবে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো ঘটনা ঘটতেই পারে। একেবারেই যা বিচ্ছিন্ন। সেটিকে বিবেচ্য করে, একটি দেশকে ‘সাম্প্রদায়িক ট্যাগ’ লাগানোর সুযোগ নেই। প্রকৃত অর্থে এই দেশ মৌলবাদীদের নয়। সর্বধর্মের মানুষ, নিজ নিজ বিশ্বাস অক্ষুণœ রেখে দেশকে সামগ্রিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কোনো বিশেষ মহল যদি, বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি হবে অন্যায়। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বেশিরভাগই রাজনৈতিক’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে সংখ্যালঘুদের ওপর গত ৪ আগস্ট থেকে যেসব হামলা হয়েছে তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না, বরং তা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পাশাপাশি কিছু হামলার দাবি মিথ্যা বলেও প্রমাণিত হয়েছে পুলিশের এক প্রতিবেদনে। শনিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ধর্ম-বর্ণ, জাতি-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশে যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে সাম্প্রদায়িক হামলা ও দাবির বিষয়ে পুলিশের প্রতিবেদন অনুসারে, ১ হাজার ৭৬৯টি অভিযোগের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬২টি মামলা করেছে পুলিশ। তদন্ত ফলের ভিত্তিতে অন্তত ৩৫ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলাগুলো সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না, বরং তা ছিল রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার। জানা গেছে, ১ হাজার ২৩৪টি ঘটনা রাজনৈতিক কারণে হয়েছে এবং ২০টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক। এ ছাড়া অন্তত ১৬১টি দাবি অসত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এই-ই যদি বাস্তবতা হয়, তাহলে বলতেই হয় এই দেশকে যারা ‘সাম্প্রদায়িক’ ট্যাগ দিতে উঠেপড়ে লেগেছে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। বাংলাদেশের মানুষ অন্তর্গতভাবে বিশশ্বাস করে অসাম্প্রদায়িকতায়। আস্থা রাখে পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে। সেখানে কোনো বিদ্বেষ নেই। পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে, সহাবস্থানেই বিশ্বাস করে দেশের মানুষ। মনে রাখতে হবে, ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকেই এই দেশের মাটিতে জড়িয়ে রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার ঘ্রাণ। যদি কোনো মহল এই দেশে সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণা ছড়ায়, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তখন ভাবতে হবে, এর পেছনে রয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্য। বিশ্বব্যাপী পরিচিতি রয়েছে, বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ। সেই পরিচয় নষ্ট করার জন্য কোনো কোনো মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা করতেই পারে। তবে সেটা বাংলাদেশের পরিচয় নয়। সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তার বেশিরভাগ যেহেতু রাজনৈতিক, সেহেতু সেই বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া ঠিক না।
সাম্প্রদায়িক বিভাজন করে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা হোক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কেউ তা চায় না। আমরা যেন মানবিক হই। আমাদের বিভাজনে মানবসভ্যতা লজ্জা না পাক। সবাই যেন গর্ব করে বলতে পারি, ‘ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু’। এ বিষয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এই দেশ সাম্প্রদায়িক নয়, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সর্বধর্মের মানুষের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ। যা আজও চলছে চলবে অনাদিকাল।
