ভালো মৃত্যুর উপায়

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:৫৮ এএম

মৃত্যু বড় যন্ত্রণাদায়ক সত্য। সবাইকে একদিন মরতে হবে। এ দুনিয়ায় কেউ চিরদিন থাকবে না। যখন মালাকুল মওত এসে আমাদের নফস কবজ করবেন, তখন আমরা দুনিয়ার মানুষের চোখে মরা লাশ হয়ে যাব। দুনিয়ার এক ছোট জিন্দেগিতে আমরা যা করেছি, কবরের জীবনে তার ফল পাওয়া শুরু হবে। ভালো করলে ভালো ফল। খারাপ করলে খারাপ ফল। আখেরাতের প্রথম মনজিল কবর। আর কবরের জীবনের সূচনা হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। শুরু হয় ওপারের অনন্ত জীবন। মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তেই আসতে পারে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ জানে না সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না তার মৃত্যু কোথায় ঘটবে।’ (সুরা লোকমান ৩৪) আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘মানুষসহ প্রতিটি প্রাণীর প্রতিটি মুহূর্তই যেন তার মৃত্যুর মুহূর্ত। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে মানুষ! মৃত্যু আসার আগেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।’ (মুসতাদরাকে হাকেম ৮৯৪৯)

কিছু মৃত্যু জগৎ আলোড়িত করে। প্রতিটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে যায়। আর কিছু মৃত্যু মানুষকে স্বস্তি দেয়। জুলুম-অত্যাচারের অবসান ঘটায়। কোনো এক কবি বলেছিলেন, ‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন/ মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’ ভালো মৃত্যুর জন্য চাই পরিকল্পিত জীবন। আর এ জন্য প্রয়োজন আল্লাহর রহমত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা কোনো বান্দার মঙ্গল চাইলে তাকে যোগ্য করে তোলেন।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কীসের যোগ্য?’ রাসুল (সা.) বললেন, মৃত্যুর আগে বেশি বেশি নেক আমল করার তওফিক দিয়ে ওই ব্যক্তিকে আল্লাহ জান্নাতের যোগ্য করে তোলেন।’ (তিরমিজি ২১৪২) অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন আল্লাহতায়ালা কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে শক্তি দেওয়া হয়। সাহাবিরা বললেন, কীসের শক্তি? জবাবে রাসুল (সা.) বললেন, বেশি বেশি নেক আমল করার শক্তি।’ (মুসনাদে আহমাদ ১৭৮১৯)

মৃত্যু সম্পর্কে এক আরব কবি বলেছেন, ‘জীবন হলো কয়েকটি চোখের পলকের নাম।’ অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কাল চোখের পলকের মতোই ক্ষুদ্র। তাই একজন বুদ্ধিমান মানুষের করণীয় হলো সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ভালো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। মৃত্যুর সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো নিজেকে ভালো কাজে নিয়োজিত করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা নেক আমলের দিকে দৌড়ে আসো ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতের মতো ফেতনা নেমে আসার আগেই।’ (সহিহ মুসলিম ৩২৮)

মুমিন মাত্রই আল্লাহর প্রতি এই সুধারণা পোষণ করবে যে, তিনি অবশ্যই মৃত্যুর সময় বান্দার কষ্ট কমিয়ে দেবেন। কারণ আল্লাহর প্রতি যে যেমন ধারণা করবে মহান আল্লাহ তার সঙ্গে তেমন আচরণই করবেন। এক হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার সম্পর্কে আমার বান্দার ধারণা মোতাবেক আমি আচরণ করি। আমি তার সঙ্গে থাকি।’ (সহিহ বুখারি ৭৪০৫) অন্য হাদিসে জাবির (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর তিন দিন আগে তাকে আমি এ কথা বলতে শুনেছি যে, তোমাদের সবাই যেন আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণরত অবস্থায় মারা যায়।’ (সহিহ মুসলিম ৭১২১)

মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করার মাধ্যমেও ভালো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যায়। বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করার বড় একটি উপকার হচ্ছে, এতে অন্তর থেকে দুনিয়ার আসক্তি দূর হয় এবং পরকালের চিন্তা ও আমল বাড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব ভোগ-উপভোগ বিনাশকারী মৃত্যুর কথা তোমরা বেশি বেশি স্মরণ করো।’ (তিরমিজি ২৩০৭)

মৃত্যুর কথা স্মরণের আরেকটি উপায় হলো কবর জিয়ারত। কবর জিয়ারত মৃত্যু ও আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্তরে কবরের শাস্তির ভয়াবহতা সৃষ্টি করে। ফলে এর মাধ্যমে অন্যায় থেকে তওবা এবং মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণে সাহায্য করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের এর আগে কবর জিয়ারতে নিষেধ করেছিলাম, এখন থেকে কবর জিয়ারত করো। কেননা তা দুনিয়া বিমুখতা এনে দেয় এবং আখেরাতের স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ ১৫৭১)

কবর জিয়ারতের মাধ্যমে বান্দার মনে প্রথমেই কবরের চাপের কথা ভেসে ওঠে। আম্মাজান হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সবাইকেই কবর চাপ দেবে। কেউ যদি কবরের চাপ থেকে বাঁচতে পারত তাহলে আমার প্রিয় সাহাবি সাদ ইবনে মুয়াজ বাঁচতে পারত।’ (মুসনাদে আহমাদ ও বায়হাকি শরিফ) জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, ‘সাদকে কবরে রাখার পর রাসুল (সা.) কয়েকবার সুবহানাল্লাহ ও আল্লাহু আকবার পড়লেন। হুজুরের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও তসবিহ পড়লাম। রাসুল (সা.) বললেন, এই নেককার সাদের কবর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তসবিহ পড়ার পর মহান আল্লাহ তার কবর প্রশস্ত করে দিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ) কবরের চাপের ব্যাপারে সাহাবি ও তাবেয়িরা সব সময় ভীত থাকতেন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ভালো মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার তওফিক দিন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত