সাদা বলে গোটা ২০২৪ সাল জুড়েই বড্ড বিবর্ণ ছিলেন লিটন কুমার দাস। এই সময়ে খেলা ৫টা ওয়ানডে ম্যাচে লিটনের মোট রান ৬, সর্বোচ্চ ইনিংস ৪ রানের আর শূন্য রানে আউট হয়েছেন ৩ বার। এমন চূড়ান্ত বাজে ফর্মে থাকা একজন ব্যাটসম্যানকে আসছে ফেব্রুয়ারিতে হতে যাওয়া আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির জন্য বিবেচনা করেননি নির্বাচকরা। রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। সেই দলে লিটনের নাম নেই। খারাপ ফর্ম এবং আউট হওয়ার ধরন বিবেচনা করেই প্রধান নির্বাচক মনে করেন লিটনকে ফর্মে ফেরার জন্যই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে খানিকটা বিরতি দেওয়া প্রয়োজন।
‘লিটন আউট অব ফর্ম। আউটের প্যাটার্ন অনেকটা একই রকম। সাদা বলে পাওয়ার প্লেতে যে সুবিধা নেওয়া দরকার, সেটা হচ্ছে না। ক্রিজে টিকে থাকতে পারছে না। এক্সপোজ হয়ে গেছে। বিপক্ষ দলের অ্যানালিস্টরা লিটনের বিপক্ষে অনেক বেশি সফল হয়ে যাচ্ছে। তবু সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু আস্থার জায়গাটা এই মুহূর্তে সেই অবস্থানে নেই’ লিটনের বাদ পড়ার ব্যাখ্যা এভাবেই দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। তাকে সবচেয়ে হতাশ করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ওয়ানডে সিরিজে লিটনের ব্যাটিং। সেন্ট কিটসের ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে ৩ ম্যাচে লিটনের রান ছিল যথাক্রমে ২, ৪ ও ০। যে উইকেটে অন্য ব্যাটসম্যানরা ভালো করছেন সেখানে লিটনের এমন পারফরম্যান্সই তাকে ঠেলে বের করে দিয়েছে দল থেকে, নির্বাচকদের ভাবনায় সেটাই স্পষ্ট। বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে অধিনায়ক স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘সৌম্য ও তামিম জুটি হিসেবে ভালো করছে। এই দুজনই সম্ভবত ইনিংস শুরু করবে। তাই প্রথম একাদশে লিটনের জায়গা নেই। তার ক্লাস নিয়ে সন্দেহ নেই। ফর্মে সংকট দেখা দিলে সেখান থেকে বের করতে যদি কাজ করতে পারি তাহলে তাকে ভালোভাবে বের করে আনতে পারব। আমাদের বিশেষজ্ঞরা কাজ করার সুযোগ পাবে এই সময়ে।’
লিটনের ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য, শিল্পিত সুষমা নিয়ে কম বন্দনা হয়নি। তার ব্যাট মাঠের সবুজে দ্যা ভিঞ্চির মোনালিসা আঁকে, এমন কথাও বলেছেন ধারাভাষ্যকাররা। কিন্তু গত এক বছরে তার ব্যাটে মোনালিসা নয়, জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ সিরিজের ছবির প্রতিফলনই যেন বেশি! বাংলাদেশ দলে অনেক সময়ই অফ ফর্মের ক্রিকেটারকে দলে রাখা, বর্তমানকে ভাবনায় না নিয়ে অতীত পারফরম্যান্সকে বিবেচনা করে সুযোগ দেওয়ার ইতিহাস আছে। লিপু স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বেশ কিছু সুযোগ পাওয়ার পরও আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি লিটন, ‘দুটো কারণ আমি বলব। লিটন আউট অব ফর্ম। একজন ব্যাটার দীর্ঘদিন ধরে এই ফরম্যাটে রানের তীব্র খরায় ভুগছেন। আউটের প্যাটার্ন একই রকম। ক্রিকেটের সাদা বলের ফরম্যাটে পাওয়ার প্লেতে যে সুবিধা নেওয়া দরকারৃ চাপ চলে আসছে, পার্টনারের চাপ বাড়ছে, তিন নম্বর এক্সপোজড। তারপরও অনেক আস্থা রেখেছিলাম। অনেক ম্যাচেই সুযোগ দিয়েছি। মাঝখানে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচেও দলে রাখিনি। আস্থার জায়গাটা... ব্যাটার ফর্মের বাইরে থাকলেও আস্থার জায়গা থেকে দলে রাখা হয়। আমার মনে হয় এ মুহূর্তে সেই অবস্থানে নেই’Ñ বলেছেন লিপু।’ দুবাইতে ২০১৮ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে লিটনের সেই ইনিংসের মূল্যও বর্তমানে নেই তার কাছে, ‘লিটনের অতীত পারফরম্যান্স, ইতিহাস অবশ্যই দেখা হয়। নিকট অতীত বেশি দেখা হয়। উইন্ডিজে আমরা সব ম্যাচেই রান করেছি। দুই ম্যাচে তিনশ পেরিয়েছি। উইকেট খুব ভালো ছিল। সেখানেও (লিটন) ফেল করায় তার ওপর আত্মবিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে যায়। আমরা পিন্ডিতে খেলব। খুব ভালো ব্যাটিং উইকেট। নিউজিল্যান্ড ৩৩৬ করেও হেরে গেছে। টপ অর্ডারই রান করেছে। অর্থাৎ ওপর থেকেই রান আসতে হবে। তাই আউট অব ফর্ম কাউকে নিতে পারছি না। টুর্নামেন্টে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংও কঠিন চ্যালেঞ্জ থাকবে।’
অবসর নেওয়ায় তামিম ইকবালকে দলে নেওয়ার সুযোগ নেই, পেলে ভালো হতো এমনটাই বলেছেন লিপু। সাকিব আল হাসান অবসর নেননি ওয়ানডে থেকে, তবে বোলিং নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাকে খেলতে হবে শুধুই ব্যাটসম্যান হিসেবে। সাকিবকে দলে শুধুই ব্যাটসম্যান হিসেবে রাখার মতো যোগ্য এই মুহূর্তে মনে হয়নি লিপুর কাছে, এছাড়াও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকেও তার ব্যাপারে সবুজ সংকেত ছিল না। তাই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলা হচ্ছে না সাকিবের, যে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশকে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টাইমড আউট কান্ড ঘটিয়েছিলেন ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়া এই অলরাউন্ডার।
ওয়ানডে অভিষেক না হলেও চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলে আছেন ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন। তাকে নেওয়ার ব্যপারে লিপুর মন্তব্য, ‘ওর হয়তো বড় কোনো অবদান নেই। তবে আমাদের যেটা মনে হয়েছে, আমরা যেটা খুঁজছি... পাওয়ার প্লেতে আগ্রাসী ব্যাটিং, সেটা ওর মধ্যে আছে। বিকল্প কাউকে লাগলে সে (তানজিদ-সৌম্যর মতো) একই গতিতে খেলতে পারবে। দলকে জেতাতে মূল লক্ষ্য ঠিক রাখতে সে সবসময় আক্রমণাত্মক থাকে। এটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সামনে হয়তো তিনি অবদান রাখতে পারবেন। তাই বড় টুর্নামেন্টে তাকে নেওয়া হয়েছে।’
দলে বাকি জায়গাগুলো অনুমিতই। নাজমুল হাসান শান্ত থাকছেন অধিনায়ক। কোনো সহ-অধিনায়ক নেই, লিপু জানিয়েছেন তাদের কাজ দল ঠিক করা। অধিনায়ক বা সহ-অধিনায়ক নির্বাচন করে বিসিবি।
